বকেয়া আদায়ে এয়ার ইন্ডিয়ার দখল চায় ফরাসি সংস্থা

নিউজনাউ ডেস্ক: যুক্তরাজ্যভিত্তিক গ্যাস ও জ্বালানি কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি ভারতের কাছে তাদের বকেয়া ১৭০ কোটি ডলার আদায় করতে দেশটির সরকারের বেশ কিছু সম্পত্তির দখল নিয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে বৃহস্পতিবার ২০টি ভারতীয় সম্পত্তির দখল নেওয়া ছাড়াও কেয়ার্ন যুক্তরাষ্ট্রে এয়ার ইন্ডিয়ার দখল নিতে মামলাও করেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারত সরকারের সম্পত্তির তল্লাশি করছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারত সরকার তাদের ওপরে যে অনায্যভাবে বাড়তি কর চাপিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে দু’পক্ষ‌ই আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে গিয়েছিল। ওই সালিশি আদালতের নির্দেশ তাদের পক্ষে গেছে। সেজন্যই তারা বকেয়া আদায়ের কাজ শুরু করেছে। তবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, কোনো ফরাসি আদালতের কাছ থেকে এধরনের কোনো নির্দেশ তারা পায়নি।

কেয়ার্ন এনার্জি বলছে, গত বছর ডিসেম্বরে দ্যা হেগ-এর আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত সর্বসম্মতভাবে তাদের পক্ষেই রায় দিয়ে বলেছিল যে ভারত সরকারকে বকেয়া ১৭০ কোটি ডলার ফিরিয়ে দিতে হবে। সঙ্গে দিতে হবে সুদ। ওই রায় তারা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের আদালতে কার্যকর করার আবেদন করেছিল।

ফ্রান্সের আদালতটি প্যারিসে ভারতীয় সম্পত্তিগুলো দখল নেওয়ার নির্দেশ কার্যকর করতে অনুমোদন দেয় কেয়ার্নকে। তারপরেই ২০টি ভারতীয় সম্পত্তির দখল নেওয়া হয় বলে কেয়ার্ন বিবিসিকে জানিয়েছে।

কেয়ার্ন এনার্জির ডিরেক্টর, গ্রুপ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডেভিড নিসবেট  জানান, সালিশি আদালতের রায়ের পরে সাড়ে ছয় মাস কেটে গেলেও ভারত বকেয়া না মেটানোর ফলেই তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শেয়ার হোল্ডারদের অধিকার আমাদের রক্ষা করতেই হবে। আন্তর্জাতিক শেয়ার হোল্ডাররা সাড়ে সাত বছর ধরে এটার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।’

ভারত সরকার আর কেয়ার্নের এই দ্বন্দ্বের শুরু প্রায় ১৫ বছর আগে। তারও বছর পাঁচেক আগে কেয়ার্ন রাজস্থানে বড়সড় তেলের খনি আবিষ্কার করে। এরপর ২০০৬-০৭ সালে কেয়ার্ন ইউকে তাদের শেয়ার কেয়ার্ন ইন্ডিয়া সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে এবং ২০১১ সালে কেয়ার্ন ভারত থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে ভেদান্তার কাছে তাদের সংস্থা বিক্রি করে দেয়।

রেট্রস্পেকটিভ ট্যাক্স ব্যবস্থা চালু হয় ২০১২ সালে আর সেই আইন অনুযায়ীই কেয়ার্নকে কর দিতে হয়। ভারতের ওই রেট্রস্পেকটিভ ট্যাক্স ব্যবস্থা আসলে কী, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শিল্প বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক কুনাল বোস বলেন, ‘আমাদের সরকার একটা ব্যবস্থা চালু করে যেখানে পুরনো হিসাবপত্র বের করে আগেকার আয় বা লাভের ওপরেও কর বসানো হয় নতুন হারে।’

তিনি বলেন, ‘প্রণব মুখার্জী যখন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখনই এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। কিন্তু সেসময়ে সরকারের মধ্যেও অনেকে এটা পছন্দ করেননি।’

‘আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগ করেন যেসব বিষয়ের ওপরে ভিত্তি করে, তার মধ্যে অন্যতম হল কর ব্যবস্থা। এখন যদি বলা হয় যে, পুরনো আয় বা লাভের ওপরেও নতুন হারে কর দিতে হবে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা তো ব্যবসা করতে চাইবে না। এটা যে কোনো দেশের বিনিয়োগের ওপরেই খারাপ প্রভাব ফেলবে।’

কেয়ার্ন বলছে, ভারত তাদের কর ব্যবস্থা কী ভাবে চালাবে, তা নিয়ে তাদের কোনো প্রশ্ন নেই। এই বিষয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বও তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যে সালিশি আদালতে তারা গিয়েছিলেন, তার রায়কে মর্যাদা দিয়ে বকেয়া ফেরত দিক- এটাই চাইছে তারা।ডেভিড নিসবেট বলছিলেন, ‘আমরা বিশ্বের যে দেশেই কাজ করি, এটাই মেনেই নেওয়া হয় যে সেখানকার স্থানীয় সরকারের কর আদায় করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রয়েছে। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না। ভারতের ক্ষেত্রেও সেরকম কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।’

প্যারিসে ভারতীয় সম্পত্তি দখল নেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পরে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতি জারি করে বলেছে, ‘ফ্রান্সের কোনো আদালত থেকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের নোটিস, নির্দেশ বা কোনো চিঠি আমরা পাইনি। ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে মার্চ মাসের ২২ তারিখ আপিল করেছে ভারত।’

ভারত সর্বশক্তি দিয়ে আইনি লড়াই চালাবে বলেও জানিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে সাংবাদিক কুনাল বোস বলছিলেন, তিনি মনে করেন ভারতের উচিত কেয়ার্নের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যাটার সমাধান বের করা।’আমার মনে হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত কেয়ার্নের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমাধান বার করা। এখনও সময় আছে। কিন্তু দিল্লি যদি এটা না করতে চায়, তাহলে কেয়ার্ন এবার নানা দেশে ভারতের যেসব সম্পত্তি আছে, সেগুলোকে টার্গেট করবে। এর মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানগুলো যে তাদের মাথায় আছে, সেটা স্পষ্ট হচ্ছে।’

শুধু প্যারিসে ভারতীয় সম্পত্তির দখল নিয়েই যে কেয়ার্ন থেমে যাবে না, সেটা সংস্থাটি স্পষ্ট করেই বলছে। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানগুলো দখল নেওয়া যেমন তাদের পরিকল্পনায় আছে, তেমনই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে কয়েক হাজার কোটি ডলার মূল্যের ভারতীয় সম্পত্তি চিহ্নিত করেছে তারা, যার মধ্যে আছে সরকারি তেল ও গ্যাস কোম্পানি, ব্যাংক ইত্যাদি। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

নিউজনাউ/এফএস/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: