মৌলভীবাজারে নদী ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

এম এ মোহিত, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদী ভাঙনের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ। এই তিন নদী খনন ও মনু নদীর মৌলভীবাজার শহর রক্ষা বাঁধ এবং এই তিন নদীর দু’পাড়ের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ স্থায়ী ভাবে সংস্কার না করায় বর্ষা মৌসুম আসতেই বাঁধে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে বন্যা আতঙ্কে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মৌলভীবাজারবাসীর।

প্রতিবছরই এসব প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কারের নামে কোটি কোটি বরাদ্দ হলেও কাজের কাজ কিছুই না করে এবং কোথাও কোথাও দায়সারা কাজ করে ঠিকাদার আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মিলে ভাগাভাগি করে লুটেপুটে খাচ্ছেন সরকারের দেয়া জনগণের ট্যাক্সের এই বিপুল পরিমাণ টাকা।

সীমান্ত নদী নামে পরিচিত মনু ও ধলাই নদীয় উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। মনু নদী মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রাজনগর উপজেলার মধ্যদিয়ে মৌলভীবাজার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশ অংশে ৭৪ কিলোমিটার বয়ে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ নামক স্থানে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে।

আর ধলাই নদীও ভারত থেকে উৎপন্ন হয়ে ৩০ কিলোমিটার বয়ে রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের কাছে মনুনদীতে মিলিত হয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর দু‘তীরের প্রতিরক্ষা বাঁধের শতাধিক স্থান ভাঙনের মুখে পড়ে বাড়ি ঘর ফসলের মাঠ, বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এদিকে কুশিয়ারা নদীর অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে নদী তীরবর্তী দুই ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়ি, মন্দির, মসজিদ ও কবরস্থান ইত্যাদি।

অব্যাহত ভাঙনের ফলে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এসব গ্রামের দুর্গতরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। কুশিয়ারা নদীর অব্যাহত এ ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

রাজনগরের ফতেহপুর ইউনিয়নের ভাঙন কবলিত এলাকায় বসত বাড়ির বুক চিরে নতুন করে ফাটল দেখা দেয়ায় কুশিয়ারা নদী পাড়ের বিলবাড়ি, সাদেকপুর, পূর্ব বেড়কুঁড়ি, পশ্চিম বেড়কুঁড়ি, হামিদপুর, শাহপুর, আব্দুল্লাহপুর, কাসিমপুর এবং উত্তরভাগ ইউনিয়নের ছিক্কাগাও, কামালপুর, সুরিখাল, জুগিকোনা, কেশরপাড়া, সোনামপুর, উমরপুর, গালিমপুর, বাদে নারাইনপুর গ্রামের মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বেড়কুঁড়ি গ্রামের রয়জুন বিবি নিউজনাউকে জানান, ‘প্রতিদিন ভিক্ষা করে ক্ষুধা নিবারণ করি। কুশিয়ারার পাড় ঘেঁষে ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটি কয়েক মাস আগে নদী গর্ভে চলে গেছে। এখন গৃহহারা হয়ে দিন কাটাচ্ছি।’

একই গ্রামের আকামত মিয়া নিউজনাউকে জানান, বসত-ভিটার বুক চিরে নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোন সময় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে অবশিষ্ট অংশটুকু।

ওই গ্রামের গৃহহারা মছকন মিয়া, আব্দুল মোতালিব ও রজাক মিয়া জানান, ভাঙনকৃত এলাকায় প্রথমে ফাটল দেখা দেয়। এসময় মানুষ বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি থেকে মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেন। প্রায় সময় নদী তীরের সমগ্র এলাকা ভুমিকম্পনের মত কেঁপে উঠে আর বিকট শব্দ করে মুহূর্তের মধ্যে ভিটে-মাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

রাজনগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল নিউজনাউকে বলেন, ‘কুশিয়ারা তীরবর্তী এলাকাগুলো ভালোভাবে পরিদর্শন করা হয়নি। কারণ সবেমাত্র কাজে যোগদান করেছি। পূর্বে এলাকাবাসী আবেদন দিয়ে থাকলে তাদের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ধলাই নদীর বাঁধ মেরামতের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। আর কুশিয়ারা নদী সিলেট বিভাগের তিনটি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত। তাই মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা মিলে একত্রে ‘কুশিয়ারা নদী ভাঙ্গন এলাকা রক্ষা প্রকল্প’ নামে যৌথ একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারের ডিজাইন চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সিলেট এবং সুনামগঞ্জের ডিজাইন হয়ে গেলে একত্রে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

এদিকে মনু নদীর ৯৯৬ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার খবর জানাজানি হলে কাজ ভাগিয়ে নিতে নানামুখী তৎপরতা এখনই শুরু করে দিয়েছে একাধিক ঠিকাদারি সিন্ডিকেট। এতে নতুন এ প্রকল্পের কাজ মান বজায় রেখে হবে? নাকি লুটপাট হবে নদীপাড়ের মানুষের মনে সংশয় সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।

একসময়ের খরস্রোতা নদীর নাব্যতা হারিয়ে পানির ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এমতাবস্থায় নদীগুলো খনন করার দাবিতে আন্দোলনের ফলে মনু নদীর ২৪ কিলোমিটার খননের জন্য ২০১৭-১৮ সালে ২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। ঢাকার বিডিএল নামীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই খননকাজ পায়। কিন্তু মনু নদীর কিছু খনন করে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মালামাল গুটিয়ে চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে গত বছরের (২০১৯ সালের) ১৯ ফেব্রুয়ারি টেন্ডারের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। মাঝপথে মৃত্যু ঘটে মনুনদী খনন প্রকল্পের।

এব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রকৌশলী সমর কুমার পাল নিউজনাউকে বলেন, দেশের ৪২টি নদী খনন প্রকল্পের অধীনে মনুনদী খনন কাজ শুরু হয়। মনু নদী খননের ফলে তীরবর্তী বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় নদীর উজানের দিকে না গিয়ে ভাটির দিকে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রকল্প বাতিল করা হয়নি।

জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী নিউজনাউকে জানান, মনু নদীর বন্যা ও ভাঙনের কবল থেকে রক্ষার জন্য ২০১৮ সালে বন্যার পর একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গত ২১ জুন একনেকের সভায় ৯শ’ ৯৬ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। কিছু আনুষঙ্গিক কাজ শেষে আগামী শুষ্ক মৌসুমে এ প্রকল্পের অধীনে ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য মনুনদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের উন্নয়ন কাজ শুরু হবে। তাছাড়া ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে মনু নদী মৌলভীবাজার শহর রক্ষা বাঁধের ২৮৫ মিটার পাকাকরণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এতে মৌলভীবাজার শহর এখন বন্যা ঝুঁকিমুক্ত। বাকি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মনু নদীর ভাঙন ও বন্যা সমস্যা আর থাকবে না।

নিউজনাউ/এবি/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: