alo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শেয়ারবাজার কারসাজিতে সাকিব

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ০২:৩৬ পিএম

শেয়ারবাজার কারসাজিতে সাকিব
alo

নিউজনাউ ডেস্ক: শেয়ার বাজারে বিভিন্ন সময়ে কারসাজি হলেও রাঘব বোয়ালরা সব সময় ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থাকেন। কিন্তু এবার শেয়ারের ব্যাপক কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সংস্থাটির এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে কীভাবে কারসাজি হয়েছে, কারসাজির সঙ্গে জড়িত চক্রের তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে নাম এসেছে মোনার্ক হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী সাদিয়া হাসানের; যে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান।

যদিও এই সাকিবই শেয়ারবাজারের ভাবমূর্তি বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিযুক্ত অ্যাম্বাসেডর বা শুভেচ্ছাদূত।

সাকিব আলোচিত 'শেয়ার কারসাজির হোতা' বলে অভিযুক্ত বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরোর সঙ্গে শেয়ার কারসাজি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তদন্তে ওই সব কারসাজির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর শীর্ষ ক্রেতার নামের তালিকায় সাকিবের নাম এসেছে। সম্প্রতি এমন সাত কারসাজির ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা জরিমানা করে যে আদেশ দিয়েছে, তার চারটিতে তদন্তের সময়ে শীর্ষ শেয়ার কেনাবেচাকারীর নামের তালিকায় তাঁর এবং তাঁর মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস মোনার্ক হোল্ডিংসের নাম উঠে এসেছে।


যেসব শেয়ার কারসাজির ঘটনায় সাকিব আল হাসানের নাম এসেছে, সেগুলো হলো- ওয়ান ব্যাংক, ফরচুন শুজ এবং এনআরবিসি ব্যাংক। এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি হয়েছিল গত বছর। এ বছরের শুরুতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি বিডি কম অনলাইনের কারসাজির ঘটনায় শীর্ষ ক্রেতার তালিকায় ছিল ব্রোকারেজ হাউস মোনার্ক হোল্ডিংস। এ ব্রোকারেজ হাউসের মালিকানায় সাকিব ছাড়াও যৌথভাবে আছেন হিরোর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান।

বর্তমানে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অবস্থান করায় এ বিষয়ে সাকিব আল হাসানের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে মিরপুর বিসিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাকিবের শেয়ার কারসাজি নিয়ে জানতে চাইলে নাজমুল হাসান পাপন বলেন, এটা ক্রিকেটের বিষয় না। এ নিয়ে কিছু বলার নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুধু সাকিব নন, কারসাজি চক্রের অংশ হিসেবে আবুল খায়ের হিরো, বেসরকারি ব্যাংক এনআরবিসি, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি জেনেপ ইনফোসিস, ফরচুন সুজ এবং সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলসসহ আরও অনেকের নাম এসেছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে শুধু হিরোর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মাতবর, স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, বোন কনিকা আফরোজ এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমবায় সমিতি ডিআইটি কো-অপারেটিভকে জরিমানা করা হচ্ছে। এভাবে কারসাজির ঘটনাগুলোকে অনেকটা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।

গত দুই বছরের কারসাজির ঘটনায় হিরোর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানকে গ্রিন ডেলটা ও ঢাকা ইনস্যুরেন্সের কারসাজির ঘটনায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া হিরোর বাবাকে ওয়ান ব্যাংক ও ফরচুন সুজের কারসাজির ঘটনায় সাড়ে চার কোটি টাকা, বোন কনিকা আফরোজকে এনআরবিসি ব্যাংকের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় পৌনে চার কোটি টাকা এবং ডিআইটি কো-অপারেটিভকে এশিয়া ইনস্যুরেন্স ও বিডিকম অনলাইন কোম্পানির শেয়ার কারসাজির ঘটনায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ওয়ান ব্যাংকের কারসাজির ঘটনায় হিরোর বাবা আবুল কালাম মাতবরকে জরিমানা করে গত ২ আগস্ট যে আদেশ বিএসইসি দিয়েছিল, সে আদেশের কপি সম্প্রতি নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ওই আদেশে কপি থেকে জানা গেছে, ওয়ান ব্যাংকের কারসাজির ঘটনায় গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর সময়ে, অর্থাৎ দুই সপ্তাহের শেয়ার লেনদেন খতিয়ে দেখতে তদন্ত করেছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। তাতে দেখা যায়, উল্লেখিত সময়ে ওয়ান ব্যাংকের শেয়ারের শীর্ষ ১৫ ক্রেতার তালিকার আট নম্বরে ছিল শাকিব আল হাসানের নাম। ট্রাস্ট ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট নামক মার্চেন্ট ব্যাংকের ১৬০৫৫৪০০৭৪১৪০৭১৯ নম্বর বিও অ্যাকাউন্ট থেকে ৭৫ লাখের বেশি শেয়ার কিনে ১০ লাখ ২০ হাজার শেয়ার বিক্রি করেন।

একইভাবে ফরচুন সুজের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় ডিএসইর করা গত বছরের ২০ মে থেকে ১৭ জুনের করা তদন্তের সময়ে শীর্ষ ২০ ক্রেতার তালিকার দশ নম্বরে উঠে এসেছে শাকিব আল হাসানের নাম। এ ঘটনায় শুধু উল্লিখিত সময়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মালিকানাধীন এসবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট নামক মার্চেন্ট ব্যাংকে খোলা শাকিবের ১৬০৪৫৩০০৬৯৫৮৫৫৭৪ নম্বর বিও অ্যাকাউন্ট থেকে ফরচুন সুজের দুই লাখ শেয়ার কেনা হয়, বিপরীতে বিক্রি হয় ১৭ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি শেয়ার।

এ ছাড়া এনআরবিসি ব্যাংকের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় ডিএসইতে তদন্তে গত বছরের ৫ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত সময়ে এ ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ ক্রেতার তালিকার ১১ নম্বরে আছে সাকিবের নাম। এ কারসাজিকে ইস্টার্ন ব্যাংকের মালিকানাধীন ইবিএল সিকিউরিটিতে খোলা ১২০১৯৫০০৬৪৯৭৬২৩৭ নম্বর বিও অ্যাকাউন্টে ২৭ লাখ শেয়ার কিনে এক লাখ শেয়ার বিক্রির তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া বিডিকম অনলাইনের কারসাজির ঘটনায় সাকিবের মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস মোনার্ক হোল্ডিংসের নাম এসেছে শীর্ষ ক্রেতার তালিকায়।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোনার্ক হোল্ডিংস ছাড়াও মোনার্ক মার্ট নামক ই-কমার্স সাইটের হিরোর ব্যবসায়িক পার্টনার সাকিব আল হাসান নিজে কোনো শেয়ার কেনাবেচা করতেন না। তাঁর হয়ে সব শেয়ার কেনাবেচার আদেশ দিয়েছেন হিরো। সাকিব শুধু সেখানে লগ্নি করেছেন। বিও অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে তাঁর বিনিয়োগের সবটাই দেখভাল করেছেন হিরো। হিরো তাঁর নিজের, স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, বাবা আবুল কালাম মাতবর, বোন কণিকা আফরোজ, নিজের মালিকানাধীন সমবায় সমিতি ডিআইটি কো-অপারেটিভের নামে শেয়ার কিনে আগে বেচে বেশি মুনাফা নিলেও সাকিবের অ্যাকাউন্টে কেনা শেয়ার পরে বিক্রি করেছেন।

যেমন ওয়ান ব্যাংকের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় গত বছরের ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর সময়কালে শীর্ষ লেনদেনকারীর তালিকায় থাকা হিরোর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ থেকে ওয়ান ব্যাংকের ৩ কোটি ৯৮ লাখের বেশি শেয়ার কিনে ২ কোটি ৩৩ লাখের বেশি শেয়ার বিক্রি করেন। এ কারসাজিতে হিরো নিজে অগ্রণী ব্যাংক ইক্যুয়িটি নামক মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ৩ কোটি ৯৬ লাখ শেয়ার কিনে বিক্রি করেন ১৬ লাখ ২৭ হাজার শেয়ার। তবে সাকিব আল হাসানের অ্যাকাউন্টে ৭৫ লাখের বেশি শেয়ার কিনে বিক্রি করেন মাত্র ১০ লাখ ২০ হাজার শেয়ার। এ বিষয়ে জানতে আবুল খায়ের হিরোর মোবাইল ফোনে মঙ্গলবার রাতে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

নিউজনাউ/এবি/২০২২

X