‘কিং অফ পপ’ মাইকেল জ্যাকসন, প্রয়াণের ১১ বছর

নিউজনাউ ডেস্ক:

‘কিং অফ পপ’ নামে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত লাভ করেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। তাকে বলা হয় তারকাদের তারকা। খুব বেশি দিনের জীবন না হলেও তিনি রেখে গেছেন অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্পকথা। যা পৌরাণিক রূপকথাকেও হার মানায়। আনাচে-কানাচে ছড়ানো তার অগনিত শ্রোতা ও ভক্ত-অনুরাগী। ২০০৯ সালের এইদিনে অসংখ্য ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে যান তিনি। তিনি না থাকলেও বিশ্বজুড়ে তার ভক্তরা নানা আয়োজনে তাকে স্মরণ করেন তাকে। তার পুরো নাম মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন।

গোড়ালির ওপর ভর করে অভিকর্ষকে উপেক্ষা করে কীভাবে যে তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে নাচতেন তা এখনো সবার কাছে বিস্ময়! গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে সর্বকালের সবচেয়ে সফল সঙ্গীতশিল্পী তিনি। মৃত্যুর পরও জ্যাকসনকে নিয়ে ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল রয়েছে। জ্যাকসন একাধারে সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, গান লেখক, অভিনেতা, সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী। মূলত, তার নাচ ও গানের অসাধারণ শৈলী তাকে বিশ্বের শীর্ষ তারকায় পরিণত করে।

১৯৬৩ সালে পাঁচ বছর বয়সে মাইকেল জ্যাকসন পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তখন জ্যাকসন ফাইভ নামের সঙ্গীতগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে গান গাইতেন। প্রথম মিউজিক অ্যালবাম ‘ডায়ানা রোজ’ ১৯৬৯ সালে প্রকাশ পায়।

এ অ্যালবামের প্রথম একক গান ‘আই ওয়ান্ট ইউ ব্যাক’ ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে বিলবোর্ডের হট তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নেয়। শুরুটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে এককভাবে মাইকেল জ্যাকসনের ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু হয়।

১৯৭২ সালে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘বেন’ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৭৯ সালে তার পরবর্তী অ্যালবাম বের হয়। এ অ্যালবামের নাম ছিল ‘অফ দ্য ওয়াল’। যার ‘ডোন্ট স্টপ টিল ইউ গেট এনাফ’ ও ‘রকিং উইথ ইউ’ গান দুটির মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়তা পান তিনি। এক দশকের মাথায় জ্যাকসন হয়ে ওঠেন বিশ্বের পপসঙ্গীত শ্রোতাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। শুরু হয় তার একচ্ছত্র আধিপত্য। তারকাখ্যাতির সঙ্গে অর্থবিত্তের প্রাচুর্যে রূপকথার জীবন কাটাতে লাগলেন মাইকেল জ্যাকসন।

গানের তালে তালে মাইকেলের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইকেল জ্যাকসনকে শ্রোতারা গুরু ডাকতে শুরু করে। ১৯৮২ সালে তার ‘থ্রিলার’ অ্যালবামটি সারাবিশ্বে বেস্ট সেলিং অ্যালবাম হিসেবেই ইতিহাস গড়ে। মাইকেলের গাওয়া পাঁচটি সঙ্গীত অ্যালবাম বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত রেকডের্র মধ্যে রয়েছে। সেগুলো হলো- অফ দ্য ওয়াল (১৯৭৯), থ্রিলার (১৯৮২), ব্যাড (১৯৮৭), ডেঞ্জারাস (১৯৯১) ও হিস্টরি (১৯৯৫)।

১৯৮০’র দশকে মাইকেল জ্যাকসন সঙ্গীত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী যিনি এমটিভিতে এত জনপ্রিয়তা পান। তার গাওয়া গানের ভিডিওর মাধ্যমেই এমটিভির প্রসার ঘটেছিলো। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রোবট ও মুনওয়াক (চাঁদে হাঁটা) রয়েছে।

২০০১ সালে থ্রিলারের একটি রিভাইসড এডিশন বের হয়। এরপর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বের হয় ডিলাক্স এডিশন থ্রিলার ২৫। যাতে নতুন একটি গান, সাক্ষাৎকারসহ যুক্ত হয় নানা ফিচার। এখনো অনেক নতুন অ্যালবামের ভিড়ে ২৮ বছরের পুরনো অ্যালবামটির বিক্রি কমেনি। অথচ, একটা সময় কৃষ্ণাঙ্গ বলে সমাজে নিচু চোখে দেখছে সবাই- এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে ফর্সা করে তোলেন জ্যাকসন। নিজের চেহারার কৃষ্ণাঙ্গ থেকে শ্বেতাঙ্গে রংবদল নিয়ে অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয় তাকে।

একসময় শিশু যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যৌন হয়রানির অভিযোগে ২০০৫ সালে আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল এই সঙ্গীতশিল্পীকে। মাইকেলের নির্যাতনের বিষয়টি লাসা হয় তার কন্যা প্যারিসের আত্মহত্যার চেষ্টার পর। এফবিআই যে তালিকা দিয়েছে সেখানেও অভিযোগের সত্যতার দেখা মেলে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জ্যাকসন সম্পর্কে স্পর্শকাতর গোপন ফাইল প্রকাশ করে।

দাম্পত্য জীবনে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন রকস্টারের স্বপ্ননায়ক এলভিস প্রিসলির একমাত্র সন্তান লিসা মেরি প্রিসলিকে বিয়ে করেন। কিন্তু অল্পদিনেই ভাঙন আসে এই সুখের সংসারে। ১৯৯৬ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ৯৭’ সালে আবারো বিয়ের পিঁড়িতে বসেন পপসম্রাট। পেশায় নার্স ডোবরা জেনি রো এর সাথে দু’বছর সংসার করার পর ১৯৯৯ সালে আলাদা হয়ে যান এবং তালাকের সময় দুই সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্ব ডোবরা মাইকেলকে প্রদান করেন।

জীবনের শেষদিকে বিভিন্ন যন্ত্রণায় বিরক্ত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। মুসলিম হবার পর তিনি মিকাঈল নাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

১৩টি গ্র্যামি পুরস্কার, ১৩টি ১ নম্বর একক সঙ্গীত, এবং ১০০ কোটিরও বেশি মাইকেলের অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে এবং এখনো বিক্রি হচ্ছে। বিনোদন জগতের মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন এবং তার দানকৃত অর্থের পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

জ্যাকসনের আচমকা মৃত্যুর জন্য দীর্ঘমেয়াদে পেইন কিলার সেবনকে দায়ী করা হয়। তবে দায়িত্বে খামখেয়ালি করার কারণে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী মার্কিন চিকিৎসক ড. কনরাড মারেকে চার বছরের জন্য কারাবাস সাজা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক কখনোই শেষ হবে না। মাইকেল ব্যক্তিজীবনে খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না। কেউই পূর্বানুমতি ছাড়া তার বাড়িতে ঢুকতে পারত না। খুবই এলোমেলো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: