আমি আপনাদেরই একজন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই। দেশবাসীকে ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সরকার প্রধান।

সরকারের বর্ষপূর্তিতে মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলে হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতিবাজদের আবারও সতর্ক করে তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। মানুষের কল্যাণের জন্য আমি যেকোনও পদক্ষেপ করতে দ্বিধা করবো না।
এ সময় তিনি গত বছর সরকার গঠনের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শোধরানোর আহ্বান জানানোর বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন।
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান। শ্রদ্ধা জানান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি। শ্রদ্ধা জানান ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের অন্যান্য শহীদসহ পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিবর্গের প্রতি। স্মরণ করেন ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের অগ্নিসন্ত্রাস এবং পেট্রোলবোমা হামলায় নিহতদের।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়ে এ সময় সরকারপ্রধান আরও বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। সাধারণ মানুষের ‘হক’ যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করছি। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্নীতির নির্মূল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধে জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি। মানুষ সচেতন হলে, দুর্নীতি আপনা-আপনি কমে যাবে।
এ সময় তিনি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকার কথাও জানান। তিনি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি থাকবে না। সকল ধর্ম-বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন।
আওয়ামী লীগ আইনের শাসনে বিশ্বাসী দল উল্লেখ করে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের রায়ই হচ্ছে ক্ষমতার পালাবদলের একমাত্র উপায়। যেকোনও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে, অযৌক্তিক দাবিতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে আমরা বরদাশত করবো না। বাংলাদেশের মাটিতে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, পাকিস্তানের ২৪ বছরের শোষণ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পোড়ামাটি নীতির ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত অকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে উঠে এসেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের অগ্রগতি থেমে যায়।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলোর জনবিচ্ছিন্নতা, লুটপাট ও দর্শনবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ভিক্ষুক-দরিদ্র-হাড্ডিসার মানুষের দেশ হিসেবে। আমরা ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আমরা দারিদ্র্য বিমোচনে বেশকিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করি। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি—যেমন আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মতো কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কৃষক ও কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের ফলে দেশ দ্রুত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন খাতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা গ্রহণ করি যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।
বিএনপি-জামায়াতের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত আবার ক্ষমতায় আসে। ‘হাওয়া ভবন’ খুলে অবাধে চলতে থাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট। তারই পরিণতি ২০০৭ সালের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যে সরকার বিনা কারণে আমাকে প্রায় এক বছর কারাবন্দি রাখে।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সেক্টরভিত্তিক সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত বছর মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ শতাংশের নিচে। বছরের শেষদিকে আমদানিনির্ভর পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি ব্যতীত অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক ছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটখাটো অভিঘাত এই অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান