মৃত্যু আজ পরাভূত

হাসনাইন খোরশেদ

একাত্তরে অস্ত্র হাতে লড়েছিলেন। পরাজিত করেছিলেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে। মুক্ত করেছিলেন প্রিয় বাংলাদেশ।

ফরিদী ভাই, মৃত্যুকেও পরাজিত করেছেন আপনি। মৃত্যু আপনাকে কেড়ে নিতে পারেনি। আপনি আজো আছেন আমাদের হৃদয়ে। থাকবেন অনন্তকাল।

কতো স্মৃতি আপনার সাথে। কতো আনন্দ। কতো বেদনা। কতো গভীর ভালোবাসা।

তখন আমি একুশে টিভির রিপোর্টার। দশ তলায় নিউজরুমে আমাদের জগত। আপনি মাঝে মাঝে আসতেন সাত তলায়। অনুষ্ঠান বিভাগে। নওয়াজিশ ভাই আর যুবদার কাছে। দুয়েক বার লিফটে দেখেছি। সালাম দিয়েছি শ্রদ্ধার সাথে। উত্তর দিয়েছেন হাসি মুখে।

টিভি পর্দায় আপনাকে তো বরাবরই দেখতাম মুগ্ধ হয়ে। প্রথম যেদিন সামনাসামনি দেখলাম, সে অভিজ্ঞতা একদম অন্য রকম। তার রেশ লেগে ছিলো সারাটা দিন। রাতে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে চিৎকার করে উঠেছিলাম, বউ আজ হুমায়ূন ফরিদীকে দেখেছি।

বউয়ের চোখ ছানাবড়া।

ফরিদী! হুমায়ূন ফরিদী!!!

হ্যাঁ। ফরিদী ভাই এসেছিলেন অফিসে। লিফটে একসাথে উঠেছি।

উনাকে বলেছো? আমরা যে কতো বড় ফ্যান, সেটা বলেছো!

না। বলা হয়নি কিছুই। আগেই যে নেমে গেলেন।

সেই ফরিদী ভাই এসেছিলেন এনটিভিতে। আমার কাছে। হ্যাঁ, আমার কাছে।

২০০৩ সালের প্রথম ভাগ। নির্বাহী পরিচালক হিসাবে এনটিভি গড়ে তুলছি। নিজের অফিস-ঘরে কাজ করছি। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। কি-বোর্ড থেকে চোখ তুলে চমকে গেলাম। দরোজাটা অর্ধেক খুলে বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন ফরিদী ভাই।

লাফিয়ে উঠলাম আমি। প্রায় ছুটে গেলাম।

ফরিদী ভাই আপনি! আসেন, ভেতরে আসেন।

আমার উচ্ছ্বাস ঝরা মুগ্ধতায় সাড়া মিললো না। নিস্পৃহ, নির্বিকার ফরিদী ভাই। একদম ভাবলেশহীন। আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরে ভেতরে ডাকলাম। তিনি নড়লেনও না।

আমি তো নাটক আর অনুষ্ঠানের মানুষ। ওসব নিয়েই কথা বলবো। সেটা নাকি তোমার সাথে বলতে হবে।

আমতা আমতা করে বললাম, জ্বি, আমিই দেখছি।

তোমাকে তো টিভিতে রিপোর্টিং করতে দেখেছি। নাটকের কিছু বোঝো? অনুষ্ঠানের কিছু বোঝো?

চেষ্টা করছি। শিখে নেবো। খুব দ্রুত শিখতে জানি আমি।

উনার চোখে চোখ রেখে বললাম, ভেতরে আসেন আগে। একটু কফি খান। তারপর না হয় অন্য কথা বলা যাবে।

না। আগে বুঝে নেই তোমার সাথে আমার যাবে কিনা। যদি না মিলে তাহলে আর তোমার রুমেই ঢুকবো না।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

তোমাকে একটা কুইজ জিজ্ঞেস করি। যদি সঠিক উত্তর দিতে পারো, তাহলে তোমার সাথে জমবে। অনেক কিছুই করবো একসাথে। আর না পারলে এখান থেকেই চলে যাবো। কোন দিন আসবো তো না-ই, তোমাদের টিভির কোন কাজও কোন দিন করবো না।

কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়লাম। আমি তখন মাত্র চৌত্রিশের তরুণ। বিশাল চ্যালেঞ্জ কাঁধে নিয়েছি। হুমায়ূন ফরিদীর কাজ না থাকলে এনটিভি কে দেখবে? আমার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে।

দেখো আমি যা বলি, তা করি। না পারলে তোমাদের সাথে কখনোই থাকবো না।

দরোজার বাইরে দাঁড়িয়েই বললেন ফরিদী ভাই, কুইজটা কি বলবো?

বলেন।

একটা লোক। ২২ তলা ভবনের সবচেয়ে উপরের তলায় তার অফিস। ২৪ ঘন্টাই লিফট চালু থাকে। কোন লিফটম্যান নেই। লোকটা খুব সকালে অফিসে আসে আর সবার পরে বের হয়।

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে চলেছেন ফরিদী ভাই। আমিও স্থির তাকিয়ে আছি। পলকহীন চোখে গভীর মনোযোগ।

বুঝলা, লোকটা যখন আসে আর বের হয়, তখন পুরো বিল্ডিংয়ে আর কোন মানুষ থাকে না। সে সিঁড়ি বেয়ে ২২ তলায় ওঠে। সারা দিন কাজ করে। আবার রাতে লিফটে নিচে নেমে বাড়ি ফেরে।

এবার একটু হেসে বললেন, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা তো অনেক কষ্টের। বলো তো লোকটা সিঁড়ি বেয়ে ২২ তলায় ওঠে কেনো?

এবার ফরিদী ভাইয়ের চমকে ওঠার পালা। তাঁর প্রশ্ন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বললাম, লোকটা খুব খাটো।

সত্যিই চমকে উঠলেন ফরিদী ভাই। ভীষণ চমকে উঠলেন। চিৎকার করে উঠলেন, খাটো! খাটো.. তাতে কী হয়েছে!!

লিফটে সবচেয়ে নিচে থাকে জিরো। সে শুধু জিরো পর্যন্তই নাগাল পায়।

মানে?

ওঠার সময় জিরোতে কোন লাভ নেই। নামার সময় জিরোটাই তো সব।

চিৎকার করে জড়িয়ে ধরে আমার রুমে ঢুকলেন ফরিদী ভাই।

জমবে। তোমার সাথে দারূণ জমবে আমার।

চেয়ার টেনে বসতে বসতে হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, কই, কফি খাওয়াবে না? কফির কথা বলো।

দারূণ জমেছিলো আমাদের। আমার সুসময়ে-দুঃসময়ে সব সময় পাশে ছিলেন। যখন এনটিভির চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করেছি, ফরিদী ভাই দেখতে এসেছেন। পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে।

অকাল মৃত্যুর দু’দিন আগে ফোন করলেন মধ্যরাতে। ঘন্টাখানেক কথা বললেন। আমি মুগ্ধ শ্রোতা। হঠাৎ কি মনে হতেই একদম চুপ।

আমি হ্যালো.. হ্যালো.. করছি।

কিছুক্ষণ পর সাড়া মিললো।

আচ্ছা, তোমার বউ আছে না?

জ্বি, আছে।

কি করছে?

ঘুমাচ্ছে।

আর তুমি রাত আড়াইটা পর্যন্ত আমার সাথে গল্প করছো। হাহাহা..

ফোন কেটে দিলেন।

বার বার কল করছি আমি। ফরিদী ভাইয়ের ফোন অফ।

এনটিভিতে কতো কিছু করেছি আমরা এক সাথে। সুবর্ণা আপার উপস্থাপনায় ২২ পর্বের কুইজ শো ‘মেধাবী’ পরিচালনা করেছেন ফরিদী ভাই। মেধাবী’র শ্যুটিংয়ে ডেকে নিয়ে শত পদের খাবার খাইয়েছেন। খেতে খেতে বলেছিলেন, ইউনিটের সবাইকে যদি মন ভরে খাওয়াতেই না পারি, তবে অনুষ্ঠান বানিয়ে কি লাভ বলো। প্রতি বেলা সবার জন্য এমন আয়োজন করতে গিয়ে আর্থিক দিকটা যে লাভের বদলে লোকসানের দিকে চলে গেলো, সেদিকে সামান্য ভাবনাও ছিলো না তাঁর।

তখনও আমি এনটিভিতে। এক মধ্যরাতে ফরিদী ভাইয়ের ফোন। বললেন, তোমাদের জন্য একটা টেলিফিল্ম বানাবো। কালকে এসে কথা বলবো।

সেই টেলিফিল্ম ‘চন্দ্রগ্রস্থ’। নিজের পরিচালিত সেই টেলিফিল্মের মূল চরিত্রে ফরিদী ভাই। ফাঁসির কয়েদী। টিভি নাটকে আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্যটি দেখেছি সেই টেলিফিল্মে। আজো আকাশে চাঁদ উঠলে মাঝে মাঝেই মনে হয়, দু’হাত এক করে আজলা ভরে চাঁদের আলো পান করছেন হুমায়ূন ফরিদী। প্রিয় ফরিদী ভাই।

(ফেসবুকের টাইমলাইন থেকে নেয়া)

লেখকঃ সিনিয়র জার্নালিস্ট

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: