একাত্তরের সম্মুখসেনানী, লড়ছেন আজও

বিশেষ প্রতিনিধি: সাল একাত্তর। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করেন বুকভরা দেশপ্রেম আর সাহস সঙ্গে নিয়ে। সময়ের পরিক্রমায় রণাঙ্গনের সেই যুদ্ধ একসময় শেষ হয়। কিন্তু সব ‘লড়াই’ শেষ হয়নি তখনও। সামনে এবার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার নতুন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেও পিছু হটেননি তিনি। যে লড়াই লড়ছেন তিনি আজও।

বলছি মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কথা। চট্টগ্রামের কৃতী এই মানুষটির জন্মদিন আজ। ১৯৪৩ সালের এই দিনে মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ সালে স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে তিনি পাশ করেন এইচএসসি। ১৯৬৬ সালে লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন তিনি।

তাঁর বাবা এস রহমান ১৯৬০ সালের দিকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন। এস রহমান ১৯৪৪ সালে কলকাতায় তাঁর ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি চট্টগ্রাম চলে আসেন। চট্টগ্রামে তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ নামে একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কক্সবাজারে ‘হোটেল সায়মন’ প্রতিষ্ঠা করেন। মোশাররফ হোসেনের পিতামহ ফজলুর রহমান দীর্ঘ ২০ বছর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন লাহোরে পড়াশোনার সময় ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন সময় মিছিল-সমাবেশে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। এসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার যৌক্তিকতা তুলে ধরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন। লাহোর থেকে দেশে ফিরে তিনি এম এ আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। ১৯৭০ সালে তিনি সর্বপ্রথম তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮,২০১৪ এবং ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপের এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতিতে আসার পর তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ এবং ২০১২ সালে সভাপতি এবং একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে মোশাররফ হোসেন সেক্টর-১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। চট্টগ্রামে কালোরাত্রির নৃশংসতা ঠেকাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে সাহসী বীর বাঙালি যোদ্ধারা শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লা থেকে আসা সেনাদলের পথ বন্ধ করে দেন এবং চট্টগ্রাম শহর ও ক্যান্টনমেন্টের প্রধান প্রধান এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেন। পরবর্তীতে তিনি সিইনসি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আয়েশা সুলতানার সঙ্গে সংসার করছেন। তাঁর তিন ছেলে এবং একজন মেয়ে রয়েছে।

নিউজনাউ/এমএইচ

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান