বিয়ে বাড়িতে হাসিহীন এক জোড়া মুখ

নুর নবী রবিন, সন্দ্বীপ থেকে: বিয়ে বাড়ির চারিদিকে হৈ-হুল্লোড় আর উৎসবের আমেজ। পালকি করে কনে বাড়িতে উৎসবের মধ্যমণি বরকে নিয়ে এসেছেন বেহারারা। চলছে মেহমানদের খানাদানা। এতো আনন্দ আয়োজনের মধ্যেও দু’জন মধ্যবয়স্ক লোকের মন বিষন্ন। আগের আর সুদিন যে নেই তাদের! বলছি সেই পালকির বেহারা বা কাহারদের কথা। আজ আধুনিকতা আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দ্রুতগতির যন্ত্রের কাছে হার মেনে বিলুপ্ত হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন পালকি।

আগেকার দিনে পালকি ছিল সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর যাতায়াতের একটি মাধ্যম। মূলত বাড়ির মহিলারা বেড়াতে যেতে পালকি ব্যবহার করতো। সময়ের পরিবর্তনের সাথে বিয়েতে পালকি ব্যবহারের রীতি চালু হয়। গ্রামীণ বিয়েতে বরকে কনের বাড়িতে এবং কনেকে বরের বাড়িতে পালকি করে নিয়ে যাওয়া হয়। যারা পালকিকে ঘাড়ে বা কাঁধে করে বহন করে থাকেন তাদের পালকির বেহারা বা কাহার বলে।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় শহুরে বিয়েতে পালকি ব্যবহার সেকেলে হলেও আজও গ্রামে দেখা মেলে পালকির। রোদ-ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কাঠের বাক্স কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া এই মানুষেরা আজ ভাল নেই। অভাব অনটন, রোগ-শোক আর দুঃখ কষ্ট তাদের জীবনকে করেছে দুর্ভোগ্য, অভিশপ্ত। যে কাঁধে ভর করে তারা বয়ে নিয়ে যেত আনন্দ উৎসবের মধ্যমণিদের সেই কাঁধ এখন নিতে পারছে না নিজের সংসারের ভার।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার উড়িরচরের বিয়ে অনুষ্ঠানে পালকি দিয়ে বর-কনে আনা নেওয়ার কাজ করেন কৃষ্ণ চন্দ্র কাহার এবং পরীক্ষিত কাহার। চল্লিশোর্ধ এ দু’জন পালকি বহন করার কাজ করছেন প্রায় ১৫ বছর ধরে। এই পেশার পাশাপাশি প্রতি সন্ধ্যায় তারা বাজারে জিলাপি বুট বাদাম বিক্রি করেন। তবুও তিনবেলা স্ত্রী সন্তানদের মুখে ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে পারেন না তারা।

কাঁদোকাঁদো চোখ নিয়ে কৃষ্ণ চন্দ্র কাহার বলছিলেন, কিছুদিন আগে ছোট ছেলে খেলতে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না। কী করব কিছুই বুঝতেছিলাম না। শেষমেশ এলাকার একটি সামাজিক সংগঠন বাজার থেকে টাকা তুলে চিকিৎসা করিয়েছে। সুদের উপর ঋণ নিয়েছিলাম। ঋণের ভারে এখন আমাদের জীবন যায় অবস্থা।

একই পরিস্থিতি পরীক্ষিত কাহারের পরিবারেও। স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে সুদের উপর ঋণ নিয়ে সে শুরু করেছিল কাঁকড়ার ব্যবসা। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে ফের ফিরেছেন পালকি বহনের কাজে।

এদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এলাকার কোথাও বিয়ে হলে পালকির ডাক পড়ে। কেউ নগদ টাকা দেয়, কেউ দেয় চাল। যা পায়, তা নিয়ে চলে যায়। এভাবে কাটছে তাদের সময়, দিন, মাস, বছর। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো অবস্থা হতে মুক্তি পেতে অনেকবার চেয়েছে ভিন্ন কিছু করতে। কিন্তু জীবনের বাস্তবতার মারপ্যাঁচে বারবার আটকে গিয়ে থমকে গেছেন তারা।

মাঝসাগরে বিকল হওয়া জাহাজের নাবিকেরা যেমন উদ্ধারকারীর অপেক্ষায় দূরবীনে চেয়ে থাকে, তেমনি এরাও চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে সুদিনের খোঁজে অপেক্ষায় আছেন সেই উদ্ধারকারীর জন্য। তাদের মনেপ্রাণে কেবল একটাই প্রশ্ন, হাঁড়ভাঙা খাটুনির পরেও পারবে তো সন্তানদের দিতে তিনবেলা ভাত?

নিউজনাউ/পিপিএন

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: