মিয়ানমারের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসবে না!

মুনওয়ার আলম নির্ঝর: মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের পর কয়েকদিন কেটে গেছে। এই অভ্যুত্থানের প্রভাব কেবল মিয়ানমারেই নয়, গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পড়তে শুরু করেছে। মিয়ানমারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু চীনের ‘আশীর্বাদে’ কোনো কিছুইতেই কান দিচ্ছে না মিয়ানমার।

এদিকে, দেশটিতে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেও, গণগ্রেপ্তারের জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না। আর অন্যদিকে আশেপাশের দেশগুলো হিসেব করছে অভ্যুত্থানের ফলে কার কতটা লাভ হল আর কতটা ক্ষতি হলো!

হিসেব কষতে হচ্ছে বাংলাদেশকেও। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে না ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তা ভাবতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা অর্থনীতিবিদ এম হাফিজ উদ্দিন খান নিউজনাউ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় কোন প্রভাব পড়বে না। আমাদের মিয়ানমার থেকে কোন কিছু আমদানি-রপ্তানি হয় না। সেদিক থেকে আমাদের কোন ক্ষতি হবে না ।

তবে এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে না যাওয়াটা আমাদের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

গত ১৯ জানুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যেখান থেকে বাংলাদেশ ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন’ নিয়ে আশার আলো দেখলেও মিয়ানমারের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া।

মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের দিকে নজর দিলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এই মুহুর্তে তাঁরা তাঁদের নিজেদের অবস্থান শক্ত করা নিয়েই বেশি ভাবছেন। অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের ভাবার কোন সুযোগ নেই। সেদিক থেকে প্রত্যবাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে গেছে সেটা নিশ্চিত। আর এই বিশাল জনগোষ্ঠিকে লালন-পালন করতে গেলে অবশ্যই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

অনেকেই মনে করছিলেন, একটু কৌশলী হলেই মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায়, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুফল পেতে পারে বাংলাদেশ। কেননা, জান্তা সরকারের কারণে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবরোধ জারির শঙ্কা জোরদার হচ্ছে মিয়ানমারে। এমন অবস্থায়, বিনিয়োগ আর পণ্য আমদানিতে বিকল্প দেশ খুঁজবেন বিশ্ব উদ্যোক্তারা। বিশ্লেষকদের মতে, সেই সুযোগটাই নিতে হবে বাংলাদেশকে।

তবে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন এই বিষয়টির সাথে একমত প্রকাশ করেননি। নিউজনাউ টোয়েন্টি ফোরের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, মিয়ানমার যেসব জিনিস রপ্তানি করে তা আমাদের নেই। তাঁদের পণ্যগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি করারও সুযোগ নেই।

২০১৭ সালে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপের মুখে পড়ে মিয়ানমার। তখন থেকেই দেশটিতে নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে যায় পশ্চিমা এসব দেশের কোম্পানিগুলো। ২০১৮ অর্থবছরে মিয়ানমারে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবৃদ্ধি কমে যায় ৭৬ শতাংশ। তবে সে ধাক্কা খুব একটা কাবু করতে পারেনি মিয়ানমারের অর্থনীতিকে। এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুরের বিপুল বিনিয়োগে পশ্চিমা চাপ সামলে সামনে এগিয়ে গেছে মিয়ানমারের অর্থনীতি।

পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনও মনে করেন এসব বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে না। এর কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারে যারা বিনিয়োগ করে তাঁরা কখনই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে না। মিয়ানমারের সবচেয়ে বেশি ইনভেস্ট হচ্ছে মাইনিংয়ে, যেটার কোন সুযোগই নেই বাংলাদেশ।

তবে এই সচিব বাংলাদেশে বিনিয়োগ কম হওয়ার জন্য দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি বিনিয়োগের পরিবেশ সত্যিকারেরই ভালো হয় যেমন- ঘুষ দিতে না হয়, বিদ্যুৎ সহজে পাওয়া যায় তাহলে এমনিতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে, মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা দেশ সিঙ্গাপুর। সেখানে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ৩৪ শতাংশ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে।

তারপরই আছে হংকংয়ের নাম; মোট বিনিয়োগের ২৬ শতাংশ আসে এখান থেকে। ২০২০ অর্থবছরের (সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে) জন্য মিয়ানমার বিদেশ থেকে সরাসরি বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে তার অর্থমূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার।

সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে আবাসন এবং উৎপাদন খাতে। উভয় খাতেই এটা ২০ শতাংশ। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ বছর বিনিয়োগ এমনিতেই কমে গেছে।

তবে মিয়ানমারের রাজনীতি ও অর্থনীতি অনেকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা লেখক ও প্রাবন্ধিক রেজাউল করিম নিউজনাউ টোয়েন্টি ফোরের সাথে আলাপকালে বলেন, ইউরোপ-আমেরিকা মিয়ানমারের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাংলাদেশের উপর কোন প্রভাব পড়বে না। আমাদের সাথে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক সীমিত। প্রধানত, ভারত কিছু রপ্তানি বন্ধ করলে তখনই আমরা মিয়ানমারের শরনাপন্ন হই। আর মিয়ানমারের উপরও বড় কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না পশ্চিমা দেশগুলো।

অভ্যুত্থানের কারণে এরই মধ্যে মিয়ানমারের একটি কোম্পানিকে বাণিজ্য অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

মিয়ানমার ভিত্তিক ইওমা স্ট্রাটেজিক হোল্ডিংস সিঙ্গাপুরে তাদের বাণিজ্য স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কোম্পানিটি সিঙ্গাপুরে তালিকাভুক্ত।

রেজাউল করিম মনে করেন, মিয়ানমারের এই অভ্যত্থানে লাভবান হবে ভিয়েতনাম। তিনি বলেন, মিয়ানমারে যে বিনিয়োগগুলো হচ্ছিলো সেগুলো চলে যাবে ভিয়েতনামে। ভিয়েতনামে সার্বিক বিনিয়োগের অবস্থা খুবই ভালো। সেদিক থেকে লাভবান হবে ভিয়েতনাম।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কমে ২ শতাংশে নেমে যাবে। দেশে দারিদ্র গত বছরের তুলনায় বড়বে। ২০১৯ সালের শেষে মিয়ানমারে দারিদ্র্যের হার ছিল ২২.৪ শতাংশ, যেটা বেড়ে ২৭ শতাংশ হবে।

আর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই অভ্যুত্থান তো কোন ভালো সংবাদ দিলোই না উল্টো বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে লালন-পালন করতে গিয়ে প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনৈতিক সিস্টেমে।

নিউজনাউ/এমএএন/২০২১

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...
জাতীয়: প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম আর নেই; দাফন করা হবে বনানী কবরস্থানে * এইচ টি ইমামের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের শোক প্রকাশ * মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা ছিল এইচ টি ইমামের: রাষ্ট্রপতি * একদিনের সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখন ঢাকায় * গোপালগঞ্জ ও বরিশাল সফর করতে পারেন নরেন্দ্র মোদি * ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে যৌন হয়রানি: খাগড়াছড়ির শিক্ষককে ঢাকায় গ্রেফতার * ফরিদপুরে মাইক্রোবাসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়রের স্ত্রী ও ছেলেসহ নিহত তিন *আন্তর্জাতিক: মিয়ানামারে সামরিক অভ্যুত্থান বিরোধীদের প্রতিবাদ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি; নিহত কমপক্ষে ৯ * রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ইইউ-আমেরিকার * মিয়ানমারে এক দিনেই ৩৮ বিক্ষোভকারী নিহত: জাতিসংঘ * হামলার সতর্কতার পর যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট অধিবেশন বাতিল *

খেলা: আবুধাবি টেস্টে বুধবার দ্বিতীয় দিনে আফগানিস্তানকে ১০ উইকেটে হারিয়েছে জিম্বাবুয়ে * নির্বাচনের পর ঘুরে দাঁড়াবে বার্সা: গুয়ার্দিওলা *

সময়সূচি: সকাল ১০টায় নিউজনাউ সকাল। নিউজনাউ সংবাদ দুপুর ২টা, সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ৯টায়। নিউজনাউ ফ্ল্যাশ বেলা ১২টা, বিকেল ৫টা এবং রাত ৮টা। বিকেল ৩টায় বিটিভির সংবাদ (ধারণকৃত)। এছাড়াও বেলা ১২টা, বিকেল ৪টা, সন্ধ্যা ৬টা এবং রাত ১০টায় নিউজনাউ রেডিও আপডেট। সাথে থাকুন নিউজনাউ টোয়েন্টি ফোর ডট কমের (www.newsnow24.com) **