শুভ জন্মদিন, এনটিভি

জহিরুল আলম: শুরু হলো আঠারোর পথ চলা। ভেবে পাই না সময়টা কিভাবে চলে গেল । জীবনের একটা বড় সময়। এনটিভিতে আমারও সূচনা ১৮ বছরের। অনুভবে তাই আমিও স্পন্দিত। কত অভিজ্ঞতা, কত ঘটনা-দুর্ঘটনা। কত বাধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতা। কত বিপদ। অনিশ্চয়তা। আবার কত সুখের স্মৃতি। কিছু আসে হামাগুড়ি দিয়ে। কিছু চকিত চমকে। কিছু কল্পনার ভেলায়। এখানে ভালবাসার গান আছে। কর্মচাঞ্চল্য আছে। এ যেন বন্ধুত্বের নকশি কাঁথায় মোড়া একটা পরিবার। আছে উচ্ছ্বাস। প্রাণশক্তি। আছে অবসাদ, অনেক সহকর্মীর চলে যাওয়ার নি:সঙ্গতা। তাই ভাবনাগুলো ছুটে চলে নিরুদ্দেশ।

বার্তা কক্ষে স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট থেকে হলাম চীফ অব করেসপন্ডেন্টস, এরপর চীফ নিউজ এডিটর। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বর্তমানে পুরো নিউজ এন্ড কারেন্ট এ্যাফেয়ার্স দেখভালের আস্থা রেখেছেন আমার ওপর। কর্মজীবনে প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে সার্ভ করার এরচেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে। বিশেষ করে করোনার এই কঠিন সময়ে। আর এই পথে রয়েছে বার্তা কক্ষের উদ্যমী, সৃজনশীল ও নিবেদিত সহকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতা। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিও।

এনটিভিকে নিয়ে তাঁর দর্শকরাই সবচেয়ে ভাল মূল্যায়ন করবেন। কেন এনটিভি সময়ের সাথে আগামীর পথে। কোথায় শক্তি।।কোথায় তার সীমাবদ্ধতা। তবে আজ টিভি জগতে যা কিছু হচ্ছে সংবাদে, সংবাদ পরিক্রমায়, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে তার একটা বড় ভিত্তি ও রুচি রচনা করে দিয়েছে এনটিভি। ঝকঝকে ছবির প্রযুক্তি, সংবাদে দায়িত্বশীলতা, পরিবেশনায় নান্দনিকতা, পেশাদারিত্ব সবই এনটিভির গর্বের জায়গা। বহু ক্ষেত্রে এনটিভিই পাইওনিয়ার। সে কারণে একটা অবনত অহংকার থাকতেই পারে। সেটা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বিরোধী লড়াই হোক, ঝড়, বন্যা, আগুন কিম্বা করোনার মত মহাদুর্যোগে। এনটিভির সাংবাদিকরা সব সময় নির্ভীক ছুটেছেন মাঠে ময়দানে। প্রতিটি ঘটনা তুলে এনেছেন সবার আগে। ওয়ান ইলেভেনের চ্যালেঞ্জ, পাঁচ মের  আগে-পরের ইনফার্নো, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, রায় কার্যকর, শাহবাগের গণজাগরণ এমন অসংখ্য আলোচিত ঘটনা সাহসের সঙ্গে কভার করেছে এনটিভি। সেখানে এনটিভি সবার কথা বলেছে । নির্মোহভাবে। রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত সময় ও সমাজে কোন মহল বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত ছিল না এনটিভির। এটি তার সম্পাদকীয় নীতির অন্তর্গত শক্তি।

এনটিভি যা কিছু করেছে সবকিছুর মধ্যে ছিল স্যাটেলাইট টিভি জগতে নতুন কিছু, যার এপ্রেসিয়েশন দর্শকদের কাছ থেকে এসেছে। এনটিভি অন্ধকার অবক্ষয়কে যেভাবে তুলে ধরেছে, অর্জনের গল্পও বলেছে সবসময়।

প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর ধরে কত শত অনুষ্ঠান, খবর আমরা কভার করেছি তার কোন হিসেব নেই। প্রতিটির পেছনেই আছে একটা না বলা গল্প। সেই গল্প হয়তো আলাদা করে কোনদিনই করা হবে না।  প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে ১৮ বছরের এনটিভিই সেই ভালবাসার গল্প।

আজকের এই অবস্থানে আসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিটি সহকর্মীর অক্লান্ত শ্রম ও ত্যাগ। সেকথা বলে শেষ করা যাবে না। মনে পড়ে ক্যামেরাম্যান তারেক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২১ আগস্টের সেই বর্বরোচিত হামলার ফুটেজ সংগ্ৰহ করেছিল। তারই ফুটেজ কাজে লেগেছিল ওই মামলার তদন্ত কাজে। কাজ থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে জীবন দেয় ভিডিও এডিটর আতিক। ক্যান্সারে মারা গেল লিনা। করোনায় প্রাণ দিলেন অনুষ্ঠান বিভাগ প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ, আমাদের প্রিয় কামাল ভাই। ১৭ বছর পূর্ণ করার এই আনন্দের মাঝে বাজে তাই বীণার সুর। তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

একসময় আগুনের লেলিহান শিখা কর্মীদের সাময়িক দিশেহারা করেছিল। তবে আগুন কেড়ে নিতে পারেনি এনটিভি কর্মীদের স্বপ্ন। সময়ের সঙ্গে স্বপ্ন শিখা আরও প্রজ্বলিত হয়েছে।

এনটিভিকে ভুলে থাকেন না কর্মস্থল বদল করা পুরনো সহকর্মীরাও। এনটিভির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেন আত্মার।

সাংবাদিক হিসেবে আমারও একটা পরিচয় এনটিভি। সময় স্রোত স্বপ্ন কিছুই স্থায়ী নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সাংবাদিকতায় অনেকটা পথ পেরিয়েছি। সংবাদের জন্য দেশে-বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছি। দীর্ঘ সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টক শো’তে তুলে ধরেছি সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ। ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং নামের ইংরেজি অনুষ্ঠানে মুখোমুখি হয়েছি বহু বিদেশী অতিথির। পরিকল্পনা করেছি বহু অনুষ্ঠান। হয়েছে বার্তা কক্ষে নেতৃত্ব করার সৌভাগ্যও। চলার পথে পেয়েছি অগণিত দর্শক শুভানুধ্যায়ীর ভালবাসা। শুভ কামনায় হয়েছি সিক্ত।

স্মৃতির সোনালী উঠোনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে, প্রথম দিনের কথা। সংবাদপত্র থেকে এসে টিভি সাংবাদিকতায় যুক্ত হলাম। কঠিন কাজ। অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রশিক্ষণ আর ধারাবাহিক চেষ্টায় রপ্ত করেছি। পেয়েছি সহকর্মীদের উজাড় সহযোগিতা। আজ চারপাশে অগণিত সম্প্রচার সাংবাদিকের সরব পদচারনণা দেখে ভাল লাগে। তাদের পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয়ে এই মাধ্যমের আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হই।

জীবন নানা চ্যালেঞ্জ, ভাল-মন্দ, সুখ-দু:খের মিশেল। এরমাঝে টিভি জগতে একটা অনন্য প্রাপ্তি এনটিভি। তাই আমার কাছে এনটিভি সুরভিত স্মৃতিময় ১৭ বছর। পেশাগত নিষ্ঠায় নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। করোনার মত এই নিষ্ঠুর মহামারির সময়ে এবং আরও বহুকাল মানুষের পাশে থাক এনটিভি। স্মৃতিখাতার এলোমেলো, অর্থহীন নানা ভাবনার সঙ্গে আবেগ, ভালবাসার মিশেলে এনটিভি হয়ে থাক হৃদয়ের উষ্ণ অনুভব।

শুভ জন্মদিন, এনটিভি।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: