ডিজিটাল ছোঁয়ায় গ্রামে আর্থসামাজিক পরিবর্তন

অজিত কুমার সরকার:

প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বছর আগে নিওলিথিক বা কৃষিবিপ্লবে কৃষি গ্রাম ও গ্রামীণ সমাজের উদ্ভব। সেখান থেকে সময়ের পথ-পরিক্রমায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিগতভাবে পরিশীলিত সমাজ বিনির্মাণের দিকে অগ্রসর হয়। একবিংশ শতাব্দীতে শুধু শহরেরই নয়; গ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আর বর্তমানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ডিসকোর্সে গ্রামের মানুষ ও নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তথ্যপ্রযুক্তিকে। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো একটি আধুনিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে শহরের মতো গ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেয় বর্তমান সরকার।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহর ও নগরের বৈষম্য দূর এবং গ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। গ্রামে যদি ভৌত এবং ইলেক্ট্রনিক কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা মানুষের সঙ্গে জ্ঞানের সংযোগ ঘটায়। মানুষ জ্ঞান আহরণ করে নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটায়। এমন ধারণারই যেন বাস্তব রূপ দেওয়া হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন কার্যক্রমে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক যুগ আগে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেন গ্রাম থেকে। অনুসরণ করেন ‘বটম আপ অ্যাপ্রোচ পদ্ধতি’। প্রতিষ্ঠা করেন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। এরই ধারাবাহিকতায় জীবন ও জীবিকার উন্নয়নে ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’, ‘কানেক্টিং বাংলাদেশ’ ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’, ‘হাওর অ্যান্ড বিল’, ‘ডিজিটাল ভিলেজ’ প্রতিষ্ঠার মতো জনমুখী উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভৌত ও ইলেক্ট্রনিক কানেক্টিভিটি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে গ্রামে।

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে তিনটি বিষয় জড়িত- তথ্যপ্রযুক্তিতে মানুষের অভিগম্যতা, অভিযোজন ও সক্ষমতা। এটা বোঝার জন্য দুটি উদাহরণ তুলে ধরছি। বাংলাদেশের মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা ও অভিযোজন নিয়ে ‘পারটিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ওনারশিপ উইথ টেকনোলজি, ইনফরমেশন অ্যান্ড চেঞ্জ (পিআরওটিআইসি)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় চার বছর ধরে গ্রাম এলাকায় গবেষণা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. ল্যারি স্টিলম্যান। তিনি বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষ যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে; বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও সেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে। আশ্চর্যের বিষয়, লেখাপড়া জানে না এমন নারীরাও টিপে টিপে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।’ ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘হাউ মোবাইল ফোন চেঞ্জিং দ্য লাইভস অব ওমেন’ শীর্ষক নিবন্ধে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হওয়া একজন নারীর উদ্ধৃতি তিনি তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘আমি খুদে বার্তার মাধ্যমে সব তথ্য পাই। আমি শুধু ধান ফলাই না; লাউ, কুমড়া, সবজি ফলাই। আমাদের কল সেন্টার আছে; ফেসবুক, অ্যাপ আছে, যার মাধ্যমে সাহায্য চাইতে পারি।’

শুধু স্টিলম্যান নয়; বিশ্বব্যাংকের ‘এন্ড প্রভার্টি ইন সাউথ এশিয়া’ গ্রন্থে ‘ডিজিটাল টেকনোলজি এনশিউরস ফুড সাপ্লাই ইন রুরাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও উত্তরবঙ্গের কৃষি সমবায়ের সদস্য সালমা আক্তারের কভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর চার মাসে ভার্চুয়াল কল সেন্টারের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন টাকার পণ্য ক্রয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩৪ দশমিক ৪ মিলয়ন টাকার পণ্য বিক্রির সাফল্যের কথা ছাপা হয়। এ দুটি সাফল্যের গল্প শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে গ্রামের মানুষের তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতা, অভিযোজন ও সক্ষমতার উজ্জ্বলতম উদাহরণই নয়; তাদের জীবন ও জীবিকার যে উন্নয়ন ঘটছে, তাও সবাইকে জানান দিচ্ছে।

সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত আট হাজার ডিজিটাল সেন্টার গ্রামের মানুষের সেবা প্রদানের মাধ্যমে সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এসব ডিজিটাল সেন্টার থেকে এক দশকে ৬০ কোটি মানুষ সেবা গ্রহণ করে। কতটা সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হয়, তার একটা হিসাব পাওয়া যায় এটুআইর প্রতিবেদন থেকে। এতে বলা হয়, বিগত এক দশকে নাগরিকদের সময় সাশ্রয় হয় ১ দশমিক ৯২ মিলিয়ন দিন। খরচ বাঁচে ৮ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং যাতায়াত হ্রাস পায় ১ মিলিয়ন বার। আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি গ্রাম এলাকায় আর্থসামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনছে। এক দশক আগে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং এই ব্যবধান কমিয়ে আনায় বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন ৬৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।

গ্রামেও চালু হয়েছে ই-কমার্স। দেশের গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার পণ্য উৎপাদনকারীরা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘একশপ’-এর মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পণ্য কেনাবেচা করছে। আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ দেশীয় ই-কমার্সের বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যাওয়ার যে আভাস দেওয়া হচ্ছে, তাতে গ্রাম এলাকার ই-কমার্স ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ই-কমার্সের সম্প্রসারণ ও ফেসবুক পেজ চালানোর জন্য গ্রামের মানুষ বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তা একদিকে যেমন গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি করবে, তেমনি চাঙ্গা করবে গ্রামীণ অর্থনীতি।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বে যে উন্নয়নের বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, তাতে সমানভাবে অবদান রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতি। গ্রামীণ অর্থনীতি ভালো থাকলে শহরের অর্থনীতি ভালো থাকে। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর হয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকীকরণ ব্যবস্থা, শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে তার গ্রাম উন্নয়নের দর্শনকে সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে অঙ্গীকার আকারে যুক্ত করেছিলেন। তখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এতটা বিকশিত ছিল না। তবে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং শহর ও গ্রামের পার্থক্য দূর করার উদ্যোগ নিয়েছেলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন করছেন। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন শুরু করে শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে চলেছেন। ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে গ্রামের মানুষের আর্থসামজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছে। যার পরামর্শ, নির্দেশনা ও তদারকিতে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সাফল্যের পথ বেয়ে এই পরিবর্তন ঘটছে, তিনি তারই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা এবং খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়।

সূত্র: সমকাল

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক সিটি এডিটর

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান