NewsNow24.Com
Leading Multimedia News Portal in Bangladesh

বিবেক: এ আর সিকদার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আমি তখন সবে লন্ডন এসেছি। শরীরের সোনালী পশম বাদামী বা কালো হয়নি তখনো । পড়াশোনার পাশাপাশি সেন্ট্রাল লন্ডনের একটা প্রথম শ্রেনীর চেইন গ্রোসারী শপে চাকুরী করি। অল্পদিনেই শিফট ম্যানেজার হয়ে গিয়েছি। শপের সবাই ইংলিশ রুলস মেনে চলে। জব শুরুর পনেরো মিনিট আগেই স্টোরে চলে আসে। আমি সব সময় লেট। আমার প্রথমে শিফট শুরু হতো সকাল সাতটায়। আমার দেরির সাথে তাল মিলাতে মিলাতে সেই শিফট গিয়ে দাড়ালো দুপুর একটায়! ব্যাপারটা খুব ধীরে ধীরে হয়েছে। সাতটা থেকে শিফট পিছিয়ে দুপুর একটায় আসতে সময় নিয়েছিলাম প্রায় এক বছর। সিনিয়র ম্যানেজাররা ক্ষেপতো না। দুই তিন জনের কাজ একাই করে ফেলতাম। বছর শেষে পারফরমেন্স রিভিউ মিটিং শেষে ম্যানেজার বব অলিভার মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলেন। তার পায়ত্রিশ বছর প্রফেশনাল লাইফে কোন কলিগের সাথে এতটা কম্প্রোমাইস তিনি করেননি, যতটা আমার সাথে করেছেন। যে যাই বলুক, আমি আমার দুশত ভাগ বাঙ্গালিয়ানা জাহির রেখেছি তখনো। বলাই বাহুল্য, শপের আগাগোড়া সবার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এমনও ছিল, আমি না গেলেও আমার হাজিরা হয়ে যেতো! শপে বাঙালি, ইংলিশ, পোলিশ, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, শ্রীলংকা সহ আরো অনেক দেশের নাগরিকই কাজ করতো। সবাই বন্ধু ছিলো শুধু পাকিস্তানী বাদে। কারণ ওরা কখনই কারো বন্ধু হতে পারে না। একটি অভিশপ্ত জাতি।

এক রোববার আমি শিফট শুরু করার আগেই পৌছে গেছি শপে। শপের উল্টো পাশে গাড়ি পার্ক করে বসে আছি। আমার নিয়মানুবর্তিতায় আমার কলিগরা দূর থেকে দাত বের করে হাসছে। আমার বের হতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমি একটি অভূত পূর্ব দৃশ্য দেখছি। দুইটা কবুতরের রোমান্স! রাস্তার উপর দিয়ে এই মাথা সেই মাথা চক্কর দিচ্ছে। সুযোগ পেলে মুহুর্তের জন্য জিরিয়ে নিচ্ছে কোথাও। বুঝা যাচ্ছে মেয়ে কবুতরটার পিছু পিছু ছেলে কবুতরটা উড়ছে। কখনো পাত্তা পাচ্ছে, আবার পাচ্ছে না। যখন পাচ্ছে তখন ঠোঁটে ঠোঁটে অনেক ঠোকা ঠুকি হচ্ছে। মাটিতে নেমে ছেলে কবুতরটি নাচ পর্যন্ত দেখালো! আমি মুগ্ধ নয়নে দেখছি। আমার হারিয়ে যাওয়া প্রেমের কথা মনে পরছে। খেলা জমে উঠেছে। উড়ে উড়ে কবুতর দুটো আমার গাড়ির উপরও দুএক বার বসেছে।আবার মেয়ে কবুতরটি উড়ে রাস্তার অন্য পাসে চলে গেলো। পিছু পিছু ছেলে কবুতরটাও উড়াল দিলো। আচানক কোথা হতে একটা সাদা লরী খুব দ্রুত গতিতে পাস করে গেলো। পরিষ্কার দেখলাম, ছেলে কবুতরটা চলন্ত গাড়ির সাথে স্বজোরে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল। মুহুর্তে প্রেমময় দৃশ্যে ভয়াবহ শোকের মাতম। মেয়ে কবুতরটা আকুলি বিকুলি করে মৃত প্রায় ছেলে কবুতরটাকে ঘিরে উড়ছে। ডানা ঝাপ্টানিতে স্পষ্ট আতঙ্ক। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও থ। সম্বিত ফিরে পেতেই দৌড়ে গেলাম কবুতরটির কাছে। হাতে নিলাম। ডানে বামে তাকালাম। কোন সম্ভাবনা নাই। মেয়ে কবুতরটা তখনো মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে। আমি দ্রুত শপে পৌছালাম। দুহাতের তালুতে মৃত প্রায় কবুতর। মনে হয় এতোক্ষণে পাখিটা মারা গেছে। আমি উদ্ভ্রান্ত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। আমার কলিগরা প্রথম থেকেই ঘটনা দেখছিলো। এক ইংলিশ কলিগ সুজানা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো হাউ মাউ করে। বেবী ডোন্ট ক্রাই, বেবী ডোন্ট ক্রাই বলে বলে নিজেই কাঁদছে ও । আমি ততোক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছি। ওদের মধ্যে থেকে একজন লোকাল অথরিটিকে ফোন করে দিয়েছে। লোক আসছে মৃত কবুতরটি নিয়ে যাবে। সেই দৃশ্য আমি দেখতে চাই না। সুজানা তখনো কাঁদছে।
আমি প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে অফিস রুমে বসে থাকলাম। সাথে প্রচন্ড লজ্জা। মনুসত্তের লজ্জা। আর মন খারাপ আমার মানুষিক দারিদ্রতার কথা ভেবে। কবুতর মারা গিয়েছে মোটেও সেই কথা ভেবে না। কারণ কবুতরটা আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে যাবার সাথে সাথে আমার মাথায় ওকে সশ্রুষা করার কথা আসে নি। যা এসেছে তা হলো “এখন চাকু কোথায় পাই?”. চাকুর খোঁজেই ডানে বামে তাকিয়েছি। শপে ঢুকেছি। কারণ আমাদের বেকারীর কিচেনে চাকু আছে। কিন্তু শপে ঢুকতে না ঢুকতেই পাখিটি মারা গেলো! আমি উদ্ভ্রান্ত ছিলাম সেই কারণেই। আর আমার কলিগরা ভাবলো ” আহারে কি নরম মনের মানুষ! শপের মেয়েরা বলা বলি করলো- ওর মতো ফ্রেশ হার্ট মানুষ হয় না। সেই ফিস ফিস আমি যতবার সুনেছি, আমি মনে মনে ততোবার মারা গিয়েছি।
প্রতিটি কবুতরের পায়ে অথরিটি থেকে নম্বর সহ সীল দেয়া থাকে। আমার জানা ছিলো না। শহরের প্রতিটা কবুতরের জন্ম মৃত্যুর হিসেব তারা রাখার চেষ্টা করে। তারা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে কিনা, রোগে ভুগছে কিনা, ঘুমুচ্ছে কোথায় এই সবই দেশের অথরিটির দেখভালের বিষয়। অথরিটি হচ্ছে সরকার। পশু পাখির অভয়অরণ্য নিশ্চিত করা হয়েছে এই শহরে। কোন কবুতর মানুষ দেখে কখনো উড়ে যায় না এই শহরে। পায়ে পায়ে ঘেঁসে ঘেঁসে হাটে প্রায়ই। ভয় দেখালেও ভয় পায় না। কারণ ওরা ভয় চিনে না। কেউ ওদের ভয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় নাই কখনো। দুহাজার বছরের পুরনো শহর লন্ডন। এখনো রাস্তায় রাস্তায় শেয়াল নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়! আমার অবশ্য এই সব জানার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে।

আমি যখন ছোট, বিক্রমপুর থাকতাম, মেজোভাই এয়ারগান দিয়ে অনেক পাখি মারতো। ওর টিপ ছিলো অব্যর্থ। আমি সাথে যেতাম। মেজোভাই গুলি করতো, গাছ থেকে পাখি ডানা ঝাপ্টে ঝাপ্টে মাটিতে পরতো। আমার কাজ ছিলো দৌড়ে গিয়ে গুলি বিদ্ধ পাখিটি নিয়ে আসা আর চাকু দিয়ে “জ ব” করা। আমার পাখির মাংস খুব প্রীয় ছিলো। কতো পাখি যে মারতাম! আম বক, ধলা বক, খইয়া বক, ওয়াক, মাছরাঙ্গা, ডাহুক, ঘুঘু, হাইরাকুকু, এমনকি টুনটুনি পর্যন্ত! শীতের দিনে পাখির মাংস খেতে ঢাকা থেকে আত্তীয়রা ও আসতেন।
রাতে বাশ ঝাড়ে বকের পাল পা তুলে ঘুমাতো। টর্চ লাইট মেরে একটা একটা করে বক মারা হতো। তার পর ঢাকায় এসে আর পাখির মাংস পাই নাই। তবে কিনে আনা কবুতরের মাংস ঝোল করে দিতো মা। গোগ্রাসে খেতাম। খুবই সাভাবিক ঘটনা।

সেই সব চর্চাই আমার বিবেক তৈরী করে দিয়েছে। অফিস রুমে বসে আমার বিবেকের দিকে তাকালাম আর সভ্যতার দিকে তাকালাম। ভয়ঙ্কর লজ্জা পেলাম।
নিজেকে খুব বেশি দরিদ্র মনে হলো।

কিসের মনুসত্ত আর জাতীয়তার গর্ব করি আমি,
যেখানে আমার বিবেকই জিঘাংসার কসাই খানা❓

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আপনার মতামত জানান

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More