তিস্তায় পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসিদের

জুয়েল আহমেদ: আষাঢ়ে ঢলে আচমকা রাক্ষুসে রূপ ধারণ করেছে মরা তিস্তা। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) থেকে দু’কূল ছাপিয়ে নদীতে পানি বয়ে যায়। তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ২০ কখনও বা ১৮ আবার কখনও ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে ওঠে পানি।

যদিও সোমবার (২৮ জুন) সকাল ৬টায় গর্জন থেমে যায় এই নদীর, কমে যায় পানিও। সকাল ৯টায় নদীতে পানির প্রবাহ থাকে ২ সেন্টিমিটার ওপরে। আর বেলা ১২টার পর থেকে দ্রুতই পানি কমতে থাকে। সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানির প্রবাহ এসে দাঁড়ায় বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচে।

তবে গত পাঁচ দিন ধরে রংপুরের গংগাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছার তিন উপজেলার ২৪ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চরের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কষ্টের সীমা ছিলো না। গংগাচড়ার কোলকোন্দ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সারোয়ার রাজু নিউজনাউকে বলেন, বন্যায় উপজেলার ৯ ইউনিয়ের মধ্যে তার ইউনিয়নে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এবারও তাই হয়েছে। ইউনিয়নের চর চিলাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাঁধ ভেঙ্গে ৬শ’ ফুট এলাকা বিধস্ত হয়েছে। চিলাখাল ঢাকের চর, উত্তর চিলাখাল, মধ্যে চিলাখালসহ বিনবিনিয়া গ্রামের এলজিইডির করা নতুন পাকা সড়কের আধা কিলোমিটার সড়ক গিলে খেয়েছে তিস্তা। নিজ উদ্যোগে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রাথমিকভাবে ভাঙ্গনরোধে কাজ করছেন তিনি। পানিবন্দি মানুষদের যতটুকু পেরেছেন খাদ্য সহযোগিতা দিয়েছেন।

চিলা খালের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম (৬৫) জানালেন, ঘুম ভেঙে দেখেন বাড়ির ভেতরে কোমর পানি। কিছু বোঝার আগেই সব তলিয়ে গেছে। ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে নির্ভর ৫ জনের সংসারের সুখ বানের জলে ভেসে গেলো। চারদিক থইথই পানিতে ঘরবন্দী সবাই। সোমবার (২৯ জুন) পানি কমায় সুদের ওপর টাকায় চাল কিনে তা রান্না করে তিনদিন পর খেতে পেরেছেন। একই গ্রামের বেলাল (৩০), মকবুল হোসেন (৫৫) ও অনেকেই অভুক্ত আছেন। বন্যাকবলিত তারও এক বেলা খেলেও পরের বেলায় ছিলেন উপোস।

টানা পাঁচদিনের পানিযুদ্ধে টিকতে না পেরে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন উচু স্থানে। বিচ্ছিন্ন হয়েছে যোগাযোগ ব্যাবস্থাও। কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে না পেরে অসহায় তারা। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে কষ্টের ফসল। ভেসে গেছে পুকুরে থাকা স্বপ্নের মাছ। সবহারা মানুষরা এখন অনেকটাই দিশেহারা।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান নিউজনাউকে জানিয়েছেন, পানিবন্দী মানুষদের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত প্রশাসন। বিতরণের অপেক্ষায় ২শ’ ৩০ টন চাল ও সাড়ে ১০ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী অফিসারের দপ্তরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ে তা বিতরণের আশ্বাষ দেন তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান নিউজনাউকে বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এক সপ্তাহের ব্যাবধানে এই দুই বন্যা ছিলো হঠাৎ বন্যা। যদিও এ বন্যায় তিস্তা নদীর প্রধান বাঁধের বড় ক্ষতি না হলেও অতি বৃষ্টির কারণে বিচিছন্নভাবে ৭শ’ মিটার নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। সেগুলোও জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ চলছে। আগামি ১৫ দিনের মধ্যে তিস্তায় নতুন করে আর বন্যা না হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে কৃষি অঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুরসহ ৫ জেলায় যে ৯ হাজার ৩শ’ হেক্টরের ফসল নষ্ট হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়ার সব উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর। বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী নিউজনাউকে বলেন, চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমি। বানের পানিতে যেসব এলাকায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে সেইসব এলাকার কৃষকের জন্য ২শ’ ২২ একরে লাগানো সরকারি বীজ প্রনোদনা হিসাবে দেয়া হবে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে দিনরাত কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: