নীলফামারীর বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্প একযুগ পর সচল

জুয়েল আহমেদ: বর্ষায় জীবন ফিরেছে দেশের প্রথম সেচ প্রকল্প নীলফামারীর বুড়ি তিস্তায়। টইটুম্বর পানিতে ভরেছে ১২১৭ একরের রিজার্ভারটি। টানা খরায় পুরছে যখন উত্তরাঞ্চল। তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় প্রকল্প এলাকার কৃষকরা নিজেদের চেষ্টায় পানি নিয়ে যাচ্ছেন জমিতে।

ক’দিন আগেও জেলার জলঢাকা, ডিমলা উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের শত শত বিঘা জমি পানি অভাবে পরে ছিলো অনাবাদী। বিকল্প সেচের মাধ্যমে রোপিত চারা শুকিয়ে মাটি ফেটে চৌচির হয়েছিলো। কাটা পাট পচাতে না পেরে তীব্র তাপদাহে পুড়ে পাটকাঠিতে পরিণত হয়েছিলো। এখন এখানকার কৃষকেরা আশান্বিত হয়েছেন। পরে থাকা আমনের জমি তৈরি করে চারা রোপণের কাজ শুরু করেছেন।

গোলনা ইউনিয়নের বাসিন্দা কালীগঞ্জ গ্রামের প্রকল্প এলাকার কৃষক, আরিফুল হক, কছির উদ্দিন, তসলিম উদ্দিনসহ অনেকেই জানিয়েছেন, বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পটি তৈরির পর থেকে এই এলাকার কৃষির চিত্র পাল্টে গিয়েছিলো। মাছে-ভাতে ভরেছিল তাদের ঘর। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের থাবায় উচ্চ আদালতে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে মামলার কারণে টানা এক যুগ বন্ধ থাকে সেচ কার্যক্রম। দখল হয়ে যায় পানি ধরে রাখার খালের বিভিন্ন এলাকা। পানি না পাওয়ায় সেচ খালগুলোর বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে যায়। টানা খরায় যখন প্রধান ফসল আমন চাষ করতে না পারায় তারা দিশেহারা হয়ে পরেছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে অনেক মিনতি জানিয়েছেন।

অবশেষে রোববার সকাল থেকে কর্তৃপক্ষ প্রধান সেচ খালে পরিক্ষামূলকভাবে পানি ছাড়েন। সেই পানি দিয়ে তারা আমনের চাষ শুরু করেছেন। এই পানি না পেলে এবছর তাদের আমন চাষ ব্যহত হতো।

বুড়ি তিস্তা পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সফিক সাদিক জানিয়েছেন, গত বছর সরকারি এই স্থাপনা উদ্ধার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ব্যারেজের সবক’টি গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। রিজার্ভারে পানির কোন কমতি নেই। তাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে খালে। বিনা পয়সায় পানি নিচ্ছেন কৃষকরা। সেচ কাজ চালাতে তাদের সদস্যরা রাতদিন পরিশ্রম করছেন।

নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, শুকনো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম চালাতে জেলার ডিমলা সদর ইউনিয়ন, জলঢাকা উপজেলার গোলনা, মীরগঞ্জ, ধর্মপাল, বালাগ্রাম, কাঠালী ইউনিয়ন ও কিশোরগঞ্জ সদরসহ ৭ ইউনিয়নে অনাবাদী জমিতে ফসল ফলাতে নির্মাণ করা হয় বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্প। আড়াই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে খনন করা হয় ৩০ কিলোমিটার খাল। কিন্তু সেগুলো হারিয়েছে কার্যকারিতা কৃষকরা নিজেরাই খাল সংস্কার করায় প্রধান খালের ১০ কিলোমিটার এলাকায় এখন পানি মজুদ রাখা হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে শাখা ক্যানেলের চার কিলোমিটারে পানি ছাড়া হয়েছে। কৃষকের মাঠ নালা তৈরি না থাকায় জমিতে পানি নিতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। অনেকেই ফিতা পাইপের মাধ্যমে পানি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন জমিতে। তিনি আশা করেন বর্ষায় বৃষ্টি না হলেও প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার হেক্টর বাদেও আরও অতিরিক্ত জমিতে সেচ দিতে পারবেন তারা।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডেও প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ জানিয়েছেন, প্রভাবশালীদের দখল আর আইনি জটিলতায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ ছিলো এই প্রকল্পের। উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৎপরতায় আবারো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে প্রকল্পটি। চলতি আমন মৌসুমে দেয়া হচ্ছে সেচ সুবিধা। নতুন করে অন্য কোন সমস্যা দেখা না দিলে আর বন্ধ হবেনা এই সেচ প্রকল্প।

২ কিলোমিটার প্রশস্ত ও সাড়ে ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বুড়ি তিস্তায় এখন পানি মজুদ আছে সাড়ে আট লাখ ঘনমিটার। চলতি অর্থ বছরেই তিস্তা সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে বুড়ি তিস্তার রিজার্ভার খনন ও খাল সংস্কার কাজ শুরু হবে।

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: