বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি কেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু!!

মোঃ মাহমুদ হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একশো একতম জন্মদিনকে ঘিরে বাংলাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে, এটিই তো ছিল প্রত্যাশিত। গ্রাম, শহর,লোকালয় সজ্জিত হবে নতুন সাজে এটি যেমন কাঙ্ক্ষিত ছিল, তেমনি সমাজে সমাজে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আনন্দ-বাদ্যে জেগে উঠবে জনপদ-এমন বাসনা তো মোটেই অবান্তর ছিল না। তাহলে সুবর্ণ জয়ন্তীর এই উত্তাল মার্চে জনপদে সংঘবদ্ধ অপশক্তির বর্বরোচিত হামলা কেন? হাট-হাজারি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজপথ রক্তাক্ত কেন? তালেবানী বেশে রাজধানী ঢাকাসহ লাঠি হাতে গ্রাম বাংলার পথ-প্রান্তর অবরুদ্ধ করে আগ্রাসী আস্ফালনে মারমুখী জনতার বেশে এরা কারা?

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে প্রতিবেশী ভারতের অবদান ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত। ১৯৭১ সালে এককোটি শরণার্থীর আশ্রয়, মুক্তি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্র,গোলাবারুদ আর যুদ্ধের যাবতীয় রসদ সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সুদৃঢ় ভূমিকা পালন করে তৎকালীন ভারত সরকার আর সেদেশের জনগণ যেভাবে বাংলার মুক্তিকামী জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিল,এমন নজিরতো পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল! স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতীয় জনগণের পক্ষে সেদেশের সরকার প্রধান আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আসবেন, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার বন্যায় বাংলার জনগণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাবে, এটাইতো হওয়ার কথা ছিল!! তা না হয়ে হাট-হাজারি আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো কেন?

অতি সম্প্রতি মাওলানা মমিনুল হকের জনসভা পরবর্তী একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের শাল্লায় ন্যক্কারজনক সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। ইদানীং মাওলানা মমিনুল হকের জনসভায় আওয়ামী লীগ নেতাদের ও বিশেষ অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ভাষায়, দিরাই’র জনসভাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাহলে আজকাল কিছু কিছু আওয়ামী লীগ নেতা কি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন কে ধারণ করেন না?

১৯৪৮ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। তাই তো আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগে উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ১৯৭২ এর ৭ই জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় স্পষ্ট করেই বলেছিলেন ‘ এ দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলবে না’। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর এবং ৪ নভেম্বর গন পরিষদের ভাষণে বলেছিলেন ‘ ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্ম হীনতা নয়, রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না।’

১৯৭৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “রাজনীতিতে যারা ধর্মের ব্যবহার করে তারা সাম্প্রদায়িক, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যারা মানুষকে ভালোবাসে তারা কোনদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না।” দুই যুগেরও বেশি সময় ধর্মের অপব্যবহারের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন “হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলতে পারে না।” আজ কে যারা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নিয়ে ফেরী করে বেড়ান, তারা কি হ্রদয়ে এই অবিসংবাদিত নেতার আদর্শকে ধারণ করেন? যদি ধারণ ই করেন, বিনয়ের সাথে জানতে চাই, গত দেড় যুগে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এমন ভয়াবহ বিকাশে কি আপনাদের কোন দায় নেই?

বাংলাদেশের জনগণ প্রথাগত সামাজিক নিয়মেই ধর্মপ্রাণ। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান মিলে সামাজিক সম্প্রীতির ঐতিহ্যও অত্যন্ত সুপ্রাচীন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই সুদৃশ্য ভূখণ্ডে ধর্মকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির মানুষ যেমন সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে, অন্যদিকে আর এক শ্রেণির মানুষ কোন রকম বাছ-বিচার ব্যাতিরেখে ই শান্তিপ্রিয় ইসলামী অনুশাসনে বিশ্বাসী মানুষদের নিয়েও কুরুচিপূর্ণ চরম কটাক্ষে লিপ্ত রয়েছে, সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে যার কোনটিই সহায়ক নয়। বিপরীতে বঙ্গবন্ধুকেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে। এমন সুপরিকল্পিত উগ্রবাদের মোকাবেলায় রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় সুফল হবে সুদূর পরাহত!!

১৯৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বিভাজনের অব্যবহিত পরেই তৎকালীন ভারতের দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বুঝতে অসুবিধা হয়নি বহু ধর্ম বর্ণ সমন্বয়ে সর্ব ভারতীয় অখণ্ডতা রক্ষায় ধর্মীয় বিভাজন মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি থেকেই ধর্ম নিরপেক্ষতা কে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শের মূলনীতি হিসেবে ভাবতে শুরু করে। সংবিধান কোন বিশেষ ধর্ম কে বিশেষ আনুকূল্য না দেয়ার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে। ক্রমান্বয়ে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস, বাম রাজনৈতিক দল সমূহ এবং অধিকাংশ প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলোও এর বাস্তবতা উপলব্ধি করার ফলেই ভারত একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

কালের বিবর্তনে উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিজেপির উত্থান ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্রটি কে পাল্টে দিয়ে চরম হিন্দুত্ববাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৯২ সালের ৬ ই ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘোষণা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৯৩ সালের ১১ই মার্চ ‘ভারতের ভাবাদর্শ’ শিরোনামে ‘ নেহেরু বক্তৃতা’য় অংশ নিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষতা আজ সংকটের মুখে’। সে সময়ের কংগ্রেস নেতৃত্ব বিষয়টিকে আমলে না নিলেও আজকের ভারতীয় বাস্তবতায় সেটি ই তো অপ্রিয় সত্যে পরিণত হয়েছে। নেহেরু আর মহাত্মা গান্ধীর ভাবাদর্শ কে চ্যালেঞ্জ করে আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) এর উগ্র সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে দীক্ষিত বিজেপি ই আজ ভারতের সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছে।

গুজরাটের মুসলিম নিধন, বাবরি মসজিদ কে কেন্দ্র করে সর্ব ভারতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, সাম্প্রতিক কালে দিল্লীতে সাম্প্রদায়িক ভয়াবহ সহিংসতা সহ অসংখ্য সাম্প্রদায়িক ঘটনার জন্ম দিয়েও ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি আজ প্রতিদন্ধিতাহীন। একদিকে এনআরসির নামে মুসলমানদের ২য় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার প্রচেষ্টা, সংবিধানে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলমানদের সাথে অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের স্পষ্ট ব্যবধান সৃষ্টি, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা, সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে রাম মন্দির নির্মাণের পথকে প্রশস্ত করে বিজেপি ভারত তথা উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বাষ্পকে সুদৃঢ় করেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ভারতীয় জনগণ হিন্দুত্ব-বাদের চরমপন্থা কে ই গ্রহণ করেছে।

ভারতীয় রাজনীতির প্রবল পরাক্রমশালী নেহেরু পরিবার আর ধর্ম নিরপেক্ষতার পতাকাবাহী কংগ্রেস, সাম্প্রদায়িক শক্তির ধারক বিজেপির কাছে আজ চরমভাবে পরাভূত। ১৯৮৪ সালে লোকসভার মাত্র দুটি আসনে জয়ী হয়ে যে বিজেপি যাত্রা শুরু করেছিল, ১৯৮৯ তে ৮৮ টি, ১৯৯১ তে ১১৭ টি আর ২০১৯ সালে ৩০৩ টি আসনে জয়লাভ করে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের একচ্ছত্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সামাজিক ন্যায্যতা, নাগরিক অধিকার আর হ্রদয়ের দহনকে অবজ্ঞা করে বিজেপি যেমন রাষ্ট্রের নিয়ন্তা অন্যদিকে উত্তরাধিকারের রাজনীতির ধারকরাও আজ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আস্ফালনে দিশেহারা। কেউ কি একদিন ভাবতে পেরেছিল, দুটি আসন দিয়ে যাত্রা শুরু করা বিজেপি রাজনীতির কুলীন পরিবারকে ক্ষত-বিক্ষত করে উপমহাদেশের রাজনীতির নিয়ন্তা হয়ে উঠবে?

সন্দেহ নেই প্রতিবেশী ভারতের রাজনীতি বাংলাদেশ কে আন্দোলিত করে। ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিকাশে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি যে সহজেই প্রভাবিত হতে পারে তা বুঝতে কোন বিজ্ঞ বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সমসাময়িক ঘটনাবলী ই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ধর্মনিরপেক্ষতা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিকাশে একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সরকার সমঝোতা আর সহমর্মিতার মাধ্যমে যতই সাম্প্রদায়িক শক্তির মনোরঞ্জনের চেষ্টা করুক, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা শাসকদলকে ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারক বলেই চরমভাবে বিশ্বাস করে। তাইতো সাম্প্রদায়িক আস্ফালনের প্রথম আঘাতেই ক্ষত-বিক্ষত হয় স্বাধীনতার মহানায়ক সার্বভৌম বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রবাদ পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিপরীতে সামাজিক শান্তির লক্ষ্যে সুবিধাবাদী বিবর্জিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক দীক্ষায় সমৃদ্ধ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক-সামাজিক সচেতনতা ই হতে পারে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অন্যতম কৌশল, বিপরীতে উন্নয়ন আর প্রগতির ধারা বিঘ্নিত হয়ে, ইতিহাস আবারও তার উল্টো পথে যাত্রা শুরু করলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: