alo
ঢাকা, বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ছয় মাসের মাথাতেই নড়বড়ে সাত দলের ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারী, ২০২৩, ০৭:০৮ পিএম

ছয় মাসের মাথাতেই নড়বড়ে সাত দলের ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’
alo

 

নিউজনাউ ডেস্ক: গেলো বছরের ৮ আগষ্ট জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ মোট ৭টি দল নিয়ে গঠিত হয় ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। ‘ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রাম’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে এ জোট তৈরি হয়েছিল। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের জন্য তারা বিএনপিকে সাথে নিয়ে আরও বড় ঐক্যজোট করে আন্দোলনের মাঠেও আছেন বিভিন্নভাবে। তবে অন্দরমহলের খবর হলো ছয় মাস না যেতেই নড়বড়ে হয়ে গেছে জোটটি। 

জানা যায়, এই ইস্যু তৈরি হয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুরের বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে। গত ১১ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণঅবস্থান কর্মর্সূচিতে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্য দলগুলোর নেতারা নুরকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন গণঅধিকার পরিষদের নেতারা। এর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র মঞ্চের কোনো কর্মসূচিতে নুরুল হক নূর, রাশেদ খানরা থাকবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন।

সেই মোতাবেক গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চের বিক্ষোভ সমাবেশে থাকেননি তারা। রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে সমালোচনার পর গত সোমবার রাতে বৈঠকে বসেন গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা। মঙ্গলবারও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের ভূমিকা নিয়ে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্যাপারটি খোলাও করেছেন নুরুল হক নুর। 
 তিনি বলেন, 'এটা ঠিক যে, গণতন্ত্র মঞ্চের সাথে আমাদের কাজ করার ক্ষেত্রে একটি অসন্তুষ্টি তৈরি হয়েছে। সেটি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মঞ্চের অনেকে বাম ঘরানার রাজনীতি করেছেন। কাজেই তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশনেরও একটু পার্থক্য আছে। আমরা উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাই। দেশের ৯০ ভাগ মুসলমান। ধর্মভিত্তিক যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে- আমরা তাদের সমর্থন করি বা না করি রাজনীতিতে তারা ফ্যাক্টর। সেগুলোর মধ্যে জামায়াত, চরমোনাই এবং হেফাজতসহ অনেকগুলো দল রয়েছে। আমরা বাম-ডান- সব দলকে এই প্ল্যাটফর্মে নেব। কিন্তু আমি দেখেছি, গণতন্ত্র মঞ্চে ইসলামপন্থি দলের ব্যাপারে শরিক দলগুলো ইতিবাচক নয়। তাহলে বামপন্থি ট্যাগ নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চে থাকব- এটা তো আমাদের জন্য বিব্রতকর। সরকার ও বিরোধী দলের অনেকেই আমাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে অনেক কিছু করতে চায়; সে জায়গায় আপত্তি থাকে।'

জোটের কর্মসূচিতে কম অথচ নিজেরদের কর্মসূচিতে বেশি জমায়েত কেন জানতে চাইলে নুর সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, 'বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলিনি যে, মঞ্চের কর্মসূচিতে এসে বক্তব্য দেব। কিন্তু মঞ্চের নেতৃবৃন্দ তড়িঘড়ি করে কর্মসূচি শেষ করে দিলেন- যাতে আমি বক্তব্য রাখতে না পারি। এটি আমাদের নেতাকর্মীদের খুবই ক্ষুব্ধ করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের সম্মানের সঙ্গে কথাগুলো বলছি, তাঁদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে এবং অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তাঁদের অনেকের দলের সাংগঠনিক অবস্থানটা এতটা শক্তিশালী নয়। সে ক্ষেত্রে গণঅধিকার পরিষদের কিছুটা হলেও সেই অবস্থান তৈরি হয়েছে। যে দল থেকে সমাবেশে ২০ জন কর্মী আসে, তারাও তিনজন বক্তব্য দেন; আর যাদের ৫০০ বা হাজার কর্মী আসে, তাদেরও তিনজন বক্তব্য দেবেন। এটা আমরা প্রকাশ্যে বলতে চাইনি। আশা করি, গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা আমাদের অসন্তুষ্টির জায়গাটি খুঁজে বের করে আগামীতে কীভাবে নিজেদের ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে পারি- সে চেষ্টা করবেন। আর জোটকে সাত দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ১৭ দল ও সংগঠনকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়- সে বিষয়টি ভাববেন। আমি খোলামেলা বলি। অনেকে ভেতরে ভেতরে বলেন বা বলেন না। জোটের শরিকদের কেউ কেউ সরকারের সাথে লিয়াজোঁ করছেন এবং টাকা-পয়সা নিচ্ছেন।'

সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা’ প্রণয়ন করলে তাদের সাথে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে এই জোট। সেখানে জোটের শরিক গণঅধিকার পরিষদ অনুপস্থিত অনেক দিন। দলটির আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া ও সদস্য সচিব নুরুল হক নুরও গণতন্ত্র মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ ও গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলোতে থাকছেন না।

নুরুল হক নুর তার দলকে স্বকীয় অবস্থানে নিয়ে যেতে আলাদাভাবে বিএনপির সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীর দাবি তুলেছেন এ জোট থেকে বের হয়ে নিজেদের স্বকীয় অবস্থান তৈরির।—এমনটাই জানা গেছে একটি সূত্র থেকে।

গণঅধিকার পরিষদের সদস্যসচিব নুরুল হক নুরের মধ্যপ্রাচ্য সফর ও ওমরার সময় ইসরাইল রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট মেন্দি এন সাফাদির সাথে বৈঠকের খবর গণতন্ত্র মঞ্চে সাম্প্রতিক অসন্তোষের কারণ। পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নুরের ঐক্যপ্রক্রিয়ার উদ্যোগকেও ‘ভালো চোখে দেখছেন না’ গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা।

জোটের শরিক নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার বলেন, ‘গণঅধিকার পরিষদের নেতারা বলেছেন, কোনো এক অভ্যন্তরীণ কারণে তারা গণতন্ত্র মঞ্চের অনুষ্ঠানে আসবে না। এখন মঞ্চের শীর্ষ নেতারা বসবেন। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন গণতন্ত্র মঞ্চে গণঅধিকার পরিষদের ভূমিকা কী হবে।’ 

সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে এক মঞ্চে দাঁড়ানোর কথা থাকলেও তার ব্যতয় ঘটানোয় গণঅধিকার পরিষদকে নিয়ে চরম অসন্তোষ জেগেছে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্য দলগুলোর মধ্যে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘নুরের ভূমিকা নিয়ে মঞ্চের প্রশ্ন আছে। দলটির শীর্ষ নেতা রেজা কিবরিয়া কেন আমাদের মঞ্চের অনুষ্ঠানে আসেন না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আগামী ১৯ জানুয়ারি তাদের নিয়ে বসার কথা রয়েছে। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে সেদিন আলোচনা হবে।’

গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া ও যুগ্ম আহ্ববায়ক মো. রাশেদ খানও বলছেন, তরুণ ভোটারদের ‘বড় অংশ’ তাদের দলের দিকে ঝুঁকে থাকায় তারা আলাদা করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ছক কষছেন।

রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীরা বলছেন গণতন্ত্র মঞ্চে গিয়ে আমাদের খুব বেশি লাভ নেই। তো গণতন্ত্র মঞ্চ যে বিরাট কিছু করে ফেলবে তা আমি মনে করছি না। আমরা এখন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত। অন্য কিছু নিয়ে ভাবছি না। আমাদের ফোকাস হল দলটাকে শক্তিশালী করা।’

গণতন্ত্র মঞ্চে অনুপস্থিতি নিয়ে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি তো এটাকে (গণতন্ত্র মঞ্চ) গুরুত্ব দিতে চাইছিলাম না। দলের বেশির ভাগ নেতা মঞ্চকে বেশি গুরুত্ব না দিতে অনুরোধ করছে। আমাদের আগ্রহ কম। সরকারবিরোধী যেকোনো আন্দোলনে আমাদের সমর্থন থাকবে। এখন কোথায় কোন জোটে আমরা সময় দেব, কিভাবে মিটিং করব, সেটা সময়ের প্রশ্ন।’

নুরের প্রতি বিশ্বাস আছে জানিয়ে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি নুরকে দেখে দলে আসছি। আমার মনে হয় না সে কখনও দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করবে। আমি নুরকে বিশ্বাস করি। সে দলের শক্তি বাড়ানোর জন্য কাজ করছে।’ 

তবে এ বিষয়ে নুরুল হক নুরকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। 

বিএনপির সাথে আলাদা বৈঠকের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ অনেক দিনের। রাজনৈতিক দল হিসেবে কি আমরা আলাদা বসতে পারি না?’

নিউজনাউ/আরএইচআর/পিপিএন/২০২৩

X