লাগামহীন নির্মাণ উপকরণের দাম, স্থবির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড

নতুন রেট-শিডিউল তৈরির দাবি সরকারি ঠিকাদারদের

নিউজনাউ ডেস্ক: নির্মাণ উপকরণের দাম না কমায় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের অবকাঠামোখাত। গত কয়েক মাস ধরে নির্মাণ সামগ্রীর প্রধান উপকরণ রড ও সিমেন্টের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। আর এ জন্যই সরকারি বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এসব নির্মাণকাজে নিয়োজিত বিভিন্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বর্তমান বাজারদরের সাথে সরকারি রেট-শিডিউল সমন্বয় করে নতুন রেট-শিডিউল তৈরির দাবি জানিয়েছে। ঠিকাদারদের এই দাবি না মানলে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ করারও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলছে, একটি ইউনিফাইড রেট অব শিডিউল প্রস্তুতের কাজ চলছে। রেট শিডিউলে দ্রব্যমূল্য ও উপকরণের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হবে।

বিভিন্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও বাজার থেকে জানা গেছে, এক বছর আগে বাজারে প্রতি টন ৭৫ গ্রেডের রডের দাম ছিল ৫০-৫২ হাজার টাকা। যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮২ হাজার টাকায়। সেই হিসেবে এক বছরে রডের দাম বেড়েছে টনে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। এক বছর আগে প্রতি টন আমদানি পাথর বিক্রি হতো ৩২০০-৩৩০০ টাকায়। টনপ্রতি ১২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এখন প্রতি টন পাথর বিক্রি হচ্ছে ৪৩০০-৪৫০০ টাকা।

বর্তমানে প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪২০ টাকা। যা আগে ছিল ৩৬০-৩৮০ টাকার মধ্যে। আগে প্রতি হাজার ইটের মূল্য ছিল ৫০০০-৬০০০ টাকা। যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৯০০০-১০০০০ টাকায়। আগে ১৫০ কেজির প্রতি ড্রাম বিটুমিন বিক্রি হতো ৬৩০০ টাকায়। যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫০০-১০০০০ টাকায়।

একই সাথে বেড়েছে নির্মাণ শ্রমিকের মজুরিও। আগে একজন নির্মাণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৫০০ টাকা। ৩০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রতিটি নির্মাণ শ্রমিকের বেতন দাঁড়িয়েছে ৮০০ টাকা।

এই অবস্থায় নির্মাণ কাজে সরকারি শিডিউলের চেয়ে ৩৫-৪০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সরকারি প্রকল্পগুলোর কাজ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। যার মধ্যে নির্মাণ প্রকল্পই ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার।

নির্মাণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্প চলমান। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ১৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এবং রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) সূত্রে জানা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে সড়ক নির্মাণে বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৩২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কাজ করছে।

এর মধ্যে আব্দুল মোনেম লিমিটেড, স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, মনিকো লিমিটেড, কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড, মীর আখতার হোসেন লিমিটেড, তমা কনস্ট্রাকশন এবং হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেডসহ শীর্ষ ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব নির্মাণের কাজ করছেন।

এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ১৯ হাজার কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্প চলমান। গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, স্থাপত্য অধিদপ্তর এবং হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলছে।

বাংলাদেশ গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির প্রায় ১০০০ সদস্য এসব নির্মাণকাজে ঠিকাদারি করছে।

এদিকে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকল্প ব্যয় না বাড়ালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের চলমান কাজ বন্ধের হুমকি দিয়েছে সেখানকার আড়াই হাজার ঠিকাদার। গত ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এই হুমকি দেয়।

চট্টগ্রামে এলজিইডি, শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে।

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান