মধ্যযুগীয় মহাজাগতিক ঘড়ি “প্রাগ এস্ট্রোনোমিকাল ক্লক”

আশিক ইসতিয়াক: “প্রাগ এস্ট্রোনোমিকাল ক্লক” বা “প্রাগ অরলজ”! একটি মধ্যযুগীয় মহাজাগতিক ঘড়ি। ১৪১০ সালে নির্মিত এই নিদর্শন ইতিহাসে তৃতীয় মহাজাগতিক ঘড়ি ও বর্তমানে চলমান সবচাইতে পুরনো ঘড়ি। এর সাথে রয়েছে তাবৎ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতি, এমনকি ভূত ও প্রেতাত্মা জড়িত এক প্রাচীন অভিশাপের গল্প যা থেকে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র ও “Prague Clock: The Curse of the Orloj” নামের হালের একটি ওয়েব সিরিজ যার সিজন ২ প্রচন্ড জনপ্রিয়তার সাথে চলছে। ট্যুর গাইডের কথা ও নিজের কিছু পড়াশোনা থেকে লিখবার চেষ্টা করি সেসব সম্পর্কে।

 

প্রথমে জানা যাক কেন এ ঘড়িকে মহাজাগতিক ঘড়ি বলা হয়। এ ঘড়ির তিনটি বিশেষ কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার মাঝে প্রথমটি হলো “একটি এস্ট্রোনোমিকাল ডায়াল” যা সূর্য, চন্দ্র ও কক্ষপথের বেশ কটি গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্দেশ করে। এই ডায়ালকে ঘিরে একটি জোডিয়াকাল রিং, একটি আউটার রোটেটিং রিং, একটি আইকন সূর্যের ও একটি আইকন চন্দ্রের জন্য নির্ধারিত। নীল রংয়ের আকাশও দেখতে পাওয়া যাবে। সঙ্গত কারণেই তাই এ ঘড়িটিকে মহাজাগতিক ঘড়ি বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, যীশু খ্রিস্টের ১২ শিষ্যের ক্ষুদ্র ভাস্কর্য ও তাদের নিজস্ব রূপক চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় এস্ট্রোনোমিক ডায়ালের নিচেই। একেকটি ঘন্টা বাজে, আর এই ১২ জনের সমাবেশ সামনে আসে। ১২ জনের ছবির ওপর বছরের ১২ মাসের বিভিন্ন কর্মচিত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যা থেকে প্রাগের বাৎসরিক আহাওয়া ও মৌসুম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় ১৮৬৫ সালে এ ঘড়ির ভেতর শিল্পী ইয়োসেফ মেনেস এর এক দারুণ চিত্রাঙ্কন প্রবেশ করানো হয়েছিল যা থেকে ১২ শিষ্য ১২ মাসের বিষয়টি ফুটে ওঠে।

তৃতীয়ত, ঘন্টার শেষ বোঝাতে একটি কঙ্কাল সামনে আসে যা নির্দেশ করে মৃত্যু। এই কঙ্কাল ছাড়াও আরও তিনটি ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায় ঘড়ির দুপাশে। প্রথমটিতে দেখা যায় আয়নার সামনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে যে নিজের রূপে নিজে অভিভূত। একে বলা যায় আত্মগর্ব বা অহংকারের প্রকাশ। আরেকটিতে দেখা যায় এক কৃপন ব্যক্তিকে যার হাতে রয়েছে এক থলে সোনা। এটি নির্দেশ করছে লোভ। এরপর স্টেরিওটিপিকাল এক টার্কিশকে দেখতে পাওয়া যায়, যার চোখে শৃঙ্গার ও পার্থিব লালসা। ঘন্টা শেষে যখন কঙ্কাল সামনে আসে তখন বাকি তিন মূর্তি কেঁপে ওঠে। কি দারুণ চিন্তা। লোভ, লালসা বা গর্ব করে কি হবে যখন শেষ পরিণতি ওই কঙ্কাল! তাই সময় থাকতেই সাবধান হতে বলছে এই ঘড়ি। এই কঙ্কাল, ১২ শিষ্যের অবয়ব ইত্যাদি থেকে তৈরি হয়েছে অনেক লোকাল লেজেন্ড। সেগুলো সম্পর্কে জানব এখন নির্মান ইতিহাসের সাথে সাথে।

১৪১০ সালে প্রাগের বিখ্যাত ঘড়ি মাস্টার মিকুলাস অফ কাদান এ ঘড়ির যন্ত্রাংশ নির্মান করেন, আর চার্লস ইউনিভার্সিটির গণিত ও জোতির্বিদ্যার প্রফেসর ইয়ান সিনডেল নির্মান করেন সেই বিখ্যাত এস্ট্রোনোমিকাল ডায়াল। ১৪৯০ সালে ক্যালেন্ডার ডায়ালটি যোগ করা হয়েছিল। বহুদিন ধরে ভুল ভাবা হতো যে এটি নির্মান করেছেন ইয়ান রুযে নামের আরেকজন ক্লক মাস্টার যিনি “হানুস” নামেও পরিচিত ছিলেন। তার নামের সাথে মিলিয়ে এ ঘড়ির সাথে জড়িয়ে আছে, “দ্যা কার্স অফ হানুস”। হানুসকে তখনকার প্রাগ কাউন্সিলর অন্ধ করে দিয়েছিল যাতে এরকম ঘড়ি পৃথিবীর আর কোথাও তৈরি না হয়। কিন্তু অন্ধ হানুস তার এক পরিচারকের সহায়তায় ঘড়ি স্পর্শ করে এর মেকানিজম নষ্ট করে দেয়। যার কারণে ১০০ বছর এটি বন্ধ থাকে। অবশেষে ১৫৫২ সালে ইয়ান তাবোর্সকি এটি মেরামত করতে সক্ষম হন। এই মিথকে প্রধান করে “গোটঃ দ্যা ওল্ড প্রাগ লেজেন্ডস” নামে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। লেজেন্ড আরও বলছে যে, হানুসের ভূত এখনও ঘড়ির ভেতরে বসে আছে। যদি এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয় আর এর চলাচল বন্ধ হয়, তাহলে প্রাগ শহরের ওপর অশুভ ছায়া নেমে আসবে। শহরে নামবে প্লেগ, ভূত একবার মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললে। আর মুক্তির মেসিয়াহ হিসেবে নতুন বছরের রাতে জন্ম নেওয়া এক ছেলে উদ্ধার করবে প্রাগ শগরকে। তাই নববর্ষের দিনে কোন ছেলে শিশু জন্মালে তাকে মজা করে মেসিয়াহ বলার প্রচলন এখনও প্রাগে আছে।

 

১৬২৯ বা ৫৯ এ এসে ওই চার মূর্তি ও ১২ শিষ্যের ভাস্কর্য যোগ করা হয়েছিল। ১৮৬৫-৬৬ তে আরেকবার মেরামত করার সময় সোনালী রংয়ের মোরগটি যোগ করা হয়। তবে অরলজ ঘড়ির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১৯৪৫ এ নাৎসী বাহিনীর হাতে যখন প্রাগ শহর ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল। ৪৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছিল ঘড়িটিক আগের অবস্থায় ফেরাতে। ২০২০ সালে পালিত হয়ে গেছে ৬১০ বছর পূর্তি। যারা ইউরোপে আসবেন ও প্রাগে আসবেন, তাদের জন্য এ বস্তু দর্শন “বাধ্যতামূলক”।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
2
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান