মাস্ক পরে যেন হতাশা লুকায় মধ্যবিত্ত

মোঃ জিয়াউল হক:

“ট্রাক ভর্তি মালামাল নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ” এ রকম একটি ছবি সহ সংবাদ ছিল দেশের কয়েকটি পত্রিকা এবং টেলিভিশনের গত কয়েকদিনের শিরোনাম। করোনার আঘাতে লণ্ডভণ্ড সব। অস্থিরতার মুখে পড়েনি দেশের এমন কোন সেক্টর বাকী নেই, বাদ পড়েনি দেশের আবাসন খাতও ।

আয় রোজগার কমে যাওয়ায় মানুষ দিশেহারা। দুই-তিন মাসের বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে অনেকের। কারো কারো স্ত্রী আর সন্তানের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোন ভাবেই পেড়ে উঠছে না মানুষ। তাই নিত্য খরচ সামাল দিতে মানুষ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। কখনো কি কেউ ভেবেছে এই শহর ছেড়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে এভাবে গ্রামে ফিরে যেতে হবে? ব্যয় কমানোর জন্য অনেকে বাসা বদল করছেন।

অনেকে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে উঠছেন মেসে। ঢাকা শহরের সব এলাকার দেয়ালে দেয়ালে আর প্রতিটি বাড়ীর ফটকে শোভা পাচ্ছে বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন। ঢাকায় এর আগে কখনো একসঙ্গে এত বাসা খালি হতে দেখা যায়নি, দেখা যায়নি এত এত টু-লেট । যারা বাড়ী ভাড়ার টাকায় সংসার চালান, উপায় অন্তর না দেখে তারা এগুলো সেঁটে দিচ্ছেন। তারাই বা কি করবেন! ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ায় তারাও পড়েছেন অর্থ সংকটে।

করোনার এ সময়কে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। অযাচিত ভাবে তারা বাড়িয়ে চলছে সব ধরনের নিত্য পণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেল, তরি-তরকারী হতে শুরু করে জীবন বাঁচানোর ঔষধ কোন কিছুই বাদ যাচ্ছে না। নকল পণ্যে বাজার সয়লাব। হাত জীবাণু মুক্ত করার অন্যতম উপকরণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার। বাজারে এক স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার এর নকল পাওয়া যাবে ৭/৮ ধরনের। কিছুটা অর্থ সাশ্রয়ের আশায় মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন কিনছেও সেগুলো। এক এন৯৫ মাস্ক নিয়ে কি তুঘলিক কাণ্ড ঘটে গেল তা তো সবারই জানা।

নেপালে একটা এন ৯৫ মাস্কের দাম যেখানে ১৫০ নেপালি রুপি, বাংলাদেশে সেই মাস্কের দাম ৯০০ টাকা। পুরাণ ঢাকার পাইকারি ফলের আড়ৎ বাদামতলীতে যে আপেল প্রতি কেজি বিক্রি হয় ১৭৭ টাকা, গুলশানের অভিজাত সুপারশপ ইউনিমার্টে সেই আপেল বিক্রি হচ্ছে ৮৮৫ টাকায়। মাত্র ২০ মিনিটের দূরত্বের রাস্তায় দাম বেড়েছে ৭০৮ টাকা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানে এমন তথ্য বেড়িয়ে আসে। গণ পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে প্রায় দিগুণ।

মূল্যবৃদ্ধির যাঁতাকলে পড়ে মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর এমনিতেই জনজীবন অতিষ্ঠ। এর ওপর নতুন যন্ত্রণার নাম বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বোঝা। এই চাপ তারা কতটা সহ্য করতে পারবে সেটি অবশ্যই ভাবার বিষয়। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময়ে যখন জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে তখন তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো কি উচিত ছিল?

২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর টানা ৬৬ দিনের জন্য বন্ধ থাকে সব অফিস আদালত কলকারখানা। স্থবির হয়ে পড়ে দেশের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত একটি জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৩৬ শতাংশ  মানুষ চাকরি বা কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। ৩ শতাংশ লোকের চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাঁদের ৬২ ভাগই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। গত ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রকাশিত একটি জরিপে বলা হয়েছে, সাধারণ ছুটির ৬৬ দিনে দেশের ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন লোক চাকরি বা উপার্জন হারিয়েছেন। করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আগে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ। ছুটির ৬৬ দিনেই ‘নব-দরিদ্র’ মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮০ লাখে।

আয়ের পথ বন্ধ থাকায় ভাসমান পেশা বেঁছে নিচ্ছেন অনেকে। কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন, কেউ মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন, কেউ কৃষি কাজ ধরেছেন কেউবা আবার ইজি-বাইক চালাচ্ছেন। স্কুল কলেজ না খোলায় বন্ধ রয়েছে বেতন। যারা টিউশনি করে কিছু বাড়তি আয় করে সংসার চালাতেন সে আয়ও এখন বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে এ ধরনের নানান পেশা বেঁছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি স্কুল কলেজের হাজার হাজার শিক্ষক। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়কে জয় করে সামনের সারিতে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন। এই যখন অবস্থা তখন ব্যবসা কমার অজুহাতে তাদের বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্তে সবাই হতাশ।

নিম্নবিত্ত মানুষ যে কোন ভাবে তাদের জীবন নির্বাহ করছে। তারা সরকার সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা অথবা নানা ব্যক্তি উদ্যোগের মাধ্যমে সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছে। প্রয়োজনে যে কারো কাছে এর হাত পাততে দ্বিধা করছে না। যত সমস্যা মধ্যবিত্তদের, তারা পেটে দানা পানি না পড়লেও কারো কাছে হাত পাতা তো দূরের কথা, একথা কাউকে শেয়ারও করবে না। উঁচু দালানের সুন্দর বেলকনী থেকে তারা সামনের রাস্তায় গরীবদের লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করার দৃশ্য উপভোগ করবে। হয়তো অজান্তে চোখের কোনায় সামান্য জলও গড়িয়ে পড়ে তাদের! করোনায় শুরুতে এদের অনেকেই সম্মিলিত ভাবে হয়তো দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করার নানা উদ্যোগও নিয়েছিল। কে ভেবেছিল এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে তাদেরও!

শাক-সবজির দাম বাড়বে, মাছ-মাংসের দাম বাড়বে, ঔষধ পত্র – প্রসাধন সামগ্রীর দাম বাড়বে, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের দাম বাড়বে, গণ পরিবহনের ভাড়াও বাড়বে, শুধু দাম বাড়বে না মধ্যবিত্তের। উল্টো তারা চাকরী হারাবে, তাদের বেতন কমে যাবে। তারা পারবে শুধু নীরবে চোখের পানি মুছতে। আর মাস্ক পড়ে চেহারায় ফুটে ওঠা নিজের হতাশাকে গোপন করতে। তাইতো তারা এই ঝলমলে শহর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।

লেখক: মোঃ জিয়া-উল হক, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক, রংধনু টেলিভিশন।

নিউজনাউ/টিএন/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান