লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু: কিছু প্রশ্ন

আলমগীর দারাইন

প্রতিবাদী লেখক, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীর মৃত্যুতে সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। যুগ যুগ ধরে সমাজ পরিবর্তনে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একজন লেখকের মৃত্যু অন্য লেখককে মর্মাহত করে। ভিন্ন মতের জন্য একজন লেখকের একটি স্বাধীন রাস্ট্রে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই ছয়বার জামিন চেয়ে জামিন না দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস কাশিমপুর কারাগারে বন্দী করে হাই সিকিউরিটি ইউনিটে রাখা হয়।

জামিন পাওয়া একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা, তদন্ত কর্মকতা আরও ১৫ দিন সময় নিতে পারেন, মোট ৭৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার কথা কিন্তু মুশতাক আহমেদ ৯ মাসে ৬ বার জামিন চেয়েছেন। নিম্ন আদালতে জামিন নামঞ্জুর করা হয়েছে। এই ঘটনায় জনমনে খোবের সঞ্চার করেছে । সরকার তদন্ত করছে। অনেক সময় সকলের কাছে বিব্রতকর, অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনা ঘটে যায় যা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে অজানা থেকে যায়, ঘটনা ঘটার পর সকলে জানে। জনগন চাইবে নিরপেক্ষ তদন্ত। এই ধরনের ঘটনায় সাধারণ জনগণের মনে সরকার ও আদালতের উপর বিরূপ ধারনা সৃষ্টি হয়। একই ঘটনা আহমেদ কবির কিশোরের বেলায় ঘটেছে। এখন তিনি উচ্চ আদালতে শর্ত সাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর উপর ঘটে যাওয়া অমাবিক নির্যাতনের কথা গণমাধ্যম তুলে ধরেছেন। কারাগারে মৃত্যু মানে সরকারের জিম্মায় মৃত্যু। কোন অন্যায় দেখলে দেশ প্রেমিক বোধশক্তিপূর্ণ, বিবেকবান মানুষ কখনো চুপ করে থাকতে পারে না।লেখক মুশতাক আহমেদ তাঁদের একজন। তাঁর কারাগারে মৃত্যু সরকারকে প্রশ্নবৃদ্ধ করে তুলেছে। বিরোধীদল গুলো নতুন করে প্রতিবাদের সুযোগ পেয়েছে। এই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন না পেয়ে কারাগারে মৃত্যু সভ্য সমাজ কোন ভাবে মেনে নিতে পারছে না । লেখার স্বাধীনতা বাঁধা গ্রস্ত হলে বাক স্বাধীনতা খর্ব হয়। অন্যায় দেখলে সভ্য সমাজ, বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর প্রতিবাদ করবে। প্রতিবাদ, সমালোচনা, কার্টুন, ব্যাঙ্গ, বিদ্রূপ শাসক গোষ্ঠীর ভাল নাও লাগতে পারে, কিন্তু একটা গনতান্ত্রিক দেশে এটা স্বভাবিক। মনে রাখতে হবে একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাশীন দলের বা বিরোধী দলের সকলের প্রধানমন্ত্রী। সকলের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর।

যতক্ষন অভিযোগ প্রমাণিত না হয় অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের চোখে নির্দোষ। যুগ যুগ ধরে লেখক, বুদ্ধিজীবি, মনীষীরা মানুষের পুরাতন ধান ধারনা, বিশ্বাসকে আঘাত করে একটি জাতি ও সভ্যতাকে পরিবর্তনের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিবিসিকে বলেছেন, এই আইনে কোন অপরাধের অভিযোগ এলে পুলিশ তদন্তের আগে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না বা তার বিরুদ্ধে কোন মামলা নেওয়া যাবে না- এমন ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিছু দিনের মধ্যে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংশোধন করার কথা বলেছেন।

মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর আইনটি নিয়ে বিক্ষোভ,বিতর্ক, প্রতিবাদের মুখে সরকার আইনটির অপপ্রয়োগ বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছে। এই আইনের এবুউজ ও মিসইউজ বন্ধের কথা সরকার ভাবছে। সাধারণ মানুষ চাইবে সকল প্রকার আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ হোক। বিরোধীদলগুলো চাইবে আইনটি বাতিল করা হোক, সরকার চাইবে কিছুটা রদবদল বা সংশোধন করে আইনটি রাখতে। সরকার আইন প্রণয়ন করেন জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য। আমাদের দেশের পেক্ষাপটে যে কোন ফৌজদারি মামলায় কোন ব্যক্তি অভিযুক্ত হলে আর্থিক ক্ষতি ও অমানুষিক হয়রানির শিকার হতে হয়। নিম্নমধ্যবিত্ত, ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আদালতের খরচ বহন করা অনেক কঠিন। অনেকে সর্বশান্ত হয়ে যায়। শুধু মাত্র ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও পরিবার উপলব্ধি করতে পারে। নিম্ন আদালত অনেক বড় অপরাধের ধারায় জামিন দেন কিন্তু এই মামলায় এমন কি ঘটনা ঘটেছিল যে তারা জামিন পাননি।

পুলিশের তদন্তকারি অফিসারকে জামিন অযোগ্য ধারাগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা অবলম্বন ও সংবেদনশীল হতে হবে বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলায় ক্ষেত্রে। তাছাড়া নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদন্নোতি সুপ্রিম কোর্টের আওতায় আনতে হবে। এটা বহুদিনের দাবি ।

৫০ বছর দেশ স্বাধীন হয়েছে, বেশ কয়েকটি সরকার বদল হয়েছে। সবদল, দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় গেলে তারা সব ভুলে যায়।

মুশতাকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গতবছর মে মাসে র‍্যাব ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করেন ।এই মামলায় জনাব কিশোর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর উপর নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমে বর্ননা করেছেন। সাধারণ জনসাধারণের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। জনমনে সরকারের প্রতি নেতিবাচক ধারনার সৃষ্টি হয়েছে।

আমরা জানি বিচারাধীন মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ আইনের চোখে অপরাধী নন। একটা ভিন্ন মতের লেখা, কার্টুন বা ব্যাঙ্গচিত্র কি ভাবে সাইবার অপরাধ হয় এবং জামিন অযোগ্য ধারায় পড়ে বোধগম্য নয়।

বিরোধীদলগুলো অভিযোগ করে আসছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন জনগনের মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করছে । স্বাধীন সাংবাদিকতা মুক্ত চিন্তা ও মত প্রকাশ ব্যহত হচ্ছে এবং পুলিশের অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাছারা পুলিশ মিডিয়া হাউজে ঢুকতে পারবে ও প্রয়োজনে গ্রেফতারও করতে পারবে। বাংলাদেশের আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, এটা ফ্রিডম অফ প্রেস বা ফ্রিডম অফ স্পিস বন্ধ করার জন্য নয়। সরকার বারবার দাবি করে আসছে যে বাকস্বাধীনতা বা গনমাধ্যমের স্বাধীনতা রোধ করা আইনের উদ্দেশ্য নয়। সাইবার অপরাধ দমনই আইনটির লক্ষ্য।

অনেক বিশ্লেষকেরা মনে করছে যত তাড়াতাড়ি এই বিতর্কিত আইন সংশোধন বা বাতিল করা হয় ততই ভালো। নইলে সরকারের ভাবমূর্তি দেশ ও বিদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অপপ্রয়োগ চলতেই থাকবে। আশা করি সরকার এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং লেখক, সাংবাদিক ও জনগণের মাঝে এই আইন নিয়ে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে তা নিরসন করবে এবং যে সব সাংবাদিক লেখকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তা অচিরেই তুলে নেওয়া হবে।

লেখকঃ আলমগীর দারাইন, কলামিস্ট, ক্যালগেরী, আলবার্টা, কানাডা।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: