মহামানবের প্রত্যাবর্তন: বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা

মোহাম্মদ বেলাল হোসেন:

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু সেদিন আমরা পায়নি স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ। বাঙালি জাতি শঙ্কা ও উৎকণ্ঠায় ছিল কখন আসবে পিতা, বাঙালির মহাকালের মহামানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিশ্বের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতাকে সাড়ে নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার ঘরে বন্দি রাখা হয়েছিল। লায়ালপুর (বর্তমানে ফয়সালাবাদ) জেলের অপরিসর একটি কুঠুরি ছিল সেই বন্দির বাসস্থান। তাঁর জগত বলতে সেখানে ছিল চার দেওয়াল, একটি জানালা ও একটি উঁচু বিছানা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর তাঁকে সরিয়ে নেয়া হয় কারাগার থেকে দূরে আরও দুর্গম জায়গায়। ২৪ ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুকে রাওয়ালপিন্ডির অদূরে শিহালা পুলিশ একাডেমীতে নিয়ে যাওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি শাসক।

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও বন্দি অবস্থায় করাচী নিয়ে যাবার প্রসঙ্গে গবেষক এসএ করিম উল্লেখ করেছেন- ‘করাচী পৌঁছানোর পর বঙ্গবন্ধুকে লায়ালপুর বর্তমানে পাঞ্জাবের ফয়সালাবাদ কারাগারে নেওয়া হয়। তাঁকে একটি অতি ক্ষুদ্র সেলে রাখা হয়- যেখান থেকে লোহার শিক দ্বারা বেষ্টিত ছোট্ট ফাঁকা জায়গা থেকে এই বিশ্বজগৎ প্রায় আবছা। প্রচণ্ড গরম অথচ কোনো বৈদ্যুতিক পাখা ছিলো না- পরবর্তী সময়ে একটি পুরোনো বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হলো- যা মূলত ঘরের গরমকে আরও ছড়িয়ে দেবার জন্যই। এছাড়াও আরও নানা রকমের অত্যাচার ছিল সেখানে। বঙ্গবন্ধু এসব তোয়াক্কা করেননি, তবে বেদনাবোধ করেছেন বাংলাদেশের জন্য- যে বাংলাদেশটি তখন জন্ম নেবার জন্যে লড়ছে।’

এই যন্ত্রণাদায়ক বন্দিজীবন থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছান। লন্ডন থেকে ৯ জানুয়ারি রাতে রওনা হয়ে ১০ জানুয়ারি দুপুরে দিল্লিতে উপস্থিত হন বিকাল চারটায় দেশে ফেরার ঠিক আগে। দিল্লি বিমানবন্দরে স্বাধীন বাংলাদেশের এই মহানায়ককে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বিমানবন্দরে এ উপলক্ষে আয়োজিত অভ্যর্থনা সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী। তিনি সেদিন বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের জনগণের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধী হিন্দিতে দেওয়া তাঁর ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেন- ‘তাঁর শরীরকে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হলেও তাঁর আত্মাকে কেউ বন্দি করে রাখতে পারেনি। তাঁর প্রেরণায় বাংলাদেশের মানুষ সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। তিনি প্রেরণা দিতে এখন ভারতে আমাদের কাছে এসেছেন। এই যুদ্ধের সময় আমরা ভারতের পক্ষ থেকে তাদের জন্য তিনটি কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এক. যে শরণার্থীরা ভারতে আছে তাদের ভরন পোষণের ব্যবস্থা। দুই. আমরা মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করবো ও বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়াবো তিন. শেখ সাহেবকে (শেখ মুজিবুর রহমান) আমরা দ্রুত জেল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবো। আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রেখেছি।’

এরপর বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ ইংরেজিতে শুরু করলে উপস্থিত হাজার হাজার ভারতীয় দর্শক একসঙ্গে সমস্বরে চিৎকার করে তাকে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করতে থাকেন। তাদের দাবির মুখে খানিকটা বিব্রত হয়ে পাশে দাঁড়ানো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দিকে তাকালে তিনিও স্মিত হেসে বলেন, ‘দে নিড বেঙ্গলি’। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাংলায় বক্তৃতা করার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধু তাঁর দরাজ কণ্ঠে বাংলায় বক্তৃতা শুরু করেন। ‘ভাই ও বোনেরা’ বলতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ভারতের অভ্যর্থনা সভার জনস্রোত। এই ভাষণে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান ভারতের সকল সহায়তার জন্য।একইদিন ঢাকার ভাষণেও তা পুনরায় উচ্চারিত হয়।

দিল্লিতে তিনি বলেন- ‘আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য ও সহানুভূতি আমার দুখী মানুষকে দেখিয়েছে চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না। ব্যক্তিগতভাবে আপনারা জানেন, আমি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার সেলের (কারাকক্ষ) মধ্যে বন্দি ছিলাম কিছুদিন আগেও। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমার জন্য দুনিয়ার এমন জায়গা নাই যেখানে তিনি চেষ্টা করেন নাই আমাকে রক্ষা করার জন্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার কাছে এবং তার সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার জনসাধারণ ভারতবর্ষের জনসাধারণের কাছে কৃতজ্ঞ।আমি বিশ্বাস করি সেক্যুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি সোশ্যালিজমে। যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আপনার আদর্শে এত মিল কেন? আমি বলি, এটা আদর্শের মিল, এটা নীতির মিল, এটা মনুষ্যত্বের মিল, এটা বিশ্ব শান্তির মিল।

বঙ্গবন্ধু এই ভাষণে তাঁর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। পরে যা বাংলাদেশের সংবিধানেও সংযুক্ত করা হয়। তার মধ্যে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতেও যুক্ত হয় সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতি।উপরন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তিও করেন তিনি।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে ঢাকার মাটি স্পর্শ করার পর উপস্থিত জনতার ঢল দেখে নিজের অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে জাতিকে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দেন, ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি জানান-‘আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না।’ কিন্তু জানিয়েছেন- ‘আজ আমি যখন এখানে নামছি আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষ কে আমি এত ভালোবাসি, যে জাত কে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’

তিনি এই ঐতিহাসিক ভাষণে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে মুক্ত মানুষের দিকে চেয়ে বলেন, ‘আমি আজ বাংলার মানুষ কে দেখলাম, বাংলার মাটি কে দেখলাম, বাংলার আকাশ কে দেখলাম বাংলার আবহাওয়া কে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।

আমি আশা করি দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন আমার রাস্তা নাই আমার ঘাট নাই আমার খাবার নাই আমার জনগণ গৃহহারা সর্বহারা,আমার মানুষ পথের ভিখারি। তোমরা আমার মানুষ কে সাহায্য করো মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র এর কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও দিতে হবে, উপায় নাই দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- “সাত কোটি বাঙ্গালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নাই।” কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।

এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে মুক্ত স্বদেশে স্বপ্ন যাত্রার কথা শুনিয়ে দিলেন, তিনি জানিয়ে দিলেন দালালদের বিচার করার কথা, তিনি সরকারি কর্মচারীদের সাবধান করে দিলেন, ঘুষ গ্রহণের বিরুদ্ধে বললেন, তিনি আমেরিকার জনসাধারণকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বারবার স্মরণ করলেন ১ কোটি উদ্বাস্তু মানুষকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার কথা।রক্ত আর যন্ত্রণার সিঁড়ি বেয়ে যে স্বাধীনতা এসেছে তা যে ষড়যন্ত্র মুক্ত নয় তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।অন্যদিকে নিজের আত্মপরিচয়, দেশপ্রেম আর নিজের বাঙালিত্বকে দেশবাসীর কাছে পুনরায় স্পষ্ট করলেন পাকিস্তানের কারাগারের স্মৃতিচারণ করার সময়-‘আমায় আপনারা পেয়েছেন আমি আসছি। জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলো। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে ২ বার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো আমার বাঙালি জাত কে অপমান করে যাবো না তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না। এবং যাবার সময় বলে যাবো জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙ্গালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর এদেশের স্বাধীনতা অপহৃত হয়,দেশ চলে যায় পাকিস্তানবাদী প্রেতাত্মাদের কাছে। ২১ বছর ধরে মিথ্যা ইতিহাসের কল্পকাহিনীর প্রচার চলে বাংলাদেশে।১৯৮১ সালের ১৭ মে এক অন্ধকার বাংলাদেশে আলোকবর্তিকা হয়ে প্রবেশ করেন বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা। শত প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে স্বপ্নযাত্রার মহা সোপানে পরিচালিত করছেন তিনি।

পাকিস্তানের মানুষ তাঁদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানায়,” আমরা বাংলাদেশের মত হতে চায়”। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীক্ষণে এটাই জাতির পিতার স্বপ্নের বড় প্রাপ্তি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এর মধ্য দিয়ে যে
স্বপ্নের বাংলাদেশের সূচনা হয়, তাঁর সুযোগ্য কন্যা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তা আজ পূর্ণতা পেয়েছে। বিশ্বে দরবারে সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিনন্দিত বাংলাদেশ।এই মাহেন্দ্রক্ষণে  মহাকালের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম ও বিনয়াবনত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

লেখক : ইতিহাস বিষয়ক গবেষণাকর্মী
historybelal30@gmail.com

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান