শহীদ বুদ্ধিজীবী কবি মেহেরুন্নেসা

নীলুফা আলমগীর

বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে পুরো নয় মাস জুড়েই পাকিস্তানী হানাদার-বাহিনী, তাদের দোসর আলবদর, রাজাকার, এবং তাদের অনুসারী দালালরা পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের গুণী ও মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ হন বহু কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, অধ্যাপকসহ হাজারো সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা হলেন তাদের একজন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ শহীদ হন দেশের মুক্তিকামী এই লড়াকু কবি মেহেরুন্নেসা।

১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের খিদিরপুরে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি। বাবা আবদুর রাজ্জাক, মা নূরুন নেসার চার সন্তানের মধ্যে মেহেরুন্নেসা (রানু) ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁরা ছিলেন দুই ভাই দুই বোন।

১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের খিদিরপুরে কবি মেহেরুন্নেছা জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। কবিতা লেখার ঝোঁক ছিল শৈশব থেকেই। ১৯৫২ সালে মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। তার ধারালো লেখনীর মাধ্যমে জায়গা করে নেন সংগ্রাম, ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, অনন্যা, কাফেলা, বেগম, যুগের দাবিসহ তৎকালীন প্রায় সকল পত্রিকায়। মাত্র দশ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে তার ‘চাষী’ কবিতা সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’ পাতায় প্রকাশিত হয়। তিনি বড়দের জন্য লেখা শুরু করেন ১৯৫৪ সালে ‘কাফেলা’ পত্রিকার মাধ্যমে। কবি মেহেরুন্নেছার ব্যক্তিত্ব, রুচি, কর্ম, বিশ্বাস ছিল তার কবিতা। প্রথমে তার কবিতায় ফররুখ আহমদ-এর প্রভাব, ইসলামী ভাবধারা, আরবি-ফার্সী শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। জাগে মখলুখ জাগে ফুল পাখী জেগেছে স্বর্ণ সুরুজ ইত্যাদি। তার বেশিরভাগ কবিতা প্রকাশিত হয় ‘বেগম’ পত্রিকায়। বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগমের পরামর্শে তিনি স্বদেশ, প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ে আরবি-ফার্সী শব্দের ব্যবহার বর্জন করে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তিনি রানু আপা নামে ‘পাকিস্তানী খবর’-এর মহিলা মহল পাতার সম্পাদনা করতেন।

তার কবিতায় অন্যায়ের প্রতিবাদ, স্বাধীনতা চেতনা, ভাষা-প্রেম, ব্যক্তি-মন, বেদনা ও ক্লিষ্টতার ছবি দেখা যায়।

১৯৬১ সালে যোগ দেন ফিলিপস রেডিও কোম্পানিতে। এছাড়া তিনি ইউএসআইএস লাইব্রেরিতেও অনুলিখনের কাজ নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, সে সময় ফিলিপস কর্তৃক ইংরেজি ও উর্দুতে মুখপত্র ছাপা হতো, কবি মেহেরুন্নেসার চেষ্টায় বাংলা ভাষায় রচিত পত্রিকা প্রকাশে বাধ্য হয় ফিলিপস কর্তৃপক্ষ। কবিতার প্রতি ভালবাসা, বাংলা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম আকর্ষণ তাকে সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে থাকতে দেয়নি।

রানু আপা ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন ৬৯-এর আইয়ুব-বিরোধী উত্তাল গণআন্দোলনে। নিজের চেষ্টায় তিনি মিরপুরের ৬ নং সেকশনে, ডি বল্কের ৮ নং বাড়িটি বাবার নামে বরাদ্দ পান। ১৯৬৩ সালে কবি মেহেরুন্নেসা সপরিবারে বসবাসের জন্য ওই বাড়িতে ওঠেন। ১৯৬৫ সাল থেকে তারা থাকতে শুরু করেন মিরপুরে। সে সময় মিরপুর বিহারী অধ্যুষিত এলাকা। বিহারীদের তুলনায় বাঙালী পরিবারের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এখানে বসবাসের কিছু দিনের মধ্যেই তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন

পরিবারের জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন।

একাত্তরে বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে কবি কাজী রোজীর (সাবেক সংসদ সদস্য) নেতৃত্বে এ্যাকশন কমিটি গঠন করা হলে এই কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসাবে নানা বিধ কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত ছিলেন কবি মেহেরুন্নেসা।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে লেখক সংগ্রাম শিবির আয়োজিত বিপ্লবী কবিতা পাঠের আসরে হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন কবিসহ অন্য কবিদের সঙ্গে স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন কবি মেহেরুন্নেসা। সেই অনুষ্ঠানে তিনি জনতা জেগেছে নামে নিম্নলিখিত কবিতাটি আবৃত্তি করেন।

জনতা জেগেছে

মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,

সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।

পাহাড় সাগর, নদী প্রান্তর-জুড়ে-

আমরা জেগেছি, নব-চেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।

বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে জ্বলি,

আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।

কায়েমি স্বার্থ-বাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,

জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।

গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথ কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা-

আমরা ভেঙেছি, জয় বাঙলার যত বিজয়ের বাধা।

কায়েমি স্বার্থ-বাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো-

সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।

বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে-

চির বিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।

আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবির মৃত্যু তুমি,

চির বিজয়ের অটল শপথ, এ জয় বাঙলা ভূমি।

মুক্তিকামী বাঙালী হিসেবে বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে তিনি ও তার পরিবার অনেক আগে থেকেই চিহ্নিত হয়ে ছিলেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় তখন একতরফা গণহত্যা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কবি মেহেরুন্নেসা বিহারীদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে, তার দুই ভাই মিরপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য রফিক ও টুটুলকে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ২৩ মার্চ সকাল ১০টায় মিরপুরের নিজ বাড়িতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এবং ওইদিন বেগম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার লেখা শেষ কবিতা (তাকে হত্যা করার মাত্র তিন দিন পূর্বে)। এই অপরাধে ২৭ মার্চ স্বাধীনতা বিরোধী আলবদর বাহিনীর লোকেরা কবি মেহেরুন্নেসার বাসায় যায়। সেখানে তারা মেহেরুননিসা, তাঁর মা এবং দুই ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ঊনত্রিশ বছর।

১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডাকঘর এই কবির স্মরণে তার ছবি দিয়ে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা যে সময় আন্দোলন করেছেন, সে সময় একজন নারীর পক্ষে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা, বিপ্লবী কবিতা লেখা খুব একটা সহজ ছিল না। বিপ্লবীরা কখনো মরে না, মেহেরুন্নেসাও মরেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্জনের ইতিহাসে প্রথম শহীদ মহিলা কবি মেরুন্নেসার আত্মত্যাগ চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে।

লেখক: কবি ও লেখক ক্যালগেরি, কানাডা।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: