alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিবির-ছাত্রদল থেকে এখন ছাত্রলীগের বড় নেতা

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১০:১৩ এএম

শিবির-ছাত্রদল থেকে এখন ছাত্রলীগের বড় নেতা
alo


রাজশাহী ব্যুরো: আদর্শের দিক থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও শিবির ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মীরা পক্ষ বদলে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দিচ্ছেন। শুধু ছাত্রলীগ নয়, মূল দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদেও জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় যোগ দিচ্ছেন বলে সারাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত খবর পাওয়া যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত-বিএনপি ও শিবিরের নেতাকর্মীদের দলে অন্তর্ভুক্তি আওয়ামী লীগের জন্য অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

শিবির কিংবা ছাত্রদল নেতাদের ছাত্রলীগ হয়ে যাওয়া নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হলেও বিষয়টি এখন আর কানাঘুষা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাকিবুল ইসলাম রানা। ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। পরে ২০১৬ সালে রাজশাহী কলেজ মুসলিম হল শাখা ছাত্রদলের ৬ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হন। শুধু ছাত্রদল করাই নয়, নারীর সঙ্গে অশ্নীল ভিডিও ভাইরাল, অনৈতিক প্রস্তাব, মদ্যপ অবস্থায় নগরীতে মাতলামি করার সময় এলাকাবাসীর পিটুনি খাওয়াসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, সভাপতি হওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়ের বাড়ির বাজার করা, ফরমায়েশ খাটাসহ ছোটখাটো সব কাজই করে দিতেন সাকিবুল ইসলাম রানা। এ কারণে জয়ের মা-বাবার স্নেহের পাত্র বনে যান এই সাবেক ছাত্রদল নেতা। মায়ের আবদারেই রানাকে রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বানান জয়। পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রী সুপারিশ ও সমর্থন করেন তাঁর জন্য।

অভিযোগ শুধু রানার বিরুদ্ধেই নয়; গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র ঘোষিত ৩০ সদস্যের রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের অনেক নেতার বিরুদ্ধেই রয়েছে নানা অভিযোগ। মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন, মদ-ফেনসিডিল খেয়ে মাতলামি করা এবং ছাত্রদল করার অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজ মুসলিম ছাত্রাবাসের ৮ সদস্যের কমিটির ৬ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সাকিবুল ইসলাম রানা। টানা তিন বছর এই কমিটির সক্রিয় নেতা ছিলেন তিনি। তবে ২০১৯ সালের দিকে ছাত্রদলের কমিটিতে থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকায় গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা হওয়ার জন্য তদবির শুরু করেন। ছাত্রদল করার আগে শিবির করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মুর্ত্তজা ফামিন বলেন, রানা রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের নেতা। কলেজের মুসলিম হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আমাদের সঙ্গে ছাত্রদলের মিছিল-মিটিং করতেন। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সারাদেশের কলেজ ও হল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার আগেই লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। হঠাৎ একদিন জানতে পারি, রানা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছেন। অথচ হল শাখার নেতা হিসেবে ছাত্রদলের অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন তিনি।

রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রকি কুমার ঘোষ বলেন, সাকিবুল ইসলাম রানা আগে শিবির, পরে ছাত্রদল করত। সক্রিয় নেতা হিসেবে মিছিল-মিটিং করত। তার বিরুদ্ধে একবার সাইকেল চুরির অভিযোগও উঠেছিল নগরীর দরগাপাড়ায়। এসব অভিযোগের কারণে তাকে মুসলিম হল থেকে বের করে দিয়েছিলাম। এখন সেই রানাই জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি।

রানার যত অপকর্ম: গত ২৫ আগস্ট রাত আড়াইটায় নগরীর ঘোষপাড়ায় অস্ত্র হাতে মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করছিলেন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানা ও যুগ্ম সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম শান্ত। এলাকাবাসী তাঁদের থামাতে গেলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। পরে রানা, শান্তসহ তাঁদের সহযোগীদের পিটুনি দেন স্থানীয়রা। 

এছাড়া সম্প্রতি এক নারীর সঙ্গে রানার অশ্নীল ভিডিও ভাইরাল হয়। হাতে শাঁখা পরা ওই নারীর পরিচয় জানা না গেলেও রানাকে পরিস্কার দেখা গেছে ভিডিওতে। এদিকে, রানার আরেকটি অডিও ফাঁস হয়। চার মিনিট ২৯ সেকেন্ডের ওই অডিওতে এক নারী ছাত্রলীগ নেত্রীকে বিছানায় আসার এবং আরেক নারীকে পাঠাতে বলেন রানা। এতে রানা বলেন, 'তুমি আমার সাথে নাটক করিচ্ছো তাই না?' মেয়েটি বলেন, 'কিসের নাটক ভাইয়া?' রানা- 'তোমার কথা-কাজে মিল পাচ্ছি না। চিটারি করতে পারবা না। বহুত বড় চিটারি-বাটপারি কইরি আমি প্রেসিডেন্ট হইছি। সব চিটারের দলের সর্দার আমি। তুমি না হয়, আসতে চায়া আসলে না, কাকে যে পাঠাতে চাইলে সে কই? একজনের সাথে কইরি তুমি যদি বড় নেত্রী হও, সেটা মানুষ মাইনি লিতে পারে না, তুমি বুঝ না?' মেয়েটি জানান, 'এগুলো তো ভাইয়া অবান্তর কথা, আর আমার ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দরকার নাই। আমি যথেষ্ট ভালো আছি। সংগঠনটাকে ভালোবেসেই আসছিলাম।' রানা- 'তাহলে শোন ঠিক আছে আর শান্ত-মান্তর কোনো বেল নাই।' মেয়েটি- 'তো ভাইয়া আপনি মেয়ের কথা কালকে বলছিলেন, তো আমি ছবি পাঠাইছিলাম।' রানা- 'দেখ দেখ পাঠাতে পারো নাকি?' মেয়েটি- 'উনিও তো ফ্যামিলির সঙ্গে থাকে।' রানা- 'এখন আটটা বাজে। কী এমন রাত? দেখ দেখ ফোন দাও। পাঠাও। কেউ যেন না জানে।' মেয়েটি- 'কে জানবে, আপনি আমাকে ভরসা করতে পারেন।'

এসব বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানা বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের ভেতরের কেউই ষড়যন্ত্র করছে। জয় ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক। জয় ভাইয়ের মা শুধু আমাকে নয়, সারাদেশের নেতাকর্মীদেরই ভালোবাসেন। আমি জয় ভাইকে মেইনটেন করতাম। তিনি যখন সভাপতি হননি, নেতা ছিলেন না, তখনই তাঁর সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। জয় ভাই আমাকে অনেক স্নেহ করেন। ভাই ছাড়াও অনেকের সুপারিশ ছিল আমাকে সভাপতি করার জন্য।'

ছাত্রদলের কমিটিতে থাকা এবং মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে ছবিতে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমার ছবি এবং নাম এডিট করে কেটে লাগিয়েছে। এটা ষড়যন্ত্র। ছবি দেখেন গলাকাটা। কমিটি দেখেন আমাকে ৬ নম্বরের পরে লাগাইছে।' অশ্নীল ভিডিও ভাইরালের বিষয়ে বলেন, 'সেটা আমি না। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।'

নিউজনাউ/আরবি/২০২২

X