ডাক্তারের জন্যও মুভমেন্ট পাস!

ডা. মোজাহিদুল হক রিপন

যে মুভমেন্ট পাস পাইতে গেলে ৪/৫ ঘণ্টার বেশি সময় চলে যায়। একটা ওয়েবসাইট বানাই দিলো, যেটাতে ঢুকাই যায় না। অথচ মুভমেন্ট পাস ছাড়া জরুরি সেবা প্রদানেও যাওয়া যাবে না!

রাস্তার মোড়ে মোড়ে ডাক্তারদের হয়রানি কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে। হাজার হাজার ডাক্তার বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতালে ডিউটি/ক্ষ্যাপ দেয়, তাদের বেশির ভাগেরই আইডি কার্ড নেই। কারন উক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এটা সরবরাহ করে না। তারা যদি হাসপাতালে ডিউটি না করে তাহলে আপনার বাবা, মা, বোন বা আত্মীয় স্বজন ই চিকিৎসা পাবে না। দিনের পর দিন করোনা রোগী বা সাসপেক্টেড করোনা রোগীর সেবা করে আসছে ডাক্তাররা। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মতো ডাক্তার করোনায় শহীদ হয়েছেন।

একজন পুলিশ আবার বললো তাদের মৃত্যুর সংখ্যা নাকি ডাক্তারের চাইতে বেশি! মৃত্যু বেদনাদায়ক, সেটা একজন হলেও। তবে মৃত্যু কোন ছেলেখেলা নয়, যে একবার ইচ্ছা করে মরে দেখি, পরে আল্লাহ মারবানে! অনেক ডাক্তার আছে যারা দুই চার বছর ডিউটি না করে বাসায় বসে আয়েশেই দিন পার করে দিতে পারেন। কিন্তু তাও তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিউটি করছেন।

কথায় কথায় বিদেশী ডাক্তারের প্রসঙ্গ তুলে আনে কিছু মানুষ। বিদেশী ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে গেলে যে কারি কারি টাকা লাগে এটাও মাথায় রাখতে হবে। অথচ এই করোনার সময়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদের দেশের ডাক্তাররা সঠিক সময়ে পায়নি পিপিই, পায়নি ভালো মাস্ক, পায়নি নিরাপত্তা। তবুও চিকিৎসা চালিয়ে গেছে। যা পেয়েছে সেটা আমাদের চিল্লাচিল্লির ফলে। কারণ আমরা চিকিৎসা দিতে চাই। যে শপথ নিয়ে এ পেশায় এসেছি সেটা পালন করতে চাই। যাতে আপনার পরিবারের কেউ চিকিৎসা পায়।

রাস্তায় শত শত মানুষ হাটছে, গাড়ি চলছে। অলিতে গলিতে দোকানপাটও খোলা। আর একজন ডাক্তারের গায়ে এপ্রন, গাড়িতে হাসপাতালের লোগো লাগানো তাকেই আটকাতে হবে?! আজ শ্রদ্ধেয় ম্যাডামের পাওয়ার আছে বলে ম্যাজিস্ট্রেটও মাফ চেয়েছে।
ম্যাডাম গাড়ি থেকে নামার পূর্বে খুব সুন্দর করেই পুলিশ সদস্যকে বুঝিয়েছেন। যখন পুলিশ সদস্য বেয়াদবি করছিলেন তখন উনি গাড়ি থেকে নেমে আসেন ও রাগান্বিত হোন। পুরো ভিডিও না দিয়ে খন্ড ভিডিও দিয়ে জনসাধারণের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কিন্তু আমার আপনার মতো পাওয়ারলেস সাধারণ ডাক্তারদের আটকালে আমাদের জরিমানা গুনে, পুলিশের গালমন্দ খেয়েই আসতে হতো, এবং এটা হচ্ছে এই কয়দিন ধরেই।

গত পরশু রাতে আমার এক ছোট ভাই রাত ৪টা পর্যন্ত চেষ্টা করেও মুভমেন্ট পাস নিতে পারে নাই। অথচ সকালে ওর আইসিইউ তে ডিউটি। ও চিন্তায় পরে যায়, পরে লুকিয়ে লুকিয়ে, অল গলি দিয়ে রিক্সা ভেঙে ভেঙে হাসপাতালে পৌঁছাইছে। কেন? একজন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর এভাবে হাসপাতালে যাওয়া লাগবে? প্রশ্ন তো করাই যায়, উত্তর আছে আপনার কাছে? যাকে দরকার, তাকে সম্মান ও স্পেস দিয়েই চলতে হবে। আর এটা যতদিন না হবে ততদিন, ডাক্তারও স্বস্তি পাবে না। আপনারাও স্বস্তিতে থাকতে পারবেন না। এই লকডাউনে, করোনা ভাইরাসের প্রকোপে কেউ এপ্রোন পড়ে নিশ্চয়ই পার্কে ঘুরতে যায় না। কমন সেন্স ডেভেলোপ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক (সহযোগী অধ্যাপক,গ্রেড-৪ কর্মকর্তা) এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উনার গায়ে এপ্রোন আছে, উনার গাড়িতে বিএসএমএমইউ এর স্টিকার এবং হাসপাতাল পরিচালক অফিসের সিলমোহর কৃত কাগজপত্র আছে। উনি পরিচয় দিয়েছেন উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক। এরপরও তিনি ডাক্তার কিনা এ প্রশ্ন করাটাই তো ধৃষ্টতা!

শতাধিক ফেলো কলিগদের লাশ মাথায় নিয়ে আমরা হাসপাতালে যাই #নিশ্চিত_করোনা_আক্রান্ত_রোগীদের নিরন্তর চিকিৎসা সেবা দিতে।তারপরও কেন এতো বার্গেনিং করবে পুলিশের ১২-৮ তম গ্রেডের কর্মকর্তারা ( যথাসম্ভব)? গাড়ি থামিয়ে সাধারণত কনস্টেবল গুলো কখনোই সালাম দেওয়া বা ভদ্র আচরণ করে না! এভাবে চললে – হাসপাতালও লকডাউন করে দিতে হবে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরার অধিকার কি তার নেই???

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, লকডাউন দেওয়া হয়েছে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ঠেকানোর জন্য। #যারা_করোনা_ভাইরাসের_বিরুদ্ধে_যুদ্ধ_করছে_তাদেরকে_ঠেকানোর_জন্য_নয়।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যাদের গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া আছে, তিনি পুলিশ কিনা কনফার্ম হওয়ার জন্য তার আইডি কার্ড কে দেখছে? তার নিজের মুভমেন্ট পাস আছে কি? এটা কে চেক করছে?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও মেডিকেল পার্সোনাল দের মুভমেন্ট পাস লাগেনা,কোন আইডি কার্ড ও লাগেনা।রেড ক্রস এর লোগো ই যথেষ্ট। করোনা কি বিশ্বযুদ্ধ নয়? WHO কোভিড-১৯ কে মহামারী ঘোষণা করেছে গত বছর শুরুর দিকেই। অতি আণুবীক্ষণিক এই জীবাণুর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বও একসাথে লড়ে পারছে না। মনে রাখতে হবে ও উপলব্ধি করতে হবে এখানে একমাত্র সর্বোত্তম ফ্রন্টলাইনার ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী। তারপর অন্যান্যদের নাম আসবে। সে পুলিশ হোক, সাংবাদিক হোক বা সমাজ সেবক হোক বা অন্য যাই হোক।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথাটাই বলতে হয়। “যখন তুমি কোন ভদ্রলোকের সাথে খেলবে তখন তোমাকে ভদ্রলোক হতে হবে, যখন তুমি কোন বেজন্মার সাথে খেলবে তখন অবশ্যই তোমাকে তার চাইতে বড় বেজন্মা হতে হবে। নচেত পরাজয় নিশ্চিত।”

লেখক: চিকিৎসক

+1
1
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: