alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মির্জা ফখরুলের কি তাহলে 'ভূতের পা'!

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১০:০৭ পিএম

মির্জা ফখরুলের কি তাহলে 'ভূতের পা'!
alo

পার্থ প্রতীম নন্দী: বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই দুইটা শব্দ যখন একসাথে কানে বাজে তখনই প্রায় সবার চোখে ভেসে আসে ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের স্মৃতি। ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় আত্মত্যাগ আর লড়াইয়ের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেল, সেই দেশের তৎকালীন শাসন আমল বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের শাসনামলের চেয়ে অনেক ভালো ছিল বলে দাবি করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অথচ খোদ পাকিস্তানেই বিভিন্ন সময় উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্তুতি। তাহলে কেন এমনটা বললেন বিএনপির অন্যতম সর্বোচ্চ নেতা ফখরুল!

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এইটা নিছকই কোন রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়। দেশ যখন অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে মির্জা ফখরুল কেন পিছনের দিকে যেতে চান সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা। তাঁরা বলছেন, এর পেছেনে সুগভীর 'পলিটিক্স' জড়িত। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন মাত্রই ভারত সফর শেষ করলেন তখন দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেতার 'পাকিস্তান প্রীতি' নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে দেশের রাজনীতিতে। ভূতের মতো মির্জা ফখরুলের পা পিছনের দিকে কেন সেই প্রশ্ন রেখেছেন তাঁরা!

বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়িতে নিজ বাসভবনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ে ফখরুল এই তুলনা করেন। এসময় তিনি বলেন, 'আমরা পাকিস্তান আমলে আর্থিক ও জীবন যাত্রার দিক থেকে এ সময়ের চেয়ে ভালো ছিলাম। তারপরও পাকিস্তান সরকার যেহেতু আমার অধিহার ও সম্পদ হরণ করত, সে কারণে আমরা যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এখন তার থেকেও খারাপ অবস্থায় আমরা আছি। এখন দেশে এক লাখ ৯২ হাজার কোটিপতি আছে। এখানে গরিব মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। যে দেশের ৪২% মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে, সে দেশকে উন্নত দেশ কীভাবে বলা যায়?'

যদিও পরিসংখ্যার হিসেব করলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র! বাংলাদেশের হাতে বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদের পরিমাণ এখন পাকিস্তানের দ্বিগুণ। গত ৪৯তম বিজয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের রিজার্ভ ২ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশ স্বাধীনের সময় রিজার্ভ এক ডলারও ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ পাঁচ দশকেই উন্নীত হতে চলেছে উন্নয়নশীল দেশে।

অথচ, বাংলাদেশের যাত্রার শুরুতেই এটিকে বলা হয়েছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। এখন এ দেশ পরিচিতি পাচ্ছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদশের ঈষর্ণীয় সাফল্য অহংকার করার মতো। এই অগ্রগতির জন্য পাকিস্তান এখন ঈর্ষা করে বাংলাদেশকে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৮৫৫ ডলার। একই সময়ে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৮৪ ডলার।

এদিকে মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তানি উন্নয়ন কর্মী এবং কলামিস্ট জাইঘাম খানের একটি বক্তব্য!

২০১৮ সালে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েকদিন পর এক টেলিভিশন টক শোতে তাকে এই পরামর্শ দিয়ে জাইঘাম খান বলেছিলেন, 'পাকিস্তানের উন্নয়ন যদি ঘটতে চান, সুইডেনকে না দেখে বাংলাদেশের দিকে তাকান। পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মতো বানান।'

এক সময় পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় পূর্ণকালীন সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করা জাইঘাম তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এক আরেকটি সাক্ষাৎকারে বলেন, শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়- অর্থনীতি, মানবিক উন্নয়ন সূচক, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন—ইত্যাদি সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে জাইঘাম খান বলছেন, বাংলাদেশই হওয়া উচিত পাকিস্তানের উন্নয়নের মডেল।

তিনি বলেন, 'আমার মতে পাকিস্তানের সামনে শেখার জন্য উদাহারণ হিসেবে যে কয়েকটি দেশ আছে, তার একটি বাংলাদেশ, আর আছে ইরান এবং ইন্দোনেশিয়া।' (বিবিসি নিউজ বাংলা, ৮ অক্টোবর ২০১৮)। 

সম্প্রতি ২০২২ সালে ২ আগস্ট পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে সেখান থেকে পাকিস্তানের নেতৃত্বকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নিবন্ধটি লিখেছেন পাকিস্তানের সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক সাহিবজাদা রিয়াজ নূর। ‘বাংলাদেশের নেতৃত্বের কাছ থেকে গ্রহণীয়’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যার কৃতিত্ব দেশটির নেতৃত্বকে দেওয়া যেতে পারে।

নিবন্ধে সম্প্রতি উদ্বোধন করা পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ‘গর্ব ও সক্ষমতার প্রতীক’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

এছাড়াও বিভিন্ন সময় পাকিস্তানের টকশোতে বিভিন্ন আলোচক, সেদেশের নেতারাও বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন। অথচ বাংলাদেশে বসে সেই দেশের ৭১ এর শাসন আমলকে ভালো ছিল বলে দাবি করছেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল।

এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী নিউজনাউকে বলেন, 'যারা পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন, যাদের মধ্যে এখনও পাকিস্তানি জান্তাদের রক্ত বহমান তারাই পাকিস্তানপন্থী বক্তব্য দেবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন সারাবিশ্বব্যাপী সমাদৃত তখন পাকিস্তানে আমলে ফিরে যাওয়ার বা তখন ভালো ছিলাম এমন বক্তব্য প্রমাণ করে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা এখনও চলমান।'

নিউজনাউ/একে/২০২২

X