alo
ঢাকা, শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২২, ১১:২৩ এএম

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস
alo

নিউজনাউ ডেস্ক: আজ ৩০ আগস্ট। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। সারা পৃথিবীতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক ভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সনদটি কার্যকর হয়, তাতে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর থেকে দিবসটিতে গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং সেই সঙ্গে তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

এদিকে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। আসকের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ২৮ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ৫ জন ফেরত এসেছেন। এখনো ১১ জন গুম রয়েছেন।

এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনরা অভিযোগ তুলেছেন। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ৫৭ জন ফেরত এসেছেন। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার, স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন যে বিশেষ বাহিনী-র‌্যাব, ডিবি পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচয়ে সাদা পোশাকে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রায়ই সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার বা আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে।

আসকের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, গুমের শিকার সব নিখোঁজ ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে খুঁজে বের করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়েরের জন্য একটি ব্যবস্থা করা। প্রতিটি গুমের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করতে হবে। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর করতে হবে। গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকে অস্বীকার না করে এ ধরনের ঘটনার বিচার নিশ্চিতে বিদ্যমান আইন কাঠামোতে পরিবর্তন করতে হবে।

২০১৯ সালের ১৯ জুন মিরপুরের মাজার রোডের প্রথম কলোনির ২১-এ/ই, লালকুঠির বাসা থেকে বের হওয়ার পর ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনকে গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিয়ে একদল ব্যক্তি ধরে নিয়ে যায়। পরদিন ছোট ভাই খায়রুল শাহআলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও এখনো পুলিশ কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। ইসমাইলের মেয়ে আনিসা ইসলাম ইনসা বলেনÑ ‘বাবা বেঁচে আছে কিনা, কোথায় আছে সেটা আমরা জানতে চাই। বাবার অপেক্ষায়। বাবাকে ফিরিয়ে দেন, বাবাকে ফিরিয়ে দেন।’

গুম হওয়া কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সেতুর স্ত্রী জিনিয়া বলেন, স্বামীর সন্ধানে সবার কাছে গিয়েছি। মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের নেতা থেকে শুরু করে পুলিশ ও র‌্যাবের দপ্তরে ধরনা দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। বিভিন্ন ব্যক্তি স্বামীকে উদ্ধার করার জন্য টাকা চেয়েছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জনকে প্রায় ১ কোটি টাকা দিয়েছি। তারপরও স্বামীকে পাইনি। এটা তো আমাদের সরকার। আমরা কেন গুম হব?’

২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন তপুকে ভাটারা থানাধীন বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে একদল ব্যক্তি ধরে নিয়ে যায়। প্রায় সাড়ে ৬ বছর পরও তপু ফিরে আসেনি। তপুর মা বলেন, আমি তো আজও বিশ্বাস করতে পারি না যে আমাদের সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আমার ছেলে গুম হবে। আমি কার কাছে বিচার দিব? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার তপুকে ফিরিয়ে দিন। তপু কোনো দোষ করলে তার বিচার করুন। তাই বলে মায়ের আঁচল আপনি খালি করে রাখবেন না।’

বিএনপির ঢাকা মহানগরের নেতা চৌধুরী আলমের মেয়ে মাহফুজা আক্তার বলেন, ‘আমার বাবাকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আমি তখন ছোট ছিলাম। এখন বড় হয়েছি। আমার বাবাকে আমি প্রত্যেক দিন স্বপ্নে দেখি। আমরা আর কত কাঁদব। আমার বাবাকে ১২ বছর আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। টেনেহিঁচেড়ে গাড়িতে তোলা হয়েছে। যারা ধরে নিয়ে গেছে তারা বলেছে যে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক। আমরা তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছি যে, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও। কিন্তু আমার বাবার তারা সন্ধান দিচ্ছে না।’

২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর পল্লবী এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তৎকালীন সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুকে (৩১) ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। গতকাল পিন্টুর বোন রেহেনা বেগম বলেন, ‘ছেলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমাদের বাবা দুই বছর আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। আমরা আমাদের ভাইকে ফিরে পেতে এখনো অপেক্ষা করছি। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি যে আমার ভাইকে ফিরিয়ে দিন।’

২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি র‌্যাবের পোশাক পরিহিত একটি টিম তুলে নিয়ে যায় বিএনপি নেতা সাদেকুলকে। সাদেকুলকে খুঁজে বের করতে র‌্যাব তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু আজও সাদেকুলকে ফেরত পায়নি তার পরিবার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ১৯৭০ ও ৮০-র দশকে কেবল অবৈধ অস্ত্র কারবারি ও ভিন্নমতাবলম্বীরাই গুম হতেন। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নেতা, মাদক কারবারি ও মানব পাচারকারীদের মধ্যেও গুমের ঘটনা দেখা যায়।

আজ সারা দেশে মানববন্ধন করবে বিএনপি : আন্তর্জাতিক গুম  প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ দুপুর ১২টায় নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

গণমাধ্যমে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘যেকোনো দেশের নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধানতম দায়িত্ব। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গুম করাকে প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করেছে। আমি জাতিসংঘের অধীনে সব গুমের তদন্তের দাবি করছি।’

গুম হওয়া নেতাকর্মীদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাকের আহ্বায়ক সানজিদা ইসলাম তুলি গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের বাইরে আমেরিকায় জাতিসংঘের সদর দপ্তর, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া পার্লামেন্টের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবেন প্রবাসী বিএনপি নেতারা। এর মধ্যে আমেরিকায় যে কর্মসূচি পালন করা হবে সে কর্মসূচিতে অংশ নেবেন গুম হওয়াদের স্বজনদের একটি অংশ। এছাড়া ঢাকায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে সকাল ১০টায় মায়ের ডাক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।’


নিউজনাউ/এবি/২০২২

X