alo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা জাগাচ্ছে হারপেস সিম্প্লেক্স ভাইরাস

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ০৮:০৭ পিএম

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা জাগাচ্ছে হারপেস সিম্প্লেক্স ভাইরাস
alo

নিউজনাউ ডেস্ক: খুব সাধারণ একটি ভাইরাস দিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন এক গবেষণায় বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্যে। দেশটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাস শরীরের ক্ষতিকর কোষকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে দেয়।

ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ এবং রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট নামের দু’টি ব্রিটিশ সরকারি সংস্থা যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন।

নতুন এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে একজন রোগী ইতোমধ্যেই একজন ক্যান্সার থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেছেন; এবং অন্য কয়েকন রোগীর টিউমার টিউমার সঙ্কুচিত বা ছোট হয়েছে বলে বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

 চিকিৎসায় যে ভাইরাসটি ক্যান্সারের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তার নাম হারপেস সিম্প্লেক্স। মানবদেহে এই ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটলে সাধারণ ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

তবে রোগীদের দেহে প্রয়োগের আগে ভাইরাসটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে উল্লেখ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য হারপেস সিম্প্লেক্সে ভাইরাসটির নাম দেওয়া হয়েছে পি টু।

ইন্সটিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ এবং রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ক্যান্সার বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের দাবি, তাদের গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক। তবে এ বিষয়ে আরো বড় পরিসরে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন।

পাশপাশি তারা আশা করছেন, যেসব রোগীর দেহে ইতোমধ্যেই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে (অ্যাডভান্সড স্টেজ) অথবা যারা জটিল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, এই চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

ব্রিটেনে ক্যান্সার চিকিৎসক এবং সাউথেন্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ভাইরাস দিয়ে যেমন ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়, তেমনি এটি দিয়ে ক্যান্সারেরও চিকিৎসা করা হচ্ছে।’

এই চিকিৎসা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে তিনি আরও বলেন, " যে কোনো ভাইরাস যখন শরীরে প্রবেশ করে তখন তা খুব দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে যে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হবে তার অ্যান্টিজেন দিয়ে ভাইরাসটিতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে সেটি শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতাকে চাঙ্গা করবে। আমরা এখানে এই পদ্ধতিরই প্রয়োগ ঘটিয়েছি।’

একজন রোগীর কথা

নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে ইতোমধ্যেই ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। ওই ব্যক্তির ইচ্ছানুসারে তার নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

লন্ডননিবাসী ৩৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি বিবিসিকে জানান, ২০১৭ সালে যে তার মুখের কাছে লালাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ধরা পড়ে।

অপারেশন করেও তার কোনো লাভ হয়নি। অন্যান্য চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছিল কিন্তু দেখা গেল তার শরীরে ক্যান্সার আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ছে।

‘আমাকে বলা হলো আর কিছু করার নেই। সব চিকিৎসাই করা হয়ে গেছে। আমি তখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। খুবই মারাত্মক এক সময় পার করছি। তখনই আমি এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাই।’

তার পর গবেষণার অংশ হিসেবে ওই ব্যক্তির দেহে ভাইরাল থেরাপি প্রয়োগ করা হলো এবং বিস্ময়করভাবে দেখা গেল—তার দেহ থেকে ক্যান্সার উধাও হয়ে গেছে।

‘পাঁচ সপ্তাহ ধরে আমাকে ইনজেকশন দেওয়া হলো। দেখা গেল এটি আমার দেহের ক্যান্সার ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রায় দু'বছর হয়ে গেল আমি ক্যান্সার থেকে মুক্ত,’ বিবিসেকে বলেন তিনি।

যেভাবে কাজ করে এই থেরাপি

ডা. ইমতিয়াজ আহমেদে বিবিসিকে বলেন, এই চিকিৎসায় ইনজেকশনের মাধ্যমে রূপান্তরিত হারপেস সিম্প্লেক্স ভাইরাসটি সরাসরি টিউমারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মানবদেহে প্রবেশ করানোর পর এই ভাইরাসটি দু’ কাজ করে।

‘প্রথমত ভাইরাসটি ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষের ভেতরে ঢুকে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেই আক্রান্ত কোষগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং দ্বিতীয়ত এটি রোগীর দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তোলে।’

‘ক্যান্সার হলে মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এই থেরাপি তার সেই ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং তার ফলে রোগী দেহে ক্যান্সার প্রতিরোধে লড়াই আরও জোরদার হয়।’

সম্প্রতি এই গবেষণার ফলাফল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চিকিৎসা সংক্রান্ত এক সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে: নয় জন রোগীর মধ্যে তিনজনকে শুধু আর পি টু ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, যাদের টিউমার ছোট হয়ে গেছে।

এছাড়া ত্রিশ জনের মধ্যে সাতজনকে ইনজেকশনের পাশাপাশি অন্যান্য চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।

বিবিসিকে ডা. ইমতিয়াজ জানান. প্রায় ৪০ জন রোগীর দেহে এই ভাইরাল থেরাপির পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কোনো কোনো রোগীকে শুধু ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। অন্যদেরকে ইনজেকশনের পাশাপাশি ক্যান্সারের অন্যান্য ওষুধও দেওয়া হয়েছে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম

গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বিবিসিকে বলেন, চিকিৎসায় যে ফল পাওয়া গেছে তা ‘সত্যিই আশাব্যঞ্জক।’

‘অন্ননালী এবং চোখের ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় এই থেরাপি বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। সাধারণত গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে এতো ভালো ফল পাওয়া বিরল ঘটনা,’ বিবিসিকে বলেন তিনি।

এর আগেও অবশ্য ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভাইরাল থেরাপি ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানীরা। কয়েক বছর আগে ত্বকের ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই চিকিৎসার নাম দেওয়া হয়েছিল টি-ভেক।

যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ক্যান্সার রিসার্চ ইউকের কর্মকর্তা ডা. মেরিন বেকার বলেন, "ভাইরাস দিয়ে যে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায় বিজ্ঞানীরা সেটা ১০০ বছর আগেই আবিষ্কার করেছেন। তবে সেসব চিকিৎসার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ব্যাপারে তেমন একটা নিশ্চয়তা ছিল না।’

তবে ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের গবেষনায় যে সাফল্য পাওয়া গেছে, তা ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

নিউজনাউ/এবি/২০২২

X