মমতাময়ী মা শেখ হাসিনা

মোহাম্মদ বেলাল হোসেন

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া। গণতন্ত্রের মানস কন্যা, জননেত্রী, দেশরত্ন, ভাষাকন্যা, শান্তিদূত, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় তাঁকে। পুরনো দিনের মানুষেরা একান্ত আপন ভেবে নিজের মত করে ডাকেন ‘শেখের বেটি’। এর অন্যতম কারণ পিতার গুনালোকে তিনি আলোকিত। বাঙালির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে আত্মার সম্পর্ক, শেখ হাসিনার সঙ্গেও বাঙালি একই সম্পর্ক অনুভব করে।

নেতাজী সুভাষ বসু বলেছেন, ‘আদর্শ ষোল আনা পাইতে হলে নিজের ষোল আনা দেওয়া চাই’। শেখ হাসিনা বাংলার মানুষের জন্য ষোল আনা উজাড় করে দিয়েছেন মমতাময়ী মায়ের মত।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘সব বিকল্পের বিকল্প আছে, শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই’। এটি বলার কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যথার্থভাবে। যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে বিদ্রুপ করা হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ বহুমাত্রিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পেছনে চালকের আসনে আছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। এখন শেখ হাসিনা একটি নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান।

কর্মবহুল বৈচিত্র্যে ভরপুর শেখ হাসিনার জীবন। ‘হাসিনা এ ডটারস টেল’ ডকুড্রামাটি যারা দেখেছেন তারা হয়তো বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহেনার একটি সংলাপ লক্ষ্য করেছেন। তিনি যথার্থ বলেছেন, ‘মাকে যদি বলতে পারতাম তোমার হাসু আর আলসে ঘরের মেয়ে নেই, যে মেয়েটা নাকি গল্পের বই পড়ে, গান শুনে দিন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই মেয়েটিই এখন বাঙালি জাতির পরিত্রাণ কর্তা, বিকল্পহীন অবলম্বন’।
শেখ হাসিনা অসাধারণ মানুষ হয়ে সাধারণ জীবনযাপনের পাঠ নিয়েছেন রাজনীতিবিদ পিতার কাছ থেকে। রক্তের উত্তরাধিকার সূত্রেই মনোজগতের ভাবনায় ছিল বাঙলা ও বাঙালির অধিকার শোষণ মুক্তির কথা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে  নির্মমভাবে হত্যা করার পর ছয় বছর নির্বাসিত জীবনযাপন
করেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জয়লাভ করে
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। অনেকেই কল্পনা করেননি এদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে। শেখ হাসিনা সেই কল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেন।

এই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।

শেখ হাসিনার চলার পথ কখনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সামরিক ও স্বৈরশাসকরা তাঁকে ঘরে-বাইরে অন্তরীণ করেছেন বারে বারে। জীবন মৃত্যুর নিত্য লড়াইয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন অবিরত। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাঁকে দু’বার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দি হন। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় ১ বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন।

শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টাও হয়েছে বারে বারে। তবুও শত বাধা-বিপত্তি এবং নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা একজন মায়ের মত সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁর অপরিসীম আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

আমরা কোথায় ছিলাম, শেখ হাসিনা আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছেন। মূল্যায়নের সময় এসেছে আজ। যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন গড় আয়ু ছিল ৩৬। বর্তমানে গড় আয়ু ৭২.৮ বছর। যখন স্বাধীন হয় তখন মাথাপিছু আয় ছিল কয়েক শ ডলার, এখন তা দাঁড়িয়েছে ২২২৭ ডলারে। এখন প্রাথমিক স্কুলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৯৩% এর কাছাকাছি। প্রসূতি মৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে বাংলাদেশে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নারীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ প্রথম। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। ছাগ মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম, চামড়া ও আলু উৎপাদনে এদেশ সপ্তম। ১৯৭১ সালে দেশ খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। এখন জমির পরিমাণ ১৯৭১ সাল থেকে কমপক্ষে ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে কিন্তু খাদ্যোৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ।

‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগানে গ্রামে নগরায়নের ছোঁয়া লেগেছে। পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান, মেট্রোরেল আর বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন উন্নয়নের পথে নতুনমাত্রা যুক্ত করেছে। বিশ্বে ৫৭তম দেশ হিসাবে আকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। অনুন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হয়েছি আমরা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ বরাবরের মতো তার প্রথমাবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে।করোনার মতো বৈশ্বিক অতিমারির উল্লম্ফন মোকাবিলা করেও বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫.৪৭%।

জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু গুপ্তঘাতকের নারকীয় তাণ্ডবহেতু তাঁর এদেশে সোনাফলানোর কাজ অসমাপ্ত রয়ে যায়। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিলেন। আজ দেশপ্রেমী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতায় বাংলাদেশের জল ও স্থল সীমা পুনঃনির্ধারিত এবং অধিকতর সুরক্ষিত। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বলবো গত ১২ বছরে শেখ হাসিনা যা করেছেন, গত কয়েক শ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় কোনো নেতা তা করতে পারেননি। তাই শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বনেতার কাতারের একজন এবং অন্যতম।

আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা তাঁর পিতৃপুরুষের জন্মস্থান কেনিয়া সফরে গিয়ে বলেছিলেন, ‘কেনিয়া যেন বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে এই দুই দেশকে অনুসরণ করে।’ এটাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অসাধারণত্ব। প্রতিকূল পরিবেশ, দীর্ঘ কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছেন শেখ হাসিনা। পৃথিবীর সর্বত্র আজ শেখ হাসিনা একটি আলোচিত নাম। তিনি অনেক কারণে বাঙালির জীবনে জরুরি হয়ে আছেন এবং থাকবেন।

বিশ্বসভা থেকে বাংলার গ্রামের প্রান্তিক মানুষের ভালোবাসাও তিনি অর্জন করেছেন। আমরা শুনেছি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার গরিব রিকশাচালক হাসমত আলীর কথা। যিনি শেখ হাসিনার জন্য জমি কেনে রেখে যান। মৃত্যুর আগে হাসমত আলী তাঁর স্ত্রী রমিজা খাতুনকে শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন। ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল সকালে কালেরকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক হায়দার আলীকে জড়িয়ে ধরে রমিজা খাতুন কাঁদলেন। বললেন, ‘মরার আগে কাদিরের বাবা (হাসমত আলী) জমির দলিলডা হাতে দিয়ে আমারে কইছিল, আমি মইরা গেলে আমার এতিম মাইডার কাছে (শেখ হাসিনা) জমির দলিলডা পৌঁছাই দিবি। আমি দলিলডা তাঁর হাতে দিয়ে যেতে পারলে মইরাও শান্তি পামু’। পরবর্তীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় জমিটি শেখ হাসিনা রমিজা খাতুনকে হস্তান্তর করে একতলা বাড়ি বানিয়ে দেন।

২০১০ ঢাকার নিমতলীতে আগুনে ১২৪ জন মারা যায়। মা বাবা হারিয়ে প্রাণে বেঁচে যায় তিন বোন রুনা, রত্না ও আসমা। শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন এই তিনজন আমার মেয়ে। তিনি গণভবনে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিনি পরম মমতায় তাদের অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থা করেন। এভাবে তিলে তিলে জনমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন শেখ হাসিনা।

পাকিস্তানের জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছিলেন পরম আরাধ্য স্বাধীনতা। সেই স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করতে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি আমাদের কাছে স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শব্দব্রহ্ম, লোকায়ত বাংলার ইহজাগতিকতার বীজমন্ত্র। তিনি আমাদের মমতাময়ী মা। ৭৫ এ পা দিলেন মমতাময়ী মা শেখ হাসিনা। এ শুভক্ষণে কবি নজরুলের ভাষায় বলি-
দাও স্বাস্থ্য, দাও আয়ু,
স্বচ্ছ আলো, মুক্ত বায়ু।
দাও চিত্ত অনিরুদ্ধ, দাও শুদ্ধ জ্ঞান।
হে সর্বশক্তিমান।।
মহান স্রষ্টার কাছে এ আমাদের সতত প্রার্থনা।

লেখক : উপসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান