৮ম লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ-২০২০: ন্যাশনাল ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্র খুঁটি

নিউজনাউ ডেস্ক: সম্প্র‌তি অনু‌ষ্ঠিত হ‌য়ে গে‌লো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ভার্চুয়াল চলচ্চিত্র উৎসব ‌‌‘৮ম লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ-২০২০’। উৎস‌বে ন্যাশনাল ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে ‘খুঁটি’ চলচ্চিত্রটি। পাঁচদিনব্যাপী এই উৎসবের মূল আয়োজক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আগারগাঁও।

গে‌লো সপ্তা‌হে, জুম ক্লাউড মিটিং এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের সমাপনী। করোনা দুর্যোগের দমবন্ধ করা সময়ে এই চমৎকার সুযোগটিতে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মতো।

বিচারক প্যানেলের সদস্য, স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা এ,কে,এ রেজা গালিব ন্যাশনাল ক্যাটাগরিতে তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল নির্মাতা জহিরুল হাসান নির্মিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রেক্ষাপটের চলচ্চিত্র ‘খুঁটি’-কে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ‘খুঁটি’ চলচ্চিত্রকে ‘মূলত একটি জনগোষ্ঠীর মানুষের শেকড় অনুসন্ধানের যাত্রাপথ’ বলে মন্তব্য করেন তারা। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আসাদুজ্জামান নূর এমপি, ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিনুল ইসলাম খান, আইটিআই-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ঢাকা ডকল্যাব-এর চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, উৎসব পরিচালক তারেক আহমেদসহ দেশ ও দেশের বাইরের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ।

খুঁটি- প্রামাণ্যচিত্র প্রসঙ্গে: খুঁটি (ROAD TO ROOTS) চলচ্চিত্রটি প্রামাণ্যধর্মী চলচ্চিত্র। স্থিতিকাল ৩৩ মিনিট ৩১ সেকেন্ড। চলচ্চিত্রটির চিত্রধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে এবং ভারতের ঝাড়খান্ড প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। অনুসন্ধানধর্মী এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে ২০১৭-২০১৮ সালে এবং প্রিমিয়ার প্রদর্শনী হয় ১৭তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ। এরপর ভারতের সুবিখ্যাত চলচ্চিত্র উৎসব দাদাসাহেব ফালকে উৎসবসহ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে দুইটি ভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

চলচ্চিত্র প্রেক্ষাপট: আর্য আগমনের পূর্বেই এই অঞ্চলে যাঁরা বাস করতেন, আমরা যাদের প্রাকৃতজন বলে জানি তাদের মধ্যে রয়েছে মুণ্ডা, কোল, সাঁন্তাল জাতিগোষ্ঠী। মুণ্ডাদের আদি নিবাস ভারতের ঝাড়খান্ড। প্রকৃতি পূজারী জঙ্গল ঘনিষ্ট, সরল এই জনগোষ্ঠীর জীবনে যেমন রয়েছে নিপীড়ন-নির্যাতনের ভয়াবহ করুণ কাহিনী, তেমনি এঁদের রয়েছে সংগ্রামের ঐতিহাসিক পরম্পরা । বিরসা মুণ্ডা, যিনি বৃটিশরাজ ও স্বদেশি দিকু (মহাজন) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ডাক দিয়েছিলেন ‘উলগুলান’ (মহাবিদ্রোহ)-এর। যদিও সে আরও পরের অর্থ্যাৎ ১৮৯৫-১৯০০সালের ইতিহাস। কিন্তু তার প্রায় ১০০ বছর আগে, অর্থ্যাৎ ১৭০০ সালের শেষের দিকে, বৃটিশ সরকার আচমকা ঘোষণা দেয়, ভূমির উপর মুণ্ডাদের অধিকার নেই। মুণ্ডা এমন এক জাতিগোষ্ঠী যাঁরা জঙ্গল ও ভূমি ছাড়া তাঁদের জীবন কল্পনাও করতে পারেন না এবং জঙ্গল কেটে উদ্ধার করা ভূমিতে তাঁদের প্রাচীন ‘খুটখুট্টি’ নিয়মে চাষাবাদ করেন। এঁরা যখন সেই ভূমি থেকে উচ্ছেদ হন তখন ছিটকে পড়েন ঝাড়খান্ড থেকে আন্দামান, ভুটান, উড়িষ্যা, এমনকি বাংলাদেশেও।

সময়ের সাথে বদলে গিয়েছে তাদের ভাষা, মুণ্ডা ভাষা এখন আর বাংলাদেশের মুণ্ডাদের মুখের ভাষা নেই। তাঁরা কথা বলেন সাদ্রি ভাষায়। এঁরা ভুলে গেছেন আপন ধর্ম- আদিধার্ম। এঁরা ভুলে গেছেন এদের সৃষ্টিকর্তার নাম – সিংবোঙ্গা। কিছু সামাজিক আচরণের মধ্যেই কেবল তাঁরা ধরে রেখেছেন জাতিগত ঐতিহ্য। গানে গানে রয়ে গেছে ২০০ বছরের আগের ইতিহাস।

আজকের দিনে এসে ‘ওঁরা তিনজন’ – কৃষ্ণপদ মুণ্ডা, রামপ্রসাদ মুণ্ডা আর গোপাল মুণ্ডা – তাঁরা খুঁজতে নেমেছেন সেই ২০০ বছর আগের ইতিহাস। বাংলাদেশের সুন্দরবনের কোল থেকে তাঁরা চলেছেন পূর্বপুরুষের ভিটের সন্ধানে – ঝাড়খন্ডের পাহাড়ি অরণ্যের পথে… ! মনে বাজছে গান,
‘খোঁজা খোঁজাতে আলি, পুঁছা পুঁছাতে আলি,
মানোয়াকের সাড়া কেতে দূরারে!’
ওঁরা কি পাবেন মানুষের সাড়া? পাবেন আপনজনার খোঁজ!

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: