পতাকা উড়ছে , রূপকার মরছে

সুপন রায়: আমি যখন মায়ের পেটে, তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে | আমাকে পেটে নিয়ে আমার সহজ- সরল মা, কুমিল্লা থেকে পায়ে হেঁটে, রিকশা করে, ঠেলা গাড়ী ধরে, বহু কষ্টে পৌঁছান ত্রিপুরার রাজ্যের ছোট্ট শহর উদয়পুরে |

সেখানকার জেনারেল হাসপাতালে ২১ নভেম্বর ১৯৭১ সালে আমার জন্ম হয় | বিদেশের মাটিতে জন্মেছি বলেই হয়তো আমার ভাল নাম রাখা হয় বিদেশ | যদিও কখনো উচ্চারিত হয়নি তা | মায়ের মুখে শুনেছি, খুবই ছোট লিকলিকে পটকা টাইপ বাচ্চা চেহারা পাই আমি |

দেশ স্বাধীন হলে ছোট্ট এই আমিকে বুকে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, পরিবারের অন্যদের সাথে কুমিল্লা পৌঁছান মা | তাই মুক্তিযুদ্ধের সেই মহান আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, উত্তেজনা – এর কিছুই দেখবার বা বুঝবার সুযোগ হয়নি | আফসোস হয় এই সুযোগ আমরা পেলাম না | তবে হলফ করে বলতে পারি, সুযোগ পেলে অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়তাম | পিছুপা হতাম না |

আমি পাইনি | আমার মতো অনেকেই পাননি | কিন্তু আমরা পেয়েছি সমৃদ্ধ ইতিহাস | এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বের হওয়া ৩ খণ্ডের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ ভালো মানের তথ্য ও গবেষণা আছে | সেখান থেকে জানি, কোন পটভূমিতে আমাদের জাতীয় পতাকার ডিজাইন হয় | কীভাবে কোন হলে বসে পতাকা আঁকা হয়, নিউ মার্কেটের মোড়ে, কোন বিহারী সেলাই করে দিয়েছিল তা , তাঁর সবই জানতে পারি |

মনে প্রশ্ন জাগছে, তবে কেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জানতে পারল না ? জানলেও কোনো উদ্যোগ নিলো না !! পতাকার রচয়িতা কেন না খেয়ে মরতে বসবে ?

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে, সবার আগে কী দরকার হয় ? দরকার হয় ৩ টি | ১. ভূখণ্ড | ২. একটি নাম| ৩. প্রতীক, পতাকা |

সেই পতাকা উড়ছে | গাড়ীতে | স্কুলে | সচিবালয়ে | উপজেলা পরিষদে | সংসদ ভবনে | শুধু উড়তে পারছেন না শিবু দা | জীবনের শেষ ধাপে এসে তিনি নুইয়ে পড়েছেন | কিন্তু মচকাননি এতটুকু |

মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন| কিন্তু তিনি ভাতা নেন না।পরিবারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম পুত্র সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বেকার।পাঁচ মিনিট কথা বলতে দুইবার নেবুলাইস করতে হয়।শ্বাসকষ্টে ভুগেন সারা বছর।কিছু বন্ধুর সহযোগিতায় টেনেটুনে চলে সংসার আর তার চিকিৎসা।

অভিমানী শিবুদা তবুও কাউকে কিছু বলতে চান না,অভিযোগও নেই কারো প্রতি।শুধু কণ্ঠে হতাশা একটাই। স্পষ্ট করে বলেন যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন দেশের জন্য পতাকা বানিয়েছিলেন,যে স্বপ্নে বিভোর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি।

আজ যখন দেশপ্রেমের কথা বলে হাজার কোটি লুট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে শিবুদা খাদ্য কষ্টে ভোগেন | চিকিৎসার অভাবে তার ফুসফুস তাকে প্রাণ খুলে কথা বলতে সায় দিচ্ছে না | পক্ষকাল পেরিয়ে যায় এক টুকরো আমিষের অপেক্ষায়।

শিবুদারা যদি অবহেলিত থেকে যায়, ৪৯ বছর পরে এসে স্বাধীনতার গৌরব করি কিভাবে ?

কী করে উড়াই পতাকা ? কী করে চুপ করে থাকি ?

ঘেন্না হয় নিজের প্রতি | গলা দিয়ে খাবার নামে না | তার হাতে আঁকা পতাকা নিয়ে জাতিসংঘে ভাষণ দিই | ক্রিকেট খেলায় জিতে মাঠে দৌড়াই, কেঁদে বুক ভাসাই |

জাতীয় সংগীত বেজে উঠলে কী দেখে আমরা উঠে দাঁড়াই ? পতাকা |

পতাকা আমার অস্তিত্ব | আমার পরিচয় | আমার জাতীয়তা| অহংকার | আমার প্রতীক | আমার গৌরব | আমার কান্না | আমার আনন্দ |

আমার বাংলাদেশ | আমরা কী আমাদের পতাকার রূপকারকে কষ্টে রাখতে পারি ?

লেখক : সুপন রায়, সিনিয়র সাংবাদিক।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: