`আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

`আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে’ লালন সাঁঈজীর এই তত্ত্ববাণী মুক্তির পথ বাত‌লে দেয় তরুণ চিত্র‌শিল্পী রুহুল আ‌মিন তা‌রেক-এর। ‌নিউজনাউ২৪-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তরুণ এই চিত্র‌শিল্পী তু‌লে ধ‌রে‌ছেন চিত্রক‌র্ম নি‌য়ে ‌নিজস্বতা এবং ভ‌বিষ্যৎ প‌রিকল্পনা।

প্রশ্ন: রুহুল আ‌মিন তা‌রেক। ব্য‌ক্তিজীব‌নের বাই‌রে আপ‌নি একজন চিত্র‌শিল্পী। রঙতু‌লির ক্যানভা‌সে আপনার পথচলার শুরুটা কিভা‌বে…

—বল‌তে গে‌লে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আঁকাআঁকির জগ‌তে পথচলা শুরু আমার। সাইনবোর্ড পেইন্ট দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলাম। ছোটবেলায় চোখ আটকে যে‌তো নৌকার মধ্যে নানারকম পেইন্টিং দে‌খে। ‌কি নিখুঁত কারুকাজ। তখন ভাবতাম, ইস আ‌মিও য‌দি এভা‌বে আঁকতে পারতাম!

তারপর ক্লাস এইটে নিয়মতান্ত্রিক চর্চা শুরু স্বর্গীয় বাবু প্রণব কুমার বণিকের হাত ধরে। এরপর ১৯৯৮ সা‌লে সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হই। তখন আমি কলেজে পড়ি। শিল্পী অরবিন্দু দাস গুপ্তের তত্ত্বাবধানে ড্রইং বিশেষত ফিগার ড্রইংয়ে বেশী চর্চা করি। আর শিল্পী পরিতোষ হাজরার কাছে শাস্ত্রীয় ধারায় স্কেচ চর্চা শুরু। প্রয়াত শিল্পী শাহ আলমের সংস্পর্শ আমাকে দারুণভাবে প্রাণীত করে। আরেকজন মহান ব্যক্তির কথা না বল‌লেই নয়, যার সংস্পর্শ আমার চারুকলায় পড়ার মানসকে আরো তরা‌ন্বিত করে। তিনি গীতিকার, মরমি সাধক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। এরপর ভ‌র্তি হই ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের চারুকলা অনুষ‌দের ছাপচিত্র বিভাগে।

‌প্রশ্ন: শিক্ষার পাঠ চু‌কি‌য়েছেন। এখন প্র‌ফেশন হিসে‌বে কি বে‌ছে নি‌য়ে‌ছেন?

—প্রভাষক হিসে‌বে যোগ দি‌য়ে‌ছিলাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ পাবলিক কলেজে’। কিন্তু চাকরির জন্য ছবি আঁকায় মনোযোগ দি‌তে পার‌ছিলাম না। তাই চাক‌রিটা ছে‌ড়ে দি‌য়ে‌ছি। এখন আ‌মি ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট।

প্রশ্ন: পেই‌ন্টিং-এর তো অ‌নেকগু‌লো মাধ্যম র‌য়ে‌ছে। আপ‌নি কোন মাধ্যম নি‌য়ে কাজ কর‌ছেন?

—পেন্সিল, পেন, মিক্সড মিডিয়ায় কাজ করছি।

সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম উডকাট এবং পেন্সিল। উডকাটের ক্ষে‌ত্রে কাঠ খোদাইয়ের পর কাঠের ছাপ নেওয়া হয় কাগজে। আর এটাই এই মাধ্যমের পদ্ধতি। আর কাঠের টেক্সচারের যে কমনীয়তা কাগজে ভেসে ওঠে তা অন্যকোনো মাধ্যমে আনা সম্ভব নয়। যদিও মিডিয়াটি বেশ শ্রম ও সময়সাধ্য।

প্রশ্ন: আপনার চিত্রক‌র্মে কোন বিষয়গু‌লো দৃশ্যমান বেশি হয়?

—মানুষ আর প্রকৃ‌তি। দেখুন, ছবি আঁকার মাধ্যমে শিল্পী তাঁর দেখা এক নতুন রূপের অন্বেষণ করে। প্রকৃতির মধ্যে কিংবা মানব শরীরের নানা ভঙ্গিমা আমাকে ব্যাকুল ক‌রে। চি‌ত্রে আ‌মি আত্মার মুক্তির কথা তু‌লে ধ‌রতে চাই। এ‌ক্ষে‌ত্রে আমাদের সমৃদ্ধ বাউল দর্শনের নানান বাণী আমাকে উদ্বুদ্ধ ক‌রে। ‘আত্ম তত্ত্ব যে জেনেছে দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে’ লালন সাঁঈজীর এই তত্ত্ববাণী আমাকে আত্মার মুক্তির পথ বাতলে দেয়। আর শাহ আব্দুল করিম, সাধক ক্বারি আমিরুদ্দিন এর বাণী আমার ছবির দিশাহারা মানবকে মুক্তি দেয়।

প্রশ্ন: ছ‌বি আঁকার ক্ষে‌ত্রে অবজার‌ভেশন পাওয়ার ক‌তখা‌নি প্র‌য়োজন?

—অবজারভেশন ছাড়া আঁকা অনেকটা প্রাণহীন মূর্তির মতো। একজন চিত্রীর অবজারভেশন ক্ষমতা অনেক তীক্ষ্ন হওয়া চাই। আমাদের চারপাশে শত, সহস্র বিষয় ঘুরছে। কো‌নোটা দেখা যায় আবার কো‌নোটা অ‌দেখা। সুক্ষ্ম অবজারভেশনেই সেগুলোকে ক্যানভাসে তুলে আনা সম্ভব। ছবি তো বাস্তবতার সবচাইতে প্রতীকী রূপ। সুক্ষ্ম কিংবা স্বতন্ত্রভাবে দেখাই চিত্র রচনার পূর্বশর্ত।

প্রশ্ন: ক্যানভাস সাজা‌তে কা‌রা আপনার অনু‌প্রেরণার পা‌থেয়?

—শিল্প গুরু শফি উদ্দিন আহমেদ, শিল্পী আনিসুজ্জামান, রফিকুন নবী, শিল্পী রতন মজুমদারের কাঠখোদাই চিত্র আমার বিশেষ প্রেরণা। চারুকলায় পড়াকালীন সময়ে আমার শ্রেনী শিক্ষক রোকন উজ্জ্বল স্যারের আন্তরিক শিক্ষাদান আমাকে ছবি আঁকায় আরো প্রত্যয়ী করেছে। আর আমা‌র কা‌জের অনু‌প্রেরণার পা‌থেয় শিল্পী মূর্তাজা বশীর, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, শিল্পী, আবুল বারক আলভি, শিল্পী মাহমুদুল হক, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী শহীদ কবির, শিল্পী অনুকূল মজুমদারের প্রশংসা।

প্রশ্ন: চিত্র প্রদর্শনী নি‌য়ে এবং ভ‌বিষ্য‌তে আঁকাআঁকি নি‌য়ে কি ভাবনা?

—প্রথম একক প্রদর্শনী ক‌রে‌ছি এ বছ‌রের মা‌র্চে। উত্তরার গ্যালারি কায়ায় সে প্রদর্শনীর শি‌রোনাম ছি‌লো ‘টাইম এন্ড রিয়েলিটি’। আর প্রতিটি ছবি আঁকায় নতুন সংগ্রামের দরজা তৈরি হয় আমার কা‌ছে। কেবল আনন্দ নয়, এ সংগ্রামে র‌য়ে‌ছে উৎকন্ঠা, ভয়। বলতে পারেন এই অদ্ভুত আনন্দের জন্যই আঁকতে চাই শেষ নিঃশ্বাস অব্দি।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: