ভরা মৌসুমেও উত্তরে চালের বাজারে অস্থিরতা

রংপুর ব্যুরো: উত্তরে চালের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ধানের এলকায় কৃষকের ঘরেই পড়ছে ভাতের টান। আমনের ভরা মৌসুমে আমনের কাটামাড়াই শুরু হলেও বাজারে বেড়েছে চালের দাম। মান ও প্রকারভেদে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

রোপা আমন ধান ঘরে ওঠার আগে সাধারণ মানুষের দু:সময়ে চালের দামের লাগাম টানতে বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন সাধারন মানুষ।

খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হাতে গোনা কয়েকটি রাইস মিল মালিক ও মজুদদারদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণের কারণে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এজন্য উত্তরবঙ্গের রাইস মিল মালিক ও চালের করপোরেট কোম্পানিগুলোকে দায়ি করছেন তারা।

কৃষিবিদদের মতে, দেশের কৃষিভিক্তিক অর্থনীতিতে উত্তরাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রতিটি ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফসল ওঠার শুরুতেই এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী গ্রাম-গঞ্জের হাট বাজারে নেমে পড়ে। তারা ঘাম ঝড়ানো ফসল কৃষকদের কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করে। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। অনেক ক্ষেত্রে এরা কৃষককে আগাম টাকা ঋণ দেয়। ঋণ পরিশোধে কৃষক বাধ্য হয় কম দামে ফসল বিক্রি করতে।

প্রতি মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৬০০ আটো রাইসমিল মালিক ধানের মজুদ গড়ে তোলার লক্ষে দালাল ফরিয়া নিযোগ করে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে বাজার নিয়ন্ত্রন করে। এছাড়াও মজুদদার ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ধানের মৌসুমে কোমড় বেধে মাঠে নামে। পরে মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মত বাজার নিয়ন্ত্রন করে।

রংপুর সিটি বাজারসহ বিভিন্ন চাল বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকদিন আগেও মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছিল ৫২ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকায়। নাজিরশাইল চালের দামও কেজিতে পাঁচ থেকে সাত টাকা বেড়ে ৬৪ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় আমদানি করা নূরজাহান চালের বস্তা (৫০ কেজি) বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায়। তাতে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা।

নগরীর মাহিগঞ্জ এলাকার চালের আড়তদার চৌধুরী ট্রেডার্স’র পরিচালক মিলন শিকদার জানান, গত সপ্তাহে মিনিকেট চালের (৫০ কেজি) বস্তা ছিল তিন হাজার টাকা, যার বর্তমান বাজার মূল্য তিন হাজার ২০০ টাকা, ব্রিধান-২৮ (৮৪ কেজি) বস্তা ছিল তিন হাজার ৩০০ টাকা, বর্তমান বাজার মূল্য তিন হাজার ৫০০ টাকা, ব্রিধান-৪৯ চালেল বস্তা (৮৪ কেজি) তিন হাজার ৬০০ টাকার স্থলে হয়েছে তিন হাজার ৭৫০ থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকা, পাইজাম (৫০ কেজি) দুই হাজার ৩০০ টাকার স্থলে প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, মোটা চালের মধ্যে গুটি স্বর্ণা (৮৪ কেজি) বস্তা ছিল তিন হাজার ৪০০ টাকা, যা বর্তমান বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৬০০ টাকা। চালের এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কারসাজি রয়েছে বলে মনে করছেন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ছোট ছোট হাসকিং মিলগুলো এখন আর চলে না। বড় অটো রাইস মিল মালিকরা কমদামে ধান কিনে মজুদ করে নানা অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

মিল চাতাল মালিক, চাল ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৬০০ অটোরাইস মিল মালিক নিজেদের ইচ্ছেমত মজুদের পাহাড় গড়ে তুলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। অটোরাইস মিলগুলো লাখ লাখ মণ ধানের মজুদ করে নিজেদের ইচ্ছেমত চালের দাম নির্ধারণ করছে। আশঙ্কা প্রকাশ করে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অঞ্চলে রোপা আমন ধানের চারা লাগানোর পর শ্রমজীবি মানুষের হাতে কাজ থাকেনা। ধানের কাটামাড়াই শুরু না হওয়া পর্যন্ত আশ্বিন-কার্তিক মাসে তাদের সংসারে চলে টানাপোড়েন। তার ওপর চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। রংপুরের মাহিগঞ্জসহ দিনাজপুরের পুলহাট, বগুড়া, নওগাঁ ও রাজশাহী থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।

বৈরি আবহাওয়ার অজুহাতে এসব মোকামে কয়েকদিন থেকে অটোরাইস মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার এখনই যদি এই অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় তা হলে এই সিন্ডিকেটটি চালের বাজার অস্থিতিশিল করে তুলবে।

রংপুরের আবু পাটোয়ারী, মহিদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন আড়তদার জানান, তারা বিভিন্ন মোকাম ঘুরেও অটোরাইস মিলগুলোর কারণে চাল সংগ্রহ করতে পারেননি। অটোরাইস মিলের মালিকরা বাজার থেকে এক তরফাভাবে ধান সংগ্রহ করে নিজেদের ইচ্ছেমত চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা জানান, পুরো উত্তরাঞ্চলের হাতে গোনা ৫০০ থেকে ৬০০ জন বড় ব্যবসায়ী ও অটোরাইস মিল মালিক সারা দেশের চালের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তারা তাদের মিল চাতাল বন্ধ করে দিয়েছেন।

ক্ষুদ্র চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলগেটে চালের দাম বাড়ানোসহ আগের তুলনায় এখন কম সরবরাহ করছেন চালকল মালিকরা। ফলে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অন্যদিকে মিল মালিক ও আড়তদাররা বলছেন, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ এবারে কিছুটা গতি পাওয়ায় কৃষক পর্যায়েই ধানের দাম বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ধানের দাম বেড়েছে মণপ্রতি সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বড় মোকাম ও মিল পর্যায়ে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এখন এরই প্রভাব পড়েছে খুচরা ও পাইকারি বাজারে।

রংপুর চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম চালের দাম বৃদ্ধির জন্য সরাসরি অটোরাইস মিলগুলোকে দায়ি করে বলেন, অটো রাইসমিল মালিকরা আগে থেকে ধানের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে অটোরাইস মিলগুলোর সাথে পাল্লা দিতে না পেরে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছে। অটোরাইস মিলগুলো মজুদের পাশাপাশি বৈরি আবহাওয়াকে ঘিরে সব ধরণের চালের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে।#২০.১১.২০২১

নিউজনাউ/এবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান