বাইডেনের অনুকরণীয় এখন বাংলাদেশ

নিউজনাউ ডেস্ক: তিন দশক ধরে অবিশ্বাস্য উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কথাগুলো এক কলামে লিখেছেন, আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিখ্যাত কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ। মূলত শিশু-দারিদ্র্য মোকাবিলায় জো বাইডেনের বিশাল বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী সুফল বয়ে আনতে পারে, তার ভিত্তিতেই দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যকে নিয়েই এই কলাম।

নিজ ভূখণ্ডে শিশু-দারিদ্র্য মোকাবিলায় অত্যন্ত নাজুক অবস্থা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এই গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রস্তাবিত ১,৯০০ বিলিয়ন ডলারের দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ক প্যাকেজ পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। শিশু-দারিদ্র্য দূর করার বিষয়টি এতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের বিখ্যাত কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন, এমন বিনিয়োগ দেশের জন্য কী ধরনের ফল বয়ে আনতে পারে তা বুঝে উঠতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যপ্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশের সাফল্যকে বিবেচনায় নিতে হবে।

দুইবার পুলিৎজার পুরস্কার জেতা এই সাংবাদিক বুধবার নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত কলামে লিখেছেন, ৫০ বছর আগে এই মার্চ মাসে গণহত্যা, নৈরাজ্য আর অনাহার থেকে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

এর সঙ্গে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের বীভৎস ও হৃদয়বিদারক ছবি দেশটির পরিচিতি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিণত হয় এক লক্ষ্যভ্রষ্ট রাষ্ট্রে।

নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন: ‘১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সংবাদ কাভার করেছিলাম। তাতে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তখন দ্য টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশকে নিয়ে আমি বিবর্ণ হতাশার প্রতিবেদন লিখেছিলাম। সম্পদে ভরপুর হলেও দুর্ভাগ্য ছেড়ে যায় নি দেশটিকে।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ছাড়াও বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ। তখন হয়তো আমি ঠিক ধারণা করেছিলাম। কিন্তু পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার হতাশামূলক ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিন দশক ধরে দেশটি অবিশ্বাস্য উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’

নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই মহামারীর চার বছর আগে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এটা চীনের প্রবৃদ্ধির থেকেও বেশি।

বাংলাদেশিদের গড় আয়ু ৭২ বছর। এটা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চল বিশেষত মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের অন্তত: ১০টি কাউন্টির চেয়েও এগিয়ে। বাংলাদেশ এক সময় অনুন্নয়ন আর অসাড়তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও এখন কীভাবে উন্নতির শিখরে উঠতে হয়, তা বিশ্বকে শেখাতে ‘রোল মডেল’ হবার যোগ্যতা অর্জন করেছে দেশটি।

বাংলাদেশের এমন উজ্জ্বল সাফল্যের পেছনে শিক্ষা এবং কন্যাশিশুর উন্নতিকে কৃতিত্ব দিয়েছেন নিকোলাস ক্রিস্টফ।

নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন: ‘দেশটির নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাকে বলেছিলেন, দেশটির এমন অভাবনীয় উন্নতির পিছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে নারী বিশেষত দুঃস্থ নারীর অবস্থানের উন্নয়ন। ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের প্রবক্তা এই ইউনূস বাংলাদেশ ও্ এর বাইরে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইউনূসের স্থাপিত গ্রামীণ ব্যাংক গত চার বছরে এক লাখেরও বেশি নারীকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা বানিয়ে দিয়েছে।

‘মেয়েদের শিক্ষিত ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করায় এখন তারাই দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

‘দেশটির তৈরি পোশাক খাত নারী জাগরণে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে। এই যে আপনি এখন যে শার্টটি পরে আছেন, তা হয়তো এমনিই এক নারীর তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ এখন চীনের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

‘বড় ধরনের সফল রাজনৈতিক নেতা না থাকলেও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও জনগণের মানোন্নয়নে অভাবনীয় উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। এই থেকে আমরাও শিক্ষা নিতে পারি।’

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখযোগ্য জানিয়ে বিশ্ব ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত ১৫ বছরে দেশটিতে ২ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। ১৯৯১ সালের পর দেশটিতে অর্ধেক শিশু অপুষ্টি থেকে মুক্তি পেয়েছে। বাংলাদেশের এই অর্জন পেছনে ফেলে দিয়েছে প্রতিবেশি ভারতকেও।

নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন: ‘এই লেখা পড়ার সময় সংশয়বাদী পাঠক হয়তো মাথা নেড়ে বিড়বিড় করতে পারেন। আর বলতে পারেন অতিরিক্ত জনসংখ্যা দেশটির উন্নতিকে পিছিয়ে দেবে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশি নারীদের গড়ে এখন মাত্র দুটি সন্তান রয়েছে। আগে যা ছিল সাত জনে।

‘সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশ তার অব্যবহৃত ও অনুৎপাদনশীল খাত বিশেষত দুঃস্থ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। এই একই ধরনের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে আরও উন্নতি নিয়ে আসতে পারে।’

নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন: ‘আমরা দেশের বিলিয়নেয়ারদের কাছ থেকে খুব বেশি উৎপাদনশীলতা বের করে আনতে পারছি না। প্রতি সাত মার্কিন শিশুর একজন উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারছে না। আমরা যদি তাদের সহায়তা করতে পারি, তাহলে দেশ হিসেবে আরও এগিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।

‘শিশু-দারিদ্র্য্য মোকাবেলায় বাইডেনের এমন পদক্ষেপ সফল্য বয়ে আনতে পারে। এখন ফেরতযোগ্য শিশু করের ব্যবস্থা আরও দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী করতে হবে।
সূত্র: এনবিনিউজ

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: