নাঈমুল ইসলাম খান কখনোই কাউকে অনুসরণ করেন না, এমনকি নিজেকেও না

 

প্রভাষ আমিন : আমি সবসময় বলি অনেক সমালোচনা থাকলেও বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টির শিরোনাম নাঈমুল ইসলাম খান। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর সবকিছুতে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। সংবাদপত্রের পরিবর্তনটা এসেছিল নাঈমুল ইসলাম খানের হাত ধরে, আজকের কাগজ নামে। এর আগে ‘খবরের কাগজ’এর মাধ্যমে বদলে দিয়েছিলেন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের প্রচলিত ধারণা। বিশিষ্টজনদের ক্ষুরধার লেখনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। সেই ‘খবরের কাগজ’এর ধারণাটাই বিস্তৃত হলো দৈনিক আজকের কাগজে। কলামের ঠাই হলো দৈনিকেই। আজকের কাগজ স্মার্ট, আধুনিক, গদ্য ঝরঝরে, ভাষায় বাহুল্য নেই, বিবরণে আধিক্য নেই। জনাব, সর্বজনাব, মাননীয়, মহামান্যের অত্যাচার থেকে মুক্তি মেলে পাঠকের। আজকের কাগজ পড়তে পাশে অভিধান লাগে না। মানুষ বিস্মিত- আরে এতো আমাদের মত করে লিখছে! প্রথম পাতায় তিন লাইন নিউজ পড়ে বাকিটার জন্য অত বড় পত্রিকা হাতড়াতে হয় না। আজকের কাগজ দারুণ চমক, দারুণ রিলিফ। সেই আজকের কাগজের হাত ধরে, ভোরের কাগজ হয়ে আজকের প্রথম আলোর বিকাশ। যুগান্তর, সমকাল, কালের কণ্ঠও এই ধারারই অনুসারী। এরপর নাঈমুল ইসলাম খান এলেন ‘আমাদের সময়’ নিয়ে। আবার চমক, আবার আলোড়ন। মাত্র দুই টাকায় পূর্ণাঙ্গ দৈনিক! ধারণাটাই অভিনব। বাহুল্য-মেদ যা ছিল, এবার তাও ঝরে গেল। আজকের কাগজ ধরনের দৈনিকগুলো পাঠককে সারাদিন ব্যস্ত রাখে। আর ‘আমাদের সময়’ ধর তক্তা, মার প্যারেক স্টাইল। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই। ব্যস্ত মানুষ একপলক চোখ বুলিয়েই জেনে নেবে প্রয়োজনীয় খবর। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে দুটি জনপ্রিয় ধারার শুরুটা নাঈমুল ইসলাম খানের হাত ধরে। নাঈমুল ইসলাম খানের আজকের কাগজকে অনুসরণ করে আজ বাংলাদেশে অনেক দৈনিক। আমাদের সময়ের ঘরানারও একাধিক দৈনিক আছে বাজারে। তিনি এখন আমাদের নতুন সময় গড়ছেন। আমি জানি এটি শুধু নামে নয়, কার্যত ‘নতুন’ই হবে। মজাটা হলো নাঈমুল ইসলাম খান কখনোই কাউকে অনুসরণ করেন না, এমনকি নিজেকেও না।
নাঈমুল ইসলাম খানের অনেক ভক্ত যেমন আছে, আছে তীব্র সমালোচকও। আমি নাঈম ভাইয়ের গুনমুগ্ধ ভক্ত, তবে সমালোচনাগুলোও জানি। সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, তিনি গড়তে জানেন, কিন্তু সেটা ধরে রাখতে পারেন না, নিজের প্রতিষ্ঠানে নিজে থাকতে পারেন না। এর অনেক প্রমাণ আছে হাতেনাতে। তিনি আজকের কাগজ গড়েছেন, কিন্তু থাকতে পারেননি; ভোরের কাগজ গড়েছেন, থাকতে পারেননি। আমাদের সময়ও তিনি তার দখলে রাখতে পারেননি। অভিযোগ হলো এই থাকতে না পারার সাথে আর্থিক নানা ব্যাপার-স্যাপার আছে, যেটা পরিস্কার নয়। অভিযোগ শুনেছি, সত্য-মিথ্যা জানি না। তাই বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিছুই করি না। হতে পারে, নাও হতে পারে। পেশাদার সাংবাদিকদের পত্রিকা প্রকাশ করতে গেলে কারো না কারো কাছ থেকে টাকা নিতে হবেই। তবে সেই দেয়া-নেয়ার বিষয়টি স্বচ্ছ হতে হবে। নাঈম ভাই কেন তার নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারেন না বা কেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, এটা কি নিছক দুর্ভাগ্য নাকি লেনদেনের প্রক্রিয়ায় সত্যি সত্যি কোনো অস্বচ্ছতা আছে; সেটা নাঈম ভাইকেই খুজে বের করতে হবে। পত্রিকা গড়ে সেটা বিক্রি গড়ে দেয়ার অভিযোগও আছে নাঈম ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তার পত্রিকা তিনি বিক্রি করবেন না রাখবেন, সেটা তার ব্যাপার। তবে একটি পত্রিকা প্রকাশের পর তার কাগজে-কলমে মালিকানা যারই হোক, পাঠকদেরও কিন্তু একধরনের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই বাধ্য হয়ে মালিকানা বদলাতে হলেও পাঠকদের এক ধরনের অনুমতি নিতে হয়। নাঈম ভাইয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ, তিনি তার সহকর্মীদের কম বেতন দেন বা ঠকান। অবশ্য এ অভিযোগটি আপেক্ষিক। বেতন কম না বেশি সেটার মানদন্ড কী? সবাই মনে করেন, তাকে যোগ্যতার চেয়ে কম বেতন দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকরা বেতন বেশি পেলে, সুযোগ-সুবিধা পেলে আমাদেরই ভালো। তার কোনো না কোনো প্রভাব আমার ওপরও পড়বে। তবে সবার তো প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মত সুযোগ-সুবিধা দেয়া সামর্থ্য নাও থাকতে পারে। কারো যদি মনে হয় নাঈম ভাই তাকে ঠকাচ্ছেন, তিনি চলে যাবেন। যতক্ষণ যাচ্ছেন না, ততক্ষণ ধরে নিতে হবে সেটাই তার যোগ্য বেতন। তবে আমি দাবি করছি, নাঈম ভাই যেন তার স্টাফদের যৌক্তিক বেতন দেন। তবে কম দিলেও নাঈম ভাই সময়মত বেতন দেয়ার চেষ্টা করেন।
এত সমালোচনার পরও আমি নাঈম ভাঈয়ের ভক্ত। কারণ ভিন্নমতকে ধারণ করার, পরমতসহিষ্ণুতার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার। নাঈম ভাইয়ের কঠোর সমালোচনার লেখাটিও তার পত্রিকায়ই ছাপা হওয়া সম্ভব। পিতার একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তার পত্রিকাতেই রিপোর্ট লেখা সম্ভব। টক শো’তে তিনি কখনোই জানতে চান না, তার সাথে কে আছে। তাৎক্ষণিক যুক্তি তৈরির অসাধারন ক্ষমতা আছে নাঈমুল ইসলাম খানের। অবস্থাটা উপস্থিত বিতর্কের মত। তিনি যে কোনো পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন। দুই পক্ষের যুক্তিই অকাট্য মনে হবে। তার মত ফ্লেক্সিবল মানুষ আমি খুব বেশি দেখিনি। সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেছেন। তার পুরো ক্যারিয়ার সাংবাদিকতা নিয়েই। এমনকি ভোরের কাগজের পর কিছুদিন যে বিসিডিজেসি নামের এনজিও করেছেন, তাও সাংবাদিকতা নিয়েই। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকতের বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার বড় কৃতিত্ব নাঈমুল ইসলাম খানের।
আমার বন্ধুদের অনেকেই নাঈম ভাইয়ের সাথে কাজ করার স্মৃতিচারণ করেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আমার হিংসা হয়। কারণ আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই, আমি নাঈম ভাইয়ের সঙ্গে কখনো কাজ করিনি। কাজ যে করিনি, এটা নাঈম ভাইও ভুলে যান, আমিও মাঝে মধ্যে ভুলে যাই। একবার নাঈম ভাই বললেন, আমি আজকের কাগজ-ভোরের কাগজের একটা পুনর্মিলনী করবো। তুমি তালিকা করে দাও। আমি বলি, আমি কিভাবে তালিকা করবো। আমিই তো সেই তালিকায় নেই। শুনে নাঈম ভাই অবাক হন। নাঈম ভাই যখন খবরের কাগজ করেন, আমি তখন সাপ্তাহিক বিচিন্তায়। নাঈম ভাই আজকের কাগজ যখন খ্যাতির শীর্ষে, আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায়। আমি যখন ভোরের কাগজে যোগ দেই, তার আগেই নাঈম ভাই আউট। তবে নানাভাবে লেখালেখি করে নাঈম ভাইয়ের সাথে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। আমি জানি, কোনো না কোনো একদিন নাঈম ভাইয়ের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হবে আমার। নাঈম ভাইও পুরোদস্তুর সাংবাদিক, আমিও। আমাদের দেখা হবেই। নাঈম ভাই বেতন দেন না, কম বেতন দেন। কিন্তু ফেসবুকে কোনো সাংবাদিকের বেকারত্বের খবর পেয়ে তাকে ডেকে এনে সম্মানের সাথে চাকরি দেয়ার সাহস কয় জনের আছে? ভুল করলে নিজের পত্রিকায় বড় করে ক্ষমা চাওয়ার সাহস কয়জনের আছে? ঝুকি নিয়ে একটার পর একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার সাহস কয়জনের আছে?
একসাথে কাজ না করলেও নাঈমুল ইসলাম খানের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। দূর থেকে দেখেই শিখেছি অনেক। সাংবাদিকতার মূল যেই সুর- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতকে ধারণ করা, যুক্তি দিয়ে জবাব দেয়া; আমি তার কাছে প্রতিদিন শিখি।
শুভ জন্মদিন নাঈমুল ইসলাম খান। আপনি শতায়ু হোন। আপনি বেশিদিন বাঁচলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আরো নতুন নতুন আইডিয়া পাবে।

লেখক :প্রভাষ আমিন, বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ। (ফেসবুক থেকে নেওয়া)

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...
হাইকোর্টে অর্থ পাচারকারীদের নাম-পরিচয় দাখিল শুনানি আজ-জামিন চেয়েছেন কার্টুনিস্ট কিশোর-ভাসানচরে যাচ্ছে ওআইসির প্রতিনিধি দল-প্রেসক্লাবে ছাত্রদলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ-মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী মিছিলে গুলিতে নিহত ১-১২ ম্যাচ বাকি থাকতেই শিরোপার কাছে সিটিজেনরা-স্বাস্থ্যের গাড়িচালক মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি আজ-হালি দিয়ে দুইয়ে এমবাপ্পেরা-এসিআর বদলে আসছে এপিএআর-আরও একধাপ পেছালো জুভেন্টাস