অধ্যাপক ডা. এল.এ. কাদেরীর মৃত্যুতে ছোট ভাইয়ের বিনয় কথন

মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত: আমার বড়ভাই, খ্যাতিমান নিউরোসার্জন অধ্যাপক ডা. এল.এ. কাদেরী গত ২৯ শে আগস্ট, ২০২১ খ্রী: রোববার ইন্তেকাল (ইন্নালিল্লাহি ওয়া নিল্লাহি রাজিউন) করেন। খ্রীস্ট সালের ২৯ শে আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ৫৭০ খ্রীস্টাব্দের ২৯ শে আগস্ট আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মগ্রহণ করেন বলে জানা যায়।

বড়ভাই অধ্যাপক এল.এ. কাদেরী প্রায় দু’বছর ধরে অসুস্থ। আমরা জীবিত দু’ভাই আবুল মোহছেনাত কাদেরী (সেখু) ও আমিও অসুস্থ। দু’ভাই এডভোকেট আবুল হাসনাত কাদেরী ও এডভোকেট নুরুল আনোয়ার কাদেরী আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রীস্টাব্দ তারিখে বড়ভাইয়ের উডল্যান্ডস্থ চেম্বারে জোহরের নামাজের পর প্রায় সোয়া একঘন্টা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। তিন ভাই একত্রে অসুস্থ হওয়া নিয়েও কথা হয়। এক পর্যায়ে আমি বললাম- “বেঁচে থেকে আর কি লাভ? আমার জীবন কারো উপকারে তো আসছে না, আমি পারছিনা কারো কোন উপকার করতে। আল্লাহপাক আমার হায়াত কমিয়ে আপনার হায়াত বাড়িয়ে দিলে মানুষ অনেক উপকার পেত”। এ বাক্যটি শুনার পর তিনি কিছুক্ষণ স্তব্দ হয়ে রইলেন। তাঁর চোখে বিন্দু বিন্দু পানি দেখা গেল। তখন তিনি হিসেব করে বললেন- “তুই আমার ১৫ বছরের ছোট, মরে যেতে চাস কেন? কি এত কষ্ট? আর কোনদিন এ ধরণের কথা বলবি না”।

বড়ভাই ছিলেন বিবেক, বুদ্ধি ও অনুভূতির বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম, মানবীয় গুণে গুণান্বিত, পরোপকারী। পরোপকার মানুষের মহৎ গুণ। সমাজ জীবনে একজন মানুষকে কথায়, আচরণে, লেনদেনে অপর মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হতে হয়। মানুষ পৃথিবীতে একজনের দুঃখে-সুখে অপরজন সহযোগী। বিপদে একজন অপরজনকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। মানুষের সাথে মানুষের সহযোগিতা ও সহমর্মিতামূলক কাজকে পরোপকার বলা হয়।

আমার বড়ভাই অধ্যাপক ডা. এল.এ. কাদেরী সত্যিকার অর্থেই একজন শ্রেষ্ঠ পরোপকারী মানুষ। একটি Welfare State হিসেবে বাংলাদেশকে গড়তে তিনি পরোপকারে নিজেকে সর্বদা সামিল রেখেছিলেন সকল মত পার্থক্যের উর্ধ্বে। রাজনৈতিক বিশ্বাস তাঁর ছিল দেশের মানুষের স্বাধিকার, মুক্তি ও অধিকারকেই ঘিরে। তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে ১৯৬৩-৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এম.বি.বি.এস ফাইনাল পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথমস্থান অধিকার করলেও পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদী ও সামরিক শাসকচক্র বিরোধী গণঅধিকার আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় তাঁর স্কলারশীপ আটকে রাখে- যা পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে মেধাবী ছাত্রদের উপর ভিন্ন মতের সরকারী মহলের আক্রোশ চরিতার্থ করার একটি ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও তাঁকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি- সরকারের ভিতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা সুবিধাবাদী, স্বার্থানেষী ও নীতিজ্ঞানশূন্য ব্যক্তিদের কুট-কৌশলের কারণে।

বড়ভাই দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে যে অবদান রেখেছেন, নিউরোসার্জারীর মত কঠিন সাবজেক্ট নিয়ে পেশাগত উৎকর্ষ সাধন ও সম্প্রসারণে যে আলোকোমূল ভূমিকা রেখেছেন- তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য অনুসরণীয়- অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি পেশাজীবী, স্বেচ্ছাসেবী, জনকল্যাণ, সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, মকতব ও গরীব-দুঃখীদের অকাতরে দান করেছেন।

তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে শ্রদ্ধেয় ও অনুবর্তী অনেকেই ইতিমধ্যে লিখেছেন। আরো অনেকেই লিখছেন। ছোটভাই হিসেবে উনার জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও কীর্তি যতটুকু সম্ভব সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছি এবং যারা লিখছেন তারা সংগ্রহ করে কাজে লাগাচ্ছেন, লিখছেন।

বড়ভাই অধ্যাপক ডা. এল.এ. কাদেরীর বড়গুণ ছিল অপ্রিয় হলেও সাহস করে সত্য বলা এবং অন্যকে সত্য বলতে উৎসাহ দেয়া। তিনি বলতেন-“আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও নিজরোসায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল: সত্য কথা বলা এবং সত্য বলার জন্য উৎসাহ দিতে সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করে ভূল বিশ্বাস ও মিথ্যা দ্বারা ক্রমাগত প্রভাবিত হতে থাকলে মানুষের মস্তিস্কের Working Structure বা কর্মকাঠামো বদলে যায়। ফলে মানুষের মধ্যে সত্য বলা, শোনার আগ্রহ ও সামর্থ্য দুই’ই কমে যায়”।

তিনি আল্লাহকে রাজী-খুশী করার জন্য নীরবে, গোপনে অনেক দান করেছেন। অনেকেই অনেক কথা বলেছিলেন, তিনি এসব কথা পরোয়া করেননি। উনার আরেকটি গুণ ছিল সবাইকে নিয়ে মৈত্রীর বন্ধনে কাজ করা। শক্তি প্রয়োগ করে মত বিরোধ থেকে বিরত রাখা তিনি পছন্দ করতেন না। কোন বিষয়ে কারো ভিন্নমত থাকলে তিনি গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন এবং সুখকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করতেন। তিনি সবসময় আলোর পথে চলেছেন। ১৯৮৮-৯১ পর্যন্ত তিনি সভাপতি থাকাকালীন সময়ে বি.এম.এ চট্টগ্রাম, শাখার কমিটি দেখলেই এটা বুঝা যায় সব মতাদর্শের চিকিৎসক উনার কমিটিতে ছিলেন।

সকলেই জানেন, ভাইয়ের সম্পর্ক রক্তের, সন্তানের সম্পর্ক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের। একি পিতা-মাতার সন্তান আমরা। মুরব্বী, আত্মীয় ও সতীর্থদের অনেকেই পরামর্শ দিয়েছেন বড়ভাই সম্পর্কে একটি Comprehensive write-up তৈরির জন্য। এখন আমার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা অবশিষ্ট নেই তা তৈরি করার।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছিলেন- “সন্তানের উপর পিতার যে ধরনের অধিকার রয়েছে ছোট ভাইয়ের উপরও বড়ভাইয়ের সে ধরনের অধিকার রয়েছে, তেমনি পিতার উপর সন্তানের যে ধরনের অধিকার রয়েছে বড়ভাইয়ের উপরও ছোটভাইয়ের সে ধরনের অধিকার রয়েছে”। বড়ভাই এবং আমরা ছোটভাইরা একত্রিত হলে হুজুর (সঃ) এর ‘এই হাদিসটি নিয়ে মাঝে মধ্যে আলোচনা করতাম’ এবং এটা অনুসরণ ও প্রতিপালন কতটুক করেছি তা যত্নের সাথে আলোচনা করতাম।

আল্লাহপাক বড়ভাই অধ্যাপক ডা. এল.এ. কাদেরীর সকল নেক আমলগুলো কবুল করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।

দেশে-বিদেশে, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা বড়ভাইয়ের ইন্তেকালে শোক প্রকাশ, দোয়া ও সমবেদনা জানিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক, ওয়ার্ল্ড এসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলস্ নির্বাহী পরিষদ ও বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সাবেক সদস্য।

নিউজনাউ/আরবি২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান