ঝুমন দাসের মুক্তির দাবিতে উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদী সমাবেশ

আহসান রাজীব বুলবুল: সিলেটের সুনামগঞ্জের শাল্লায় সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারকৃত ঝুমন দাস আপনের মুক্তির দাবিতে ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে নিউ ইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইট্‌সের ডাইভারসিটি প্লাজায় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশের আয়োজন করে উদীচী যুক্তরাষ্ট্র শাখা। সাধারণ সম্পাদক জীবন বিশ্বাসের পরিচালনা ও সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য, জাগরণের গান এবং কবিতার পরিবেশনা দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটিকে সাজানো হয়। বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যের মাঝে প্রতিবাদী সঙ্গীত ও কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য অত্যন্ত সফলভাবে উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।

পুরো অনুষ্ঠানের তাদারকি করেন উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানিত সভাপতি ডঃ মোঃ আব্দুল্লাহ । অনুষ্ঠানের শুরুতেই জীবন বিশ্বাস ঝুমন দাসের অকারণ গ্রেফতারের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয় অনুষ্ঠানের সূচী তুলে ধরেন। শুরুতেই উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানিত উপদেষ্টা এবং প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদউল্লাহ তার মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। তিনি বর্তমান সরকারকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের আহ্ববান জানিয়ে ঝুমন দাসের মুক্তি দাবি করেন। ঝুমন দাসকে মুক্তি না দিয়ে কেন তাকে আটক রাখা হয়েছে, তাও তিনি জানতে চান। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি দেশের সাম্প্রদায়িক চক্রকে রুখতে সকল প্রগতীশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং আবারো ঝুমন দাসের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

এর পরেই শৃঙ্খল ভাঙার গান—‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা’ পরিবেশন করে উদীচীর শিল্পীরা।

এর পরে বক্তব্য রাখেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ যোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ নামে যে অসাম্প্রদায়িক দেশের জন্ম হয় সে দেশে কিভাবে সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন হয় – সে প্রশ্ন রাখেন। ঝুমন দাসের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তিনি অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।

শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের বক্তব্যের পরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়” গানটি পরিবেশিত হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সমবেত কণ্ঠে। এর পরপরই বিপ্লব চক্রবর্তী আবৃত্তি করেন নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা উলঙ্গ কিশোর’। এর পরে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হাকিকুল ইসলাম খোকন। তিনিও দ্ব্যর্থ কণ্ঠে ঝুমন দাসের মুক্তি দাবি করেন। এর পর আব্দুল লতিফ রচিত ও সুরারোপিত দেশের গান ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’ পরিবেশিত হয়। এর পর বক্তব্য রাখেন উদীচীর শুভানুধ্যায়ী বিষ্ণুপদ গোপ। তিনি মানবাধিকারে কথা বলে সরকারের কাছে ঝুমন দাসের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।

বিষ্ণুপদ গোপের বক্তব্যের পরে ‘আগুন নিভাইবো কে রে’ গানটি পরিবেশিত হয়। এই গানের পরে বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্কের বিশিষ্ট প্রতিবাদী মুখ মিনহাজ আহমেদ শাম্মু। তিনি বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনগনের শাসন চলে কিনা তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন বঙ্গবন্ধুর চেতনা আমরা উঁচিয়ে রাখতে পারিনি। তিনিও ঝুমন দাসের মুক্তি দাবি করেন। মিনহাজ আহমেদের বক্তব্যের পরে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি পরিবেশিত হয়। এর পরে বক্তব্য রাখেন তোফায়েল আহমেদ, যিনি সুনামগঞ্জের শাল্লারই বাসিন্দা কিন্তু বর্তমানে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বসবাস করছেন এবং তিনি শাল্লা থানার আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন দীর্ঘ ১৮ বছর। তিনি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঝুমন দাসের জামিন না হওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তার মুক্তি দাবী করেন।

এর পরে ‘আমরা করবো জয়’ এবং এর মূল ইংরেজী গান ‘We shall overcome’ গানটির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় ছিলেন নিউইয়র্কের অন্যান্য অনেক সংগঠন কিন্তু অনুষ্ঠানটি সাপ্তাহিক কাজের দিনে হওয়ার কারণে অনেকে অংশগ্রহন করতে পারেন নি। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ফাহিম রেজা নূর এই অনুষ্ঠানে আসতে না পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সাপ্তাহিক ঠিকানার সম্পাদক ফজলুর রহমান এই প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশে শারিরীক অসুস্থতার কারণে না আসতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এর প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে ঝুমন দাসের মুক্তি দাবী করেন। এ ছাড়া ইচ্ছে থাকা সত্বেও উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের উপদেষ্টা ডঃ নুরুন্নবী, হাসান ফেরদৌস, ডাঃ জিয়াউদ্দীন আহমেদ এবং বেলাল বেগ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি কিন্তু তারা এই প্রতিবাদ সভার সংগে সংহতি প্রকাশ করে এর সাফল্য কামনা করেছেন এবং ঝুমন দাসের মুক্তি দাবি করেছেন। উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক পরিচয়ের নাজমুল আহসান, সাংবাদিক সঞ্জীবন সরকার, কাণু দত্ত সহ আরো অনেকে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেছেন উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের একঝাঁক আদর্শবাদী কর্মীর দল; মহাদেব মল্লিক, মুক্তা ধর, ফজলুল করিম, সমীর মণ্ডল, সংগীতা চক্রবর্তী, তৃষা মণ্ডল, শুক্লা চক্রবর্তী, নাজনীন সুলতানা, বেবী মণ্ডল, পরেশ ধর, বিপ্লব চক্রবর্তী, সুকান্ত দাস, প্রমিত মহান আচার্য্য, সুনিল বিশ্বাস, মোহিত আচার্য্য, হেনা রায়, সুক্তি বিশ্বাস, অনামিকা মজুমদার, উদিতা তন্বী, অনিতা মল্লিক, সাবিনা হাই উর্বি, দিব্য রায়, বিশ্বজিৎ কর্মকার, দীপ্ত রায়, শীলা ধর, সীমা রায়, স্মরণিকা চক্রবর্তী, প্রিমা রায়, তুষার রায় সহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠানটির সার্বিক গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও সংগীত পরিচালনায় ছিলেন উদীচী যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ সম্পাদক জীবন বিশ্বাস।

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: