আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের মুখে বাংলাদেশ

মুনওয়ার আলম নির্ঝর: বাংলায় একটা প্রবাদ প্রচলিত, ‘কার্তিকের ওসে হাতি পড়ে, পৌষের শীত মোষের গায়ে আর মাঘের শীত বাঘের গায়ে।’ প্রবাদের অর্থ হলো, পৌষের শীতে মহিষ কাবু হয় আর মাঘ মাসের শীতে স্বয়ং বাঘ মামা কাবু হয়ে যায়। অথচ প্রবাদের অর্থ পাল্টে গেছে এখন। গত কয়েকদিনে দেশের তাপমাত্রা যেন হাঁটছিল, উল্টো পথে। তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল শীত কি তবে বিদায় নিয়েই নিলো। তবে আজ থেকে দেশের ছয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাতাসের স্বাভাবিক গতিবিধি না থাকায় এমন হঠাৎ অতি গরম কিংবা শীত পড়ছে। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গরম বাতাস এই মুহুর্তে বাংলাদেশে চলে আসায় এমন গরম পড়ছে আবার শীতল বাতাস আমেরিকা-ইউরোপের অনেক জায়গাতে চলে যাওয়ায় রেকর্ড পরিমাণ শীত পড়ছে সেসব দেশে।

বাংলাদেশি ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত মনে করেন, ভবিষ্যতে বাতাসের গতিবিধি আরও বেশি ভয়ঙ্কর হবে। যার জন্য বাংলাদেশের ষড়ঋতুর পরিচিত ধরনটাই বদলে যাবে। নিউজনাউ২৪ এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাতাস স্বাভাবিক চলাচল করতে পারছে না। ফলে দেখা যাবে টানা কয়েকদিন শীত পড়ছে আবার এরপরই টানা কয়েকদিন গরম পড়ছে। যেটা এরইমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

এই বিষেষজ্ঞ স্পষ্ট করেই সতর্ক করে দিয়েছেন এর ভয়াবহতা নিয়েও। তিনি দাবি করেছেন, আবহাওয়ার এমন বিরুপ প্রতিক্রিয়ার ফলে খাদ্য সংকট চরম রূপ ধারণ করবে। তাঁর মতে, আবহাওয়ার এমন আচরণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ফসলের। ঠিকই সময়ে ঠিক ফুল কিংবা ফল হবে না। কিংবা দেখা যাবে হঠাৎ শীতে কোন ফসলের ফুল হল, আর তাঁর কয়েকদিন পরই যখন প্রচণ্ড গরম আসবে তখন তা নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা পৃথিবী ভয়াবহ খাদ্য সংকটে পড়বে।

আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতির জন্য এই ইমেরিটাস অধ্যাপক বাংলাদেশকে দায়ী করতে রাজি নন। তিনি উল্টো মনে করেন, এর ভয়াবহ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ। তাই তিনি বলেন, বাংলাদেশ তো আর কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন করে না, সেটা করে ধনী দেশগুলো। তবে বাংলাদেশকে এর প্রভাব মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। শীত ও গরমের মত জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণও ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। দক্ষিণাঞ্চলের মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এসব মোকাবিলায় সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে। উপকূলের বেড়িবাঁধ গুলোকে আরও মজবুত করতে হবে। শেলটার বাড়াতে হবে আরও অনেক বেশি করে।

টিআইবির জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এম. জাকির হোসেন খান আবহাওয়ার এমন আচরণের জন্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করলেন। নিউজনাউ২৪ এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, উন্নত দেশেগুলো যত কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন করবে , আমাদের মত দেশগুলোকে তত বেশি ভুগতে হবে। আমরা ভুগছিও। ভবিষ্যতে আরও ভুগতে হবে।

করোনার সময় কার্বন নির্গমনের মাত্রা অনেক কমালেও চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা চ্যালেঞ্জিং হবে। আর এই বড় চ্যালেঞ্জটা নিতে হচ্ছে কিংবা বাংলাদেশকেও। আর ভাবার সময় এসেছে, এই চ্যালেঞ্জ নিতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

নিউজনাউ/এমএএন/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: