কেমন আছে জাপানি দুই শিশু?

নিউজনাউ ডেস্ক: এক ছাদের তলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকলেও বাবা ও মাকে একসঙ্গে পাচ্ছে না জাপানি দুই শিশু। আদালতের নির্দেশে তাদের একসাথে থাকার অনুমতি মিললেও বিচ্ছেদের গল্প এখানেই শেষ নয়। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর শুনানির পর আবারও ঘুরে যেতে পারে নির্দেশনা। এ অবস্থায় কেমন আছে জাপানি দুই শিশু?

জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা। তাদের মা জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো এবং বাবা বাংলাদেশি নাগরিক শরীফ ইমরান। বহুদিন পর তারা একসঙ্গে বাবা মা’কে পেয়েছে। তিনদিন ধরে গুলশানের ভাড়া করা বাসায় বাবা-মা’কে পেয়ে বেশ খুশি তারা। চার রুমের ফ্ল্যাটে আগামী ১৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাবা-মায়ের সঙ্গে মনের আনন্দে সময় কাটাবে তারা।

জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো। পেশায় চিকিৎসক। বাংলাদেশি নাগরিক শরীফ ইমরান। পেশায় প্রকৌশলী। দুইজনের পরিচয় টোকিও’র একটি হাসপাতালে। পরিচয় থেকে ভালো লাগা। এরপর ২০০৮ সালে টোকিও’র একটি মসজিদে পারস্পরিক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০৮ সাল থেকে ২০২০ সাল তারা ছিলেন একসঙ্গে। একযুগের সংসার জীবনে জন্ম হয় তিন কন্যাসন্তান। কিন্তু এরিকো-ইমরান এখন দুই মেরুর বাসিন্দা। এবার সন্তানদের অভিভাবকত্ব পেতে মা জাপানের আদালতে এবং বাবা বাংলাদেশের আদালতে মামলা করেন। জাপানে এরিকোর দায়ের করা মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ইমরান তার দুই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। এবার দুই মেয়েকে ফিরে পেতে এরিকো টোকিও থেকে উড়ে আসেন ঢাকায়। আইনজীবীদের পরামর্শে হাইকোর্টে রিট করেন।

সূত্র জানায়, ইমরান-এরিকো গুলশানের যে বাসায় রয়েছেন, সেটিতে তিনটি বেড এবং একটি করে ডাইনিং ও ড্রয়িং রুম। একটি বেডরুমে থাকেন এরিকো, আরেকটিতে ইমরান এবং অপরটিতে তাদের দুই মেয়ে জেসমিন ও লাইলা। ইমরানের নিয়োগ দেয়া গৃহকর্মী তাদের পছন্দের খাবার রান্না করছেন। দুই শিশু কখনো মায়ের কাছে, কখনো বাবার ঘরে যাচ্ছেন। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে পৃথক কথা বলছেন। বাবা-মাও আলাদা সময়ে সন্তানদের কক্ষে গিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু বাবা-মাকে একসঙ্গে বসিয়ে কথাবার্তা বলা হচ্ছে না তাদের।

গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট দুই মেয়ে শিশুকে নিয়ে মা নাকানো এরিকো ও বাবা শরীফ ইমরানকে এক বাসায় থাকার নির্দেশ দেন। ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে বলা হয়েছে বিষয়টি দেখভাল (মনিটরিং) করতে এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) বাচ্চাসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়। আগামী ১৬ই সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশের জন্য রেখে আদালত বলেন, বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণে রাখবে। কোনো পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ উঠলে তা পুনর্বিবেচনা করা হবে।

আদালতের নির্দেশে গুলশান-১ নম্বরের একটি ভাড়া বাসায় বুধবার থেকে দুই শিশু বসবাস করছেন মা এরিকো নাকানো ও বাবা ইমরান শরীফের সঙ্গে। দুইজনই সন্তানদের দেখাশোনা করছেন। তবে এক ছাদের নিচে বসবাস করলেও তাদের বাবা মা কেউ কারো সঙ্গে কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না। উভয়েই উভয়কে এড়িয়ে চলছেন। শরীফ ইমরান গণমাধ্যমকে বলেন, একই বাসায় থাকলেও এরিকোর সঙ্গে তার কথা হয় না।

ইমরান শরীফের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম জানান, সন্তানদের নিয়ে আপাতত ভালোই আছেন এরিকো ও ইমরান দম্পতি। তাদের দুই সন্তানও বেশ আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন। অপরদিকে এরিকোর আইনজীবী শিশির মনির জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই সন্তান নিয়ে এরিকো ও ইমরান গত বুধবার দুপুর ১টায় বাসায় ওঠেন। আদালতের নির্দেশে এরিকো একজন দোভাষী পেয়েছেন। তিনিও তাদের সঙ্গে ওই বাসায় থাকছেন। ইমরান শরীফ বলেন, সন্তানদের জিম্মা নিয়ে সমঝোতামূলক কোনো আলাপ-আলোচনাই হয়নি এখনো। টুকটাক যা কথাবার্তা হচ্ছে, সবই সাংসারিক। বাসায় সারাক্ষণ পুলিশ সদস্যরা আছেন। তবু এই ব্যবস্থা ভালো। পুলিশ হাজির থাকলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা কম। তা ছাড়া তিনি নিজেও একটি শক্তিশালী ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়েছেন। তিনি কোনো অন্যায়ের দায় নিতে চান না। তবে সন্তানদের নিয়ে এই দম্পতি একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছেন। এরিকো ও ইমরানের মেয়েরা অনলাইনে ক্লাসও করেছে।

তবে ইমরান শরীফের আশঙ্কা, আদালতের রায় এরিকোর পক্ষে গেলে সন্তানদের নিয়ে তিনি জাপানে চলে যাবেন। আর কখনোই তিনি তার সন্তানদের দেখতে পাবেন না। ইমরান শরীফ রয়টার্স ও ওয়াশিংটন পোস্টের দুটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের ২২শে আগস্ট, ২০১৯ সংখ্যায় ‘প্যারেন্টাল চাইল্ড অ্যাবডাকশন বিকামস এ ডিপ্লোমেটিক এমব্যারাসমেন্ট ফর জাপান অ্যাহেড অব জি-৭’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে একাধিক সাক্ষাৎকার রয়েছে। তাদের সবাই ভুক্তভোগী অভিভাবক। জাপানি নাগরিককে বিয়ে করার পর বিচ্ছেদ ঘটেছে এবং সন্তানকে আর দেখতে পাননি তারা। জাপানের আইন দুই অভিভাবকের যৌথ জিম্মা প্রথায় বিশ্বাসী নয়। শিশুরা যেন ধারাবাহিকভাবে এক জায়গায় থাকতে পারে, সেদিকেই মনোযোগ দেয়া হয় বেশি। শুধু যে বিদেশি নাগরিকেরা ভুগছেন তা-ই নয়, জাপানেও বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানকে দেখতে পারেন না এমন অভিভাবকের সংখ্যা প্রচুর।

নিউজনাউ/এসএ/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: