ত্বকী হত্যা: বিচার চেয়ে বাবা’র লড়াইয়ের ৭ বছর

নুসরাত সুপ্তি: ৬ মার্চ, ২০১৩। সেদিন সকালে ত্বকী আর আমি একসাথেই নাস্তা করেছিলাম। দুপরে ওর মা চলে গেল ত্বকীর নানা বাড়ি। ওইদিন সকাল থেকেই ওকে যেন খুব বিষন্ন লাগছিল। বিকাল ৪টার দিকে সুধীজন পাঠাগারে বই আনার জন্য ত্বকী বাসা থেকে বের হয়েছিলো। বাসায় পড়নে থাকা জামাটা পড়েই রওনা হতে দেখে আমি বললাম জামাটা বদলে নেও। এরপর দেখি মোবাইল ফোন ছাড়াই বের হয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম ফোন নিয়েছো? বলল, নাহ। মোবাইল নিয়ে ত্বকীকে এগিয়ে দেওয়ার সময় বললাম তোমাকে বিষণ্ন মনে হচ্ছে । তুমি কি কিছু ভাবছ বা চিন্তিত? ও বলল, নাহ বাবা। এরপর ত্বকী বেরিয়ে যায়। এটাই ছিল আমার ছেলের সাথে আমার শেষ কথা।

এই কথা গুলো বলেছেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও নিহত ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি। তানবীর মোহাম্মদ ত্বকী ও রফিউর রাব্বির এটা ছিল সেই শেষ মুহুর্ত। বাবা ও ছেলের মাঝে শেষ কথোপকথন। এরপর রফিউর রাব্বি তার সন্তানের দেখা পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু বাবা ডাক শুনতে পাননি। মানুষরূপে কিছু নরপশু হত্যা করেছিল ত্বকীকে। সন্তানের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে সে দিন থেকে শুরু হয়েছে তার সংগ্রাম। বিগত ৭ বছর যাবৎ চলছে সন্তান হারোনা এক বাবার সংগ্রাম। নিউজনাউকে সেই বাবা তার সন্তানের সাথে কাটানো আবেগময় কিছু ঘটনা সম্পর্কে বলেন।

আজ বাবা দিবস। সন্তানের জন্য ভরসা ও নিরাপত্তার ছায়ার নাম বাবা। বাবার হওয়ার অনুভূতি যে এক অন্যরকম অনুভূতি। প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, ত্বকী আমার প্রথম সন্তান, যে দিন ত্বকী জন্মগ্রহণ করেছিল সেই দিনটি ছিল বিজয় দশমীর দিন। সেদিন বিকালে ত্বকী তার নানা বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করে। সে দিন, সেই মূহুর্তে পেয়েছিলাম ভিন্ন এক অনুভূতি, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এরপর ত্বকীর কৈশোরে উপনীত হওয়ার সময়ে ত্বকীর সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ত্বকী ছিলো খুব শান্ত স্বভাবের, কারো সাথে খুব বেশি কথা বলতো না। তবে মানুষের প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড ভালোবাসা।

বাবা ছিলো ত্বকীর কৈশোরের প্রথম বন্ধু। বাবা ছিল ত্বকীর আদর্শ। তার জন্য বাবা ছিলো নির্ভরতার অভয় আশ্রয়। ত্বকীর সাথে সেই সময়ের বিশেষ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকে যখনই কাজের কারণে রাতে ফিরতে দেরি হতো, বাসায় জানিয়ে দিতাম আমার অপেক্ষা না করে খেয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু সবাই খেয়ে নিলেও ত্বকী সবসময়ই আমার জন্য অপেক্ষা করতো। ত্বকীর শৈশবের বন্ধু ছিলাম আমি। কৈশোরকালে ত্বকীর অনেক কৌতুহল ও ইচ্ছার কথা সে অকপটেই আমাকে বলে দিতো।

বাবা দিবসে পাওয়া প্রথম উপহারের কথা বলতে গিয়ে বলেন, যখন ত্বী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে তখন প্রথমবার বাবা দিবসে ত্বকী আমাকে নিজ হাতে বানিয়ে একটি দেয়। এরপর থেকে প্রতি বছরই আমাকে কার্ডসহ বিভিন্ন উপহার দিতো। এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো।

ত্বকীর ছোটবেলা থেকেই দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি একটা অদ্ভুত টান ছিলো। ত্বকীর সম্পর্কে বলেন, এ লেভেল পরীক্ষায় পদার্থ বিজ্ঞানে বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর ও রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সাফল্য অর্জন করে। পদার্থ বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করার প্রবল আগ্রহ ছিল ওর। এ লেভেল শেষে দেশের বাহিরে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠানোর ইচ্ছা ছিলো আমাদের। কিন্তু ত্বকীর এ বিষয়ে ভিন্ন মতামত ছিল। ত্বকী দেশের প্রতি অন্যরকম মায়া ছিলো। ত্বকী বলতো, কেন বাবা বাংলাদেশে থেকে কি পড়াশোনা হবে না। এদেশের পড়াশোনার মান কি এতই খারাপ! ত্বকীকে বলতাম দেশের পড়াশোনা খারাপ না। তবে বাইরের দেশে তোমার জ্ঞানের পরিধি আরো বাড়বে। কিন্তু দেশের প্রতি মায়া, পরিবারের মায়ার কারণে ত্বকীর দেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না।

তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী পড়াশোনা ছিল মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও আগ্রহী ছিলো। ২০১৩ সালের ৭ মার্চ তার এ লেভেলের ফলাফল প্রকাশ হয়। আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করে ত্বকী। রেজাল্ট প্রকাশের একদিন পূর্বে ৬ মার্চ ত্বকী নিখোঁজ হয়। ত্বকীর নিখোঁজ হওয়ার কথা বলতে গিয়ে বলেন, সেদিন বিকালে সুধীজন পাঠাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আমি বিকাল ৫টায় চলে যাই ঢাকায়। সন্ধ্যায় আমি ত্বকীর মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি, ত্বকী কি বাসায় ফিরেছে কিনা?। ত্বকীর মা সে সময় বাসায় ফেরেনি। পরে ৭টার দিকে ত্বকীর মা বাসায় ফিরে এসে ফোনে জানালো ত্বকী বাসায় আসেনি। ত্বকী বাসায় না জানিয়ে কোথাও যাওয়ার মতো ছেলে ছিল না। রাত ৯ টায় বাড়ি ফিরেও যখন দেখি ত্বকী ফিরে আসেনি। তখন আমি সদর থানায় সাধারণ ডায়েরী করে র‌্যাব অফিসে একটি চিঠি দেই। এরপর দিন খোঁজাখুঁজি চলতে থাকে। আসলে আমি এটা ভাবতেও পারিনি ত্বকীকে হত্যা করা হবে।

৮ মার্চ সকাল সাড়ে ৯টায় আমার বাসায় পুলিশ সুপার আসে। এ সময় সদর থানার ওসি আমাকে ফোনে জানতে চায় ত্বকীর পড়নে কি ছিলো? তিনি বলেন, আমরা একটা লাশ পেয়েছি। লাশটা শনাক্ত করতে পারছি না। তারপর পুলিশসহ আমরা সেই স্থানে যাই, সেখানে গিয়ে পাই ত্বকীর পড়নের সেই জামা, ত্বকীর জুতো। এরপর আর ত্বকীর বাবা আর কিছু বলতে পারেনি।

ত্বকী হত্যার পর জেলা পেরিয়ে দেশ ও দেশের বাইরেও এই হত্যার প্রতিবাদ করেছে জাগ্রত জনতা। কবি শিল্পীসহ অনেকেই বিভিন্নভাবে এই হত্যার প্রতিবাদ করেছে। এবং এখনো প্রতিবাদ চলছে। ত্বকীর মৃত্যু পরবর্তী ৮৭ মাস যাবৎ সন্তানের হত্যার বিচারের দাবির সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ত্বকীর হত্যার পর ৮৭ মাস চলছে বিরতীহীনভাবে বিচারের দাবিতে প্রতিমাসে কর্মসূচি চলছে। বাংলাদেশে কোন হত্যাকাণ্ডে এইভাবে প্রতিবাদ হয়নি। মানুষের মাঝে বিচারের আকাঙ্খা রয়েছে। এই আকাঙ্খাকে ভুলিয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

বিচারের দাবি ও সত্যের এই লড়াইয়ে অনেক মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন বলে জানান রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, আমি নিজেসহ যারা এই লড়াইয়ে আছেন তাদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে। আমাদেরকে দমানোর জন্য মামলাসহ অনেককেই আহত করা হয়েছে। ত্বকী হত্যার বিচারপ্রার্থীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে মামলা দিয়ে নির্যাতন করেছে। নাসিম ওসমান আমাদের পিঁপড়ের মতো পায়ে পিষে মারার হুমকি দিয়েছে, শীতলক্ষ্যায় লাশ মাছ দিয়ে খাওয়ানোর কথাও বলেছে। আর আমাদের প্রতিবাদ শুধু ত্বকী হত্যার দাবিতে নয়, জেলার জুড়ে সকল নির্যাতন ও হত্যার দাবিতে এই প্রতিবাদ।

ত্বকীর হত্যার বিচারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ত্বকী হত্যার সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন এবং অভিযোগপত্র আদালতে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ এপ্রিল ২০১৪ সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান মৃত্যুবরণ করলে জাতীয় সংসদে আনিত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানান। এরপর থেকে কার্যত ত্বকী হত্যার তদন্ত কার্যক্রম থেমে যায়। এরপর থেকে সংগ্রাম চলছে, প্রতিবাদ চলছে কিন্তু বিচারের কোন অগ্রগতি নেই। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের শক্তিশালী স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থার উপর থেকে মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গাটি দিনে দিনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এখন শাসনের এই পরিস্থিতিতে ও বিচারহীনতা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই। সরকারের কাছে এই হত্যার বিচারের নির্দেশ প্রদানের জন্য আহ্বান জানাই। আর নয়তো আমাদের এই প্রতিবাদ জারি থাকবে। সংগ্রাম চলবে। বিচারের অপেক্ষায় আছি, দেখি আর কতদিন করতে হয় এই অপেক্ষা!

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: