যে কারণে আমার চোখে- সময় সেরা

১০ বছরের কিছু গোপন রহস্য ও না বলা কথা

নিউজনাউ ডেস্ক: টেলিভিশন মিডিয়ার দর্শক জরিপ নিয়ে নানা বিতর্ক শুধু দেশেই নয় সারা বিশ্বেই আছে। সেই বিতর্কঘেরা জরিপে গত ৮ বছর ধরেই সংবাদভিত্তিক চ্যানেল হিসেবে সময় টিভি এক নম্বরে আছে। আবার সব ক্যাটেগরির টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে সবাইকে টপকিয়ে এক নম্বরে আসার রেকর্ডও সময় টিভির ক্ষেত্রে অসংখ্যবার ঘটেছে। জরিপে সেরা হওয়া নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে কিন্তু আমি সময়-কে সেরা হিসেবে দাবি করি অন্য কোন কারণে।

পৃথিবীতে সাধারণত ভালো কিংবা সফল বিষয়গুলোকেই সবাই অনুকরণ করে। বাংলাদেশে টিভি মিডিয়াতে সময় টিভি একটি অনুকরণীয় মিডিয়া যেখানে এমন অনেক বিষয়ই আছে যা ‘সময় টিভি’ই প্রথম শুরু করেছে পরবর্তীতে অন্যরা তা করার চেষ্টা করেছে।

১. লাইভ ব্রডকাষ্টিংয়ে বিপ্লব:
লাইভ ব্রডকাষ্ট টেকনোলজিতে এখন ব্যাকপ্যাক, আইপিএনকোডার, সোস্যালমিডিয়া অনেক কিছু আবিষ্কার হলেও সময় টিভি যখন শুরু হয় তখন ছিল না এসবের কোন কিছুই। বিবিসি, সি.এন.এন এর লাইভ দেখে আমার মনের ভিতর স্বপ্ন জাগ্রত হতো এমন ধরণের কিছু আমাদেরকেও দেখাতে হবে, কিন্তু সেই সময় ওদের মতো নেই কোন টেকনোলজি, মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল মাত্র ২জি, ছিল না তেমন বাজেট। তারপরেও থমকে থাকিনি, নিজের ডেভেলপ করা ল্যাপটপ ব্রডকাষ্ট লাইভ টেকনোলজি দিয়ে শুরু হয় যাত্রা।

সিটিসেলের জুম আল্ট্রা এর মাত্র ২৫৬ কেবিপিএস এর ইন্টারনেট স্পীড দিয়ে শুরু হয় আমার লাইভ ব্রডকাষ্ট মিশন। ১৪টি ল্যাপটপ মাঠে নামিয়ে দেই এবং এগুলো দিয়ে লাইভ করার কাজে ফিল্ডে সহযোগিতা করার জন্য মাঠে থাকতো ৬ জনের আইটি টিম- (নাদিম, মাহমুদ, রবিন, শাহাদাত, কাওসার ও শিশির)।

সময় টিভির মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রথম চলমান লাইভ ব্রডকাষ্ট সম্প্রচার হয় যা আজও স্মরণীয়। পপসম্রাট আজম খানের মৃত্যুর পর তাঁকে বহনকারী লাশবাহী ভ্যান জাহাঙ্গীর গেট থেকে আজমপুর যাওয়া পর্যন্ত টানা ২:৩০ মিনিটব্যাপী সময় টিভি ছিল মুভমেন্ট লাইভে যা ছিল ওই আমলে প্রায় অকল্পনীয় বিষয়, তখন সময় টিভি ছিল পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে। এক হাতে একটি ল্যাপটপ হাতে টানা আড়াই ঘন্টা লাইভ করেছিল মাষ্টার শাকিল । এরপর বাণিজ্যিক সম্প্রচারে আসার পর থেকে সময় মানেই লাইভ, এবং সেখানে ব্যবহৃত হতো আমার সেই সনাতন টেকনোলজির ল্যাপটপ লাইভ প্রযুক্তি।

এরপর ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর লাশ ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং কবরস্থান পর্যন্ত টানা ৮ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় টিভি ছিল মুভমেন্ট লাইভে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিল প্রথম এবং এখন পর্যন্ত অদ্বিতীয়। তখন বাংলাদেশের প্রতিটা টিভি চ্যানেল সেদিন সময় টিভি’র সৌজন্যে ছিল লাইভে, সবার স্ক্রীণে ছিল সময় টিভি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলের পর মাইল চলমান লাইভ আর এত দীর্ঘ সময় লাইভে (কোন ব্রেক ছাড়া) থাকার রেকর্ড অতীতেও ছিল না বর্তমানেও নাই। তখন হাতিয়ার ছিল একটি মাত্র ব্যাকপ্যাক এবং আমার সেই ল্যাপটপ প্রযুক্তি।

লাইভ ব্রডকাষ্টিংয়ের মাধ্যমে দর্শককে ধরে রাখার শুরুটা সময়ই করেছিল, এখন দেশের প্রতিটা টিভি চ্যানেলের মধ্যে চলে লাইভ করার তুমুল প্রতিযোগিতা।

২. এল-শেপ বিজ্ঞাপনের পথিকৃৎ
একটি বিজ্ঞাপনের ধরণ যে টিভি মিডিয়ার ইনকামের ইতিহাসটাই পাল্টে দিতে পারে তার নাম- ‘এল-শেপ বিজ্ঞাপন’, টেকনোলজির ভাষায় এর নাম – ‘স্কুইজিব্যাক’। এর শুরুটা বাংলাদেশে প্রথম করেছিল সময় টিভিই। বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এই এল-শেপ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করে। মজার কথা হলো- সময় টিভি শুরুর আগে যখন কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দেই যে- ‘এই ধরনের ‘এল-শেপ’ স্টাইলে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রযুক্তি রয়েছে বাড়তি কিছু খরচ যোগ করলে এটি আমরা কিনতে পারি’। তখন কর্তৃপক্ষ সরাসরি জানিয়ে দিলেন – ‘না এটা করা যাবে না, এই ধরনের বিজ্ঞাপন টিভি’র স্ক্রীণ ছোট করে দেয়, বিরক্তিকর লাগে, এবং দর্শক বিরক্ত হবে’। কিন্তু আমার শখ পূরণ করতেই হবে, তাই আমি গোপনে একটি যন্ত্রাংশ কম কিনে সেই টাকা দিয়ে এই ‘এল-শেপ বিজ্ঞাপনের’ প্রযুক্তিটি সংযোজন করি কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই। পরবর্তীতে অন-এয়ারে আসার পর মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায় একজন বিজ্ঞাপনদাতাকে ফ্রিতে স্যাম্পল বিজ্ঞাপন হিসেবে অন-এয়ার দেই। সেই থেকে শুরু… । এরপর দেশের অনেক টিভি চ্যানেলই সময়কে ফলো করে হাজার হাজার ডলার খরচ করেছে এই ‘এল-শেপ’ বিজ্ঞাপনের প্রযুক্তি সংযোজন করার জন্য।

৩. ডিজিটাল মিডিয়া বিপ্লব
টিভি চ্যানেল এর গুরুত্ব এক সময় কমে যাবে এবং ডিজিটাল মিডিয়া বিপ্লব ঘটাবে এমন একটি প্রেজেন্টেশন সেই ২০১১ সালে সময় কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম, বললাম শুধু স্যাটেলাইট নয় সময় থাকুক মোবাইল, ওয়েব, আইপিটিভি সব জায়গায় এবং এর নাম দিলাম ‘মাল্টিস্ক্রিনিং টিভি’। এই ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে মাসে কোটি টাকার উপরে ইনকাম করা সম্ভব বলে প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করলাম। সেদিন আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল…। কিন্তু হাল ছাড়িনি- টানা ৬ বছর কর্তৃপক্ষের পেছনে লেগে ছিলাম এই ডিজিটাল মিডিয়াটা করার জন্য, সবশেষে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে সেই সুযোগ হাতে আসে এবং মাত্র ৬ মাসে কোন ঢাল তলোয়ার ছাড়াই প্রমাণ করে দেই ডিজিটাল মিডিয়ার বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। আজ দেশের প্রতিটা টিভি চ্যানেল কিংবা পত্রিকাগুলোর আইডল সময় ডিজিটাল। দেশের জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়ার তালিকা তৈরি করলে সময় আছে ১ অথবা ২ নাম্বারের মধ্যেই।

৪. নিউজ ফ্রেন্ডলি ওয়ার্কফ্লো
একটি নিউজ চ্যানেলের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় থাকে এর নিউজফ্রেন্ডলি ওয়ার্কফ্লো অর্থ্যাৎ একটি সংবাদ দ্রুততম সময়ে সবার আগে অনএয়ার করতে হলে ফিল্ড-থেকে অনএয়ার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই হতে হয় সহজ এবং অটোমেটেড সিস্টেম। সময় টিভিতেই বাংলাদেশে প্রথম ‘এক্সএমএল ভিত্তিক নন-লিনিয়ার অনলাইন’এডিটিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছিল, যেখানে একটি নিউজ এডিট শেষে অন-এয়ার দিতে সময় লাগতো মাত্র ১০ সেকেন্ড। এছাড়া নিউজরুম-অটোমেশন সিস্টেমের সাথে গ্রাফিক্স সিস্টেম, ভিডিও এডিটিং সিস্টেম, প্রোডাকশন অটোমেশন ইত্যাদির সমন্বয়টা এমনভাবে করা যে সিস্টেমে এক সেকেন্ডের একটি মাত্র ক্লিক করে যে কাজ করা হয় অন্যান্য অনেক টিভি স্টেশন তা করতে অনেক কর্মীকে কয়েক মিনিট শুধু দৌড়াদৌড়িই করতে হয়…!

৫. মোবাইল লাইভ
লাইভ ডিভাইসের দাম অনেক চড়া তাই সাধ থাকলেও সাধ্য নেই অবস্থা। কিন্তু দেশে তখন থ্রীজি চলে এসেছে- তাহলে এবার মোবাইল লাইভ প্রযুক্তি চেষ্টা করা যায়। আমরা দেরি করিনি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের প্রতিনিধিদের হাতে পৌছে যায় মোবাইল লাইভ প্রযুক্তি। বর্তমানে শুধু সময় নয় দেশের এমন কোন টিভি চ্যানেল বাকি নেই যে তাদের প্রতিনিধিদের হাতে মোবাইল লাইভ প্রযুক্তি নেই।

৬. এন্টি জ্যামার
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান কিংবা লাইভ মানেই থাকবে জ্যামার। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে প্রবেশ করার আগে সব ঠিকঠাক লাইভ কিন্তু তিনি আসা মাত্রই সব লাইভ একাই বন্ধ হয়ে যায় কারণ জ্যামারের কারণে সব ফ্রিকোয়েন্সি ব্লক হয়ে যায়। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুরে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশ হবে, ভরসা একটা ব্যাকপ্যাক, কিন্তু জ্যামার তো থাকবেই। কি করা যায়…! পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করলাম একটা এন্টি-জ্যামার, গোপনে সেটাকে ফিট করে দিলাম ব্যাকপ্যাকের সাথে- যেহেতু পরীক্ষামূলক ছিল তাই দুই-একজন ছাড়া কেউ জানতো না। সেদিন সবাই লাইভ করতে না পারলেও সময় টিভি ঠিকই লাইভ করেছিল এবং দেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেলই সেদিন সময় টিভি’র সৌজন্যে লাইভ দেখিয়েছিল।

সবশেষে
সবমিলিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ার এই প্রতিযোগিতার যুগে এত দীর্ঘ সময় শীর্ষে টিকে থাকার গোপন রহস্য হলো- ‘সময় টিভি, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে, হোক সেটা প্রযুক্তি দিয়ে অথবা দর্শকের চাহিদা মিটিয়ে’। তবে শুধু প্রযুক্তি আর চাহিদা মেটানোই নয় এর পেছনে রয়েছে কিছু নিবেদিত কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানই কিছু নিবেদিত কর্মীদের ভালোবাসা আর দরদের বিনিময়ে জেগে ওঠে, শীর্ষে থাকে; হয়তো প্রতিষ্ঠান তাদের কথা এক সময় ভুলে যায় কিংবা নবাগতদের ভিড়ে তারা হয়ে যায় সেকেলে! তবে সেই ভিত্তিপ্রস্তুতকারীদের কথা কর্তারা ভুলে গেলেও কামলাদের স্মৃতিতে থেকে যায় আজীবন, কারণ যৌবনের যে শক্তি এখানে নিবেদিত হয়েছে তাতো আর ফেরত পাওয়া যাবে না, কেউ কেউ সেই আত্নদান করা যৌবন ফেলেই বিদায় নেয়, কেউ কেউ বিদায় নেয় চিরতরে, এই নিয়েই সময়। তবে নিবেদিত কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের মিডিয়াতে ভালো কাজের ক্রেডিট কিংবা প্রসংশার অপেক্ষায় থাকলে কেউ এগুতে পারবে না, চ্যালেঞ্জটা রাখতে হয় নিজের সাথে নিজের।

বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়াতে আমার প্রায় ২-শতাধিক শিক্ষার্থী কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাজে সহযোগিতা করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার এবং তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্যেই আমি একটি কমন এবং সহজ পরামর্শ দিয়ে থাকি বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে- ‘কাজটা প্রতিষ্ঠানের কাজ না ভেবে, প্রোমোশনের চিন্তা না করে, প্রশংসার অপেক্ষা না করে, কাউকে তেল না দিয়ে- কাজটা নিজের মনে করে করো, শেখার জন্য করো- বাকিটা অটো হবে’।

সবশেষে ভালো থাকি আমরা সময় পরিবার…

নিউজনাউ/এসএ/২০২১

+1
0
+1
0
+1
1
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: