স্বাদে ঐতিহ্য কাঁচাগোল্লা

তানিয়া পারভীন মুক্তা: নাটোরের বনলতা সেন যেমন চেনা, তেমনি চেনা কাঁচাগোল্লাও। গোল নয়, লম্বা নয়, আবার কাঁচাও নয়। তবুও নাম তার কাঁচাগোল্লা। এই নামেই পরিচিতি দেশ-বিদেশে। এই কাঁচাগোল্লা শুধু একটি মিষ্টির নামই নয়, এটি একটি ঐতিহ্য যার জনপ্রিয়তা দেশ ছাড়িয়ে, পাড়ি জমিয়েছে বিদেশেও।

কাঁচাগোল্লা সৃষ্টির রয়েছে চমৎকার কাহিনী। রানী ভবানীর মিষ্টি খুব পছন্দ ছিল। তার প্রাসাদে নিয়মিতই মিষ্টি সরবরাহ করতেন লালবাজারের মধুসূদন পাল। এক দিন মধুুসূদনের ২০ কর্মচারীর সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। দোকানে দুই মণ ছানা রাখা ছিল। নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মধুসূদন ছানাগুলো চিনির রসে ভিজিয়ে দেন। এরপর একটু চেখে দেখেন—অপূর্ব হয়েছে খেতে। এদিকে রানীর লোকেরা মিষ্টি নিতে এলো। তিনি ওই ছানাগুলো পাঠিয়ে দেন প্রাসাদে। নতুন এই মিষ্টি রানীর খুব পছন্দ হলো। তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। রানী মিষ্টির নাম জানতে চাইলে মধুসূদন পড়েন বিপাকে। নাম তো রাখা হয়নি। তখন ভাবলেন, যেহেতু কাঁচা ছানা থেকে তৈরি, তাই কাঁচাগোল্লা নাম হতে পারে। সেই থেকে এর নাম কাঁচাগোল্লা। ধীরে ধীরে মিষ্টি রসিকরা এই মিষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। ১৭৫৭ সাল থেকে এই মিষ্টি সারাদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে।

সম্পর্কিত পোস্ট

খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি কাঁচাগোল্লা তৈরির প্রধান উপাদান। ১ কেজি কাঁচাগোল্লা তৈরি করতে প্রায় এক কেজি কাঁচা ছানা ও ৪০০ গ্রাম চিনির প্রয়োজন। কড়াইতে চিনিগুলো পানিসহ জ্বাল দিতে হয়। চিনি পরিষ্কার করতে সামান্য কাচা দুধ দিতে হয়। কড়াইয়ের গাদ ময়লা পরিষ্কার হয়ে গেলে কড়াইয়ে ছানা ঢেলে দিতে হয়। এরপর জ্বাল এবং একইসঙ্গে কাঠের খন্তা দিয়ে নাড়তে হয়। এভাবেই ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ধারাবাহিকভাবে নাড়তে নাড়তেই কাঁচাগোল্লা তৈরি হয়ে যায়। তবে এই নাড়াচাড়ার মধ্যেই রয়েছে শৈল্পিক কৌশল।

১৭৬০ সালে রানী ভবানীর রাজত্বকালে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়াতে থাকে। সেই সময় নাটোরে মিষ্টির দোকান ছিল খুবই কম। এসব দোকানে বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা ছাড়াও অবাক সন্দেশ, রাঘবশাহী, চমচম, রাজভোগ, রসমালাই, পানতোয়া, প্রভৃতি মিষ্টি ছিল অন্যতম। তবে এর মধ্যে সবার শীর্ষে উঠে আসে কাঁচাগোল্লা। বিলেতের রাজ পরিবারও কাঁচাগোল্লার স্বাদ পেয়েছিল বলে জানা যায়। কাঁচাগোল্লা যেত ভারতবর্ষের নানা জায়গায়। এই মিষ্টান্নের সুখ্যাতি করেছে রাজশাহী গেজেটও। লেখালেখি হয়েছে কলকাতার পত্র-পত্রিকায়ও। ইংল্যান্ডসহ তৎকালীন বিভিন্ন রাষ্ট্রে নাটোরের কাঁচাগোল্লার কথা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪০ সালে দিঘাপতিয়ার রাজা প্রসন্ননাথ রায় কৃষ্ণ উত্সবে আসা ভক্তদের কাঁচাগোল্লা দিয়েই আপ্যায়ন করেন।

নাটোর শহরের প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায় কাঁচাগোল্লা। লালবাজারের জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে তো বটেই, নিমতলা মোড়ে দুলাল পালের দোকানে, নিচাবাজারে কুণ্ডু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ও মৌচাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ভালো কাঁচাগোল্লা পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে বেড়াতে আসবে আর এই মিষ্টি মুখে দেবেন না কেউ এমনটা হতেই পারে না। নাটোরে কেউ বেড়াতে এলে তারা ফেরার সময় এই কাঁচাগোল্লা কিনে নিয়ে যান।

নিউজনাউ/টিএন/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: