alo
ঢাকা, সোমবার, ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৩ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে একই মঞ্চে ৩ বিয়ে, 'রাজকন্যাদের' উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২২, ১০:৫১ এএম

চট্টগ্রামে একই মঞ্চে ৩ বিয়ে, 'রাজকন্যাদের' উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
alo

 

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম ব্যুরো: আলো ঝলমলে মঞ্চে যাদের দেখছেন, সবাই বলছে তারা রাজকন্যা। তবে তাদের নেই কোন রাজ্য, কারণ তাদের যে স্বীকৃত বাবা- মা নেই। তাহলে কিভাবে তারা রাজকন্যা হলেন? সেই গল্পই আজ আপনাদের বলবো আমরা।

বিয়ের মঞ্চে পরীর সাজে থাকা এই তিন অভিভাবকহীন কন্যাদের দেড়মাস, ২ ও ৪ বছর বয়সে ঠাঁই হয়েছিল চট্টগ্রামের রউফাবাদের
সমাজসেবা অধিদফতরের 'ছোটমনি নিবাসে'। এরপর শুরু তাদের সংগ্রামের জীবন। যদিও সেই জীবন তারা পেছনে ফেলেছেন বৃহস্পতিবার (১৩ অক্টোবর) রাতে। কারণ তাদের বিয়েতে যে স্বর্ণালঙ্কারসহ উপহার পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাবার দায়িত্বে তাদের বিয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান। এছাড়াও তাদের অভিভাবক হয়ে কে আসেননি এই বিয়েতে? এমপি, একুশে পদকপ্রাপ্তরা, চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার, ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ছিলেন বিয়ের অতিথি হয়ে।

রাজকন্যার সাজে থাকা দেড় মাস বয়সে শিশু নিবাসে আসা মর্জিনা আক্তার এখন স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ২৩ বছরের ওই তরুণী বিয়ের মঞ্চে বসলেন মা ও শিশু হাসপাতালে অফিস সহায়ক ওমর ফারুকের সাথে।
 

আরেক কনে তানিয়া আক্তার শিশু পরিবারে থাকার পাশাপাশি মা ও শিশু হাসপাতালে অ্যাটেনডেন্টের কাজ করেন। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ থেকে। তার সাথে বিয়ে হলো বিআরটিসি এলাকার ফলমণ্ডীর ফলব্যবসায়ী  হেলাল উদ্দিনের সাথে। 

No description available.


আর আদালতের নির্দেশে চার বছর বয়সে ছোটমনি নিবাসে আনা হয়েছিল হারিয়ে যাওয়া মুক্তা আক্তারকে। ২০ বছর বয়সী এই মুক্তার সাথে বিয়ে হচ্ছে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ নুরউদ্দিনের। মুক্তাও একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে। 

ওদের অভিভাবক এখন সরকার। এই তিন কন্যার জমকালো আয়োজনে বিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর।

চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাবে এই বিয়ে অনুষ্ঠানে ছিলো না কোনো কমতি। নিয়ন আলোতে সাজানো হয় অফিসার্স ক্লাব। আমন্ত্রিতদের জন্য আয়োজন করা হয় রাজকীয় ভোজ। 

মেয়ে পক্ষের হাজারের অধিক আমন্ত্রিতরা এসেছিলেন বিয়েতে। বিয়েতে আমন্ত্রিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তবে তিনি উপস্থিত থাকতে না পারলেও তিন কন্যার জন্য পাঠিয়েছেন উপহার।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান নিউজনাউকে বলেন, ‘ওরা জন্মের পরই পরিচয়হীনভাবে বেড়ে উঠেছে। তবে আমরা চাই না তারা পরিচয়হীনভাবে বাকি জীবনটুকু কাটাক। তাই আমরা তাদের পিতার দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের মেয়ের বিয়ের মত করেই জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিয়ের আয়োজন করেছি। সাধারণ দশটা বিয়েতে যেসব আনুষ্ঠানিকতা মানা হয় আমরা তার সবগুলোই মানার চেষ্টা করেছি। আমরা আমাদের মেয়েদের অলংকার থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর আসবাবপত্রও দিচ্ছি। তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিশ্চয়তার জন্য ফিক্সড ডিপোজিটও করে দিয়েছি।’

এত আয়োজন কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তাদের পরিবার নেই, বাবা নেই। তাই তারা যেন কখনও এই অভাবটা বোধ না করতে পারে সেজন্যই আমাদের এত আয়োজন। আমার মেয়ের বিয়েতে আমি যে দায়িত্ব পালন করতাম, ঠিক এই তিন মেয়ের বিয়েতেও আমি সেইম দায়িত্ব পালন করছি। ওরা আমাদেরই মেয়ে। আমাদের পরিচয়েই তারা বাকি জীবন কাটাবে।’

No description available.

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ পরিচালক ফরিদুল আলম নিউজনাউকে বলেন, 'ছোটমনি নিবাস ও সরকারি শিশু পরিবারে বিভিন্ন বয়সী অভিভাবকহীন শিশুদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমরা সহযোগিতা করে থাকি। তারা থাকার পাশাপাশি পড়ালেখা করে থাকে। ভালো ফল করলে তাদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় পড়ালেখাও করানো হয়। এ মেয়ে তিনটিও ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমাদের এখানে বড় হয়েছে। পরবর্তীতে বিশেষ অনুমতিতে তারা এখানে ছিল। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তিন মেয়ের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।'

তাদের অভিভাবক নেই উল্লেখ করে ফরিদুল বলেন, 'আমরাই তাদের অভিভাবক। চেষ্টা করি তাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হয়েছে।'

এমন বিয়েতে এসে ভীষণ আনন্দিত অতিথিরাও,  কেউবা তুলছেন সেলফি, কেউবা ব্যস্ত গল্প, আড্ডা, খাওয়া দাওয়ায়।

আর বাবার মতো করেই সব দিক সামলাচ্ছিলেন জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান। কখনো বা তিনি ব্যস্ত ফোনে কখনো বা তিনি ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। 

জানা গেছে তিন কনের প্রত্যেককে দুই ভরি স্বর্ণালংকার এবং দুই লাখ টাকা করে ফিক্সড ডিপোজিটের ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া প্রত্যেক যুগলকে একটি করে ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও দেওয়া হয়েছে। এমন বিয়ের কন্যাদের রাজকন্যা তো বলা যেতেই পারে।

নিউজনাউ/পিপিএন/২০২২

X