ইতিহাসের পথ ধরে জয় আসবেই

দিলশাদুল হক শিমুল: সাল ১৫৪২। শীতকাল। তৎকালীন ভারতবর্ষে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে একটু আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন একজন মহান হৃদয়ের মানুষ। মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসার গল্প পরবর্তী সময়ে উদাহরণ হয়ে ছড়িয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। কথা দিয়েছেন বলেই তিনি একদিনের জন্য তাঁর ক্ষমতা বলে এক মামুলী ভিস্তিওয়ালাকে দিল্লীর মোঘল সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।

এতো যার ক্ষমতা তিনিই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এখন, হায়রে নিয়তী! এটা অবশ্য তার জন্য বিশেষ সমস্যা না। সমস্যা হলো তার স্ত্রীকে নিয়ে। তিনি সন্তানসম্ভবা। ঘোড়ার পিঠে ঘুরে বেড়াতে তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে। স্ত্রীর নাম হামিদা বানু। যে কোন সময় হামিদা বানুর সন্তান প্রসব হবে। দ্রুত হামিদা বানুর জন্য নিরাপদ স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, তিনি তা পারছেন না।

ইতিহাস বলে মহান হৃদয় এর মানুষ সে সাধারণ হোক বা সম্রাট, বিপদে পরলে কারো কাছেই সাহায্য পান না। সাহায্যের জন্য, একটু আশ্রয়ের জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরছেন। প্রায় সবাই তাঁকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। অথচ কয়দিন আগেও তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের মহান সম্রাট। দিল্লীর সিংহাসনের অধিপতি।

ঘুরতে ঘুরতে তিনি আমোরকোট নামের এক জায়গায় এলেন। সেখান তার কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় মিললো। স্ত্রীর প্রসবকালীন সময়টা তিনি আমোরকোটে কাটাবার জন্য স্থীর করলেন। তাঁর পিছনে ধাওয়া করতে করতে আসছে আরেক বিখ্যাত মহাবীর শের শাহ -এর বাহিনী। আমোরকোটের রাজা তাঁকে সম্মান দিয়ে সাদরে গ্রহণ করলেন। যদিও তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না তাঁকে বন্দী করে আমোরকোটের রাজা শের শাহ -এর হাতে তুলে দিবেন কি না। তবুও তিনি দোদূল্যমান মন নিয়ে আমোরকোটেই আতিথ্য গ্রহণ করলেন। অবশ্য তাঁর এছাড়া কোন উপায়ও নেই।

এই আমোরকোটেই হামিদা বানুর গর্ভে এক শিশুপুত্র জন্ম নিলো। শিশুপুত্রের জন্ম উপলক্ষে খুশি হয়ে রাজ্যহারা মহান সম্রাট শিশুপুত্রের পিতা তাঁর কাছে রক্ষিত মহামূল্যবান মৃগনাভি কেটে ভাগ করে তাঁর আমীরদের মাঝে বিতরণ করলেন। আজ তাঁর মহা খুশির দিন অথচ নিয়তির দূর্দশায় যথাযথ আনন্দ অনুষ্ঠান ও উপহার বিতরণ করতে পারলেন না বলে আমত্যদের কাছে তিনি দূঃখ প্রকাশ করলেন।

পাঠক, ঘটনাটা মোঘল আমলের। যথাসময়ে এই মহান মোঘল সম্রাট ও তাঁর এই বীর পুত্রের নাম প্রকাশ করা হবে। চলুন আমরা একটু টাইম ট্রাভেল করে চলে যাই এই ঘটনার আরো প্রায় পাঁচশ বছর পরে। মহান সৃস্টিকর্তার ইচ্ছায় এই ঘটনাটি অঙ্কিত হচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের একটু পরের সময়ে। চলুন আমরা দ্রুত ঘটনায় ঢুকে পরি।

একজন তরুণী সন্তানসম্ভবা মা তাঁর প্রথম সন্তান জন্মদান উপলক্ষে বাবার বাড়ি এসেছেন। এ সময় যে কোনো মেয়েই খুব আনন্দে থাকে। সবকিছু মিলিয়ে তাঁরও মনে প্রবল আনন্দ থাকবার কথা, কিন্তু তিনি আনন্দ করতে পারছেন না। তাঁর ভীষন মন খারাপ।

কারণ, কয়েকদিন আগে তরুণীর হৃদয়বান পিতাকে শত্রু পক্ষের সেনারা গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে গেছেন! তিনি বেঁচে আছেন কি না এটাও এই অসহায় পরিবারটি জানে না। শুধু জানেন কয়েক হাজার মাইল দূরের একটি কারাগারের নির্জন কক্ষে বন্দী করে রেখেছে তাঁর মহান পিতাকে। এরকম অবস্থায় পৃথিবীর কোন কন্যারই মন ভাল থাকবার কথা না। পৃথিবীর এই কন্যারও নেই।

শত্রু পক্ষ তাঁকেসহ তাঁর পরিবারে প্রায় বাকি সবাইকেও গৃহবন্দী করে রেখেছে। জেল সদৃশ বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বন্দী অবস্থায় কাটছে তাঁদের প্রতিটি দিবস ও প্রতিটি রজনী।
কয়েকদিন পরপর তাঁদের এখান ওখানে বিভিন্ন জেলখানায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাখা হচ্ছে। সবসময় তাঁদের এক জায়গায় রাখছে না শত্রু পক্ষ। গর্ভাবস্থায় এই ঘোরাঘুরি তরুনীর জন্য খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। রাতে জেলখানার মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে সবাইকে। জেলখানার মেঝেতে শুয়ে তিনি তাঁর মহান বাবাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন। তাঁর অন্যসব ভাইবোনও বেশ ছোট ছোট। তাঁরাও চিন্তিত, তিনি সবাইকে যদিও শান্তনা দিয়ে রাখেন; তবুও নিজের পিতার জন্য দুশ্চিন্তা কমাতে পারছেন না। দিনের পর দিন মাসের পরে মাস চলে যায়। তাঁর মহান পিতাকে ওরা মেরে ফেলেছে কি না এটাও জানেন না তাঁরা। কোন খোঁজও পাচ্ছেন না। পিতার জন্য দুশ্চিন্তায় তাঁর ঘুম হয় না ভালোমতো।

এমনি একদিন জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায় তরুণীর কোল আলো করে এক শিশুপুত্র জন্মগ্রহণ করলো। দিনটি ছিল ২৭ জুলাই, ১৯৭১। শিশু-পূত্রটির মায়ের নাম শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় সন্তান। বড় আদরের সন্তান।

শিশুপুত্রটিকে কোলে নিয়ে একদিন তরুণী মা শেখ হাসিনা জেলখানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। শত্রু পক্ষের এক সামরিক অফিসার শিশুপুত্রের নাম জানতে চাইলে শেখ হাসিনা দৃপ্ত কন্ঠে বললেন, “আমার সন্তানের নাম জয়”। নাম শুনে কর্নেল পদমর্যাদার পাকিস্তানি সেই অফিসার কিছুটা ভড়কে গেলেন। কারন ‘জয় বাংলা’ বলে সব বাঙালি তখন এক জোট। এই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনীতে তখন বাংলার আকাশ বাতাস কাঁপছে। লাখো লাখো মুক্তিযোদ্ধা ‘জয় বাংলা’ বলে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছে। পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সামরিক অফিসাররাও বাচ্চা বাচ্চা সব মুক্তিযোদ্ধা ছেলে পেলের গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশলের কাছে পরাজিত হচ্ছে। কারণ, এই মুক্তিযোদ্ধাদের ভালবাসার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার নির্দেশে তাঁরা যুদ্ধে নেমেছে দেশ স্বাধীন করার প্রত্যয় নিয়ে।

ভড়কে যাওয়া এই পাকিস্তানি কর্নেলের মনে ক্ষীন সন্দেহ যে তারা বেশিদিন শেখ মুজিবুর রহমানের এই পরিবারকে এভাবে আটকে রাখতে পারবে না। যেভাবে মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসর হচ্ছে তাতে তারা যে কোনদিন তার জেল আক্রমণ করে এই পরিবারকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। তরুণী মা শেখ হাসিনার চোখের বলিষ্ঠ চাহনীর সামনে কর্নেল বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল।

পাঠক এই পর্যায়ে আরেকবার টাইম ট্রাভেল করবো আমরা চলে আসবো বর্তমানে আজকের দিনে এই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পর।

সেই কর্নেল তার দেশ পাকিস্তানের শিয়ালকোটে টিভির সামনে বসা। বয়সের ভাড়ে নূজ্য শরীর। তার পায়ে কি এক রোগ হয়ছে হাটতে সমস্যা। পা সামনের টেবিলে টেনে তুলে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে খেয়াল করলো আজকের একটি সংবাদ, সেই মা ও ছেলে তাদের দেশ বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে ঝাঁপিয়ে পরেছে। কর্নেল আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো সেই মায়ের কথায় ও চোখে একই দৃপ্ততা। পঞ্চাশ বছরেও যা একটুও কমেনি। কমবে কিভাবে! সে শেখ মুজিবুর রহমানের বড় কন্যা। নাম তার শেখ হাসিনা। সে বুদ্ধীদীপ্ত সেই আদর্শ পুত্র ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার সজীব ওয়াজেদ জয় এর জননী বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পাকিস্তানকে ফেলে এগিয়ে বাংলাদেশ আজ। বিশ্বের কাছে রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। পৃথিবীর একমাত্র নেতা যিনি বিশ্ব ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ দিয়ে কাজ করে দেখান। বিশ্ব ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ দিয়ে তাঁর করা পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান।

পাকিস্তানি কর্নেল তাঁর নিজ দেশের নেতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিরস্কার করতে করতে টিভি সেটের সামনে থেকে উঠে গেল। পাকিস্তানের প্রায় সবাই এমন করে এখন, করুক।

চলুন আমরা টাইম ট্রাভেল করে ফিরে যাই পাঁচশ বছর আগের সেই ঘটনায়। মোঘল আমলে। যেনে আসি সেই বীর পুত্রসন্তান ও তাঁর মহান পিতার পরিচয়।

১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর আমোরকোটে হামিদা বানুর গর্ভে জন্ম নেয়া সেই শিশুপুত্রের পিতার নাম মহান মোঘল সম্রাট হুমায়ুন। ভারতবর্ষের শিল্পকলা চর্চার অগ্রপথিক। তাঁর আঁকা কয়েকটি ছবি বৃটিশ মিউজিয়ামে আছে। যে ছবিগুলো পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পকলার অংশ এখন। হুমায়ুন সেই মোঘল সম্রাট যিনি মহামূল্যবান কোহিনূর অর্জন করে তাঁর পিতাকে উপহার দিয়েছিলেন। শিল্প সাহিত্যে তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত।

মহান সম্রাট হুমায়ূন এর শিশুপুত্রটির নাম আকবর। আকবর দ্য গ্রেট। পরবর্তীতে রাজ্য পরিচালনায় মেধা যোগ্যতা ও অন্যান্য গুণাবলির জন্য যিনি পৃথিবীর ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন আকবর দ্য গ্রেট নামে।

ইতিহাস বলে এক একটি প্রতিকূল রাজনৈতিক সময়েই জন্ম নেয় পৃথিবী বিখ্যাত এক একজন লিডার। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হলে আমরাও পেতে পারি একজন গ্রেট লিডার। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হোক। হয়তো হয়ও মাঝে মাঝে!

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী অবস্থায়। সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়েও জন্ম নিয়েছিল যে জয়। আজ সেই সজীব ওয়াজেদ জয়-এর জন্মদিন। সব পরিচয় ছাপিয়েও আজ আপনি বাংলাদেশর প্রতিটি মানুষের আশার স্থল, নয়নমনি। দীর্ঘায়ু হন আপনি। শুভ জন্মদিন।

বি.দ্র.: আমি ঐতিহাসিক নই। তাই, সম্পূর্ণ সত্য ইতিহাস লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। একজন নগন্য চলচ্চিত্রকার হিসেবে এই লেখা একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লিডারের প্রতি আমার শুভ্চ্ছা বার্তা কেবল। তাই গল্পের ছলে বলা এই জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তায় কোথাও কোথাও কল্পকাহিনীর আশ্রয়ও নেয়া হয়েছে। ধন্যবাদ।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

নিউজনাউ/এসএ/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: