বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রই কয়লাভিত্তিক

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক ১০টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। পরিবেশবাদীরাও সরব। অনেকে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। কার্বন নিঃসরণ বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভূমিকা রাখছেন। রাখবেন। তবে একটি কথা না বললেই নয়; কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মানেই পরিবেশ দূষণ হবে, এমন কোন কথা নয়। এখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আল্টা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্লান্ট করা হচ্ছে।এতে পরিবেশ দূষণ হওয়ার কোন আশঙ্কাই থাকছে না।

আর একটি কথা, কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহজ জ্বালানি হলো কয়লা। এ কারণে সরকারের ভর্তুকিও কম দিতে হচ্ছে। হবে। কয়লা ছাড়া অন্যান্য যেমন: এলএনজি, জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্পের খরচ বেশি পড়বে। সরকারকে ভর্তুকিও দিতে হবে বেশি। বর্তমান পরিস্থিতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখার পাশাপাশি গতি বাড়াতে নতুন প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই। যা প্রায় শতভাগ পরিবেশবান্ধব।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আন্তরিক। এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাস বলছে, ১৫০ বছর ধরে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে, প্রথমে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য—তারপর এশিয়া ও আফ্রিকার অর্থনীতি মজবুত করতে। কয়লা এখনও বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় উৎস। ২০১৯ সালে এক দশকের মধ্যে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে খরচের পরিমাণ সর্বনিম্ন হয়ে যায়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগই এখন চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে হচ্ছে।

 

চীন এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কয়লা ব্যবহার করছে। ভারতের কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের আকারও দিন দিন বেড়েই চলেছে। জাপান নিজ দেশে এখনও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া তাদের খনিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। ব্রিটেনও একটি নতুন কয়লাখনি খুলতে যাচ্ছে। এদের সাথে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লাব্যবহারকারী দুই দেশ চীন ও ভারত তো আছেই।

কয়লার এখনও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। করোনা মহামারির পর দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতি যত দ্রুত সম্ভব পুনরুদ্ধার করতে চাইবে। সেইসাথে চাইবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নও কমিয়ে আনতে। এক্ষেত্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যুক্ত হয়েছে কয়েকস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ আল্টা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি। যা পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব শূণ্যে নামিয়ে আসবে।

এবার আসা যাক। খরচের হিসেবে। কয়লা কেন ব্যয় সাশ্রয়ী? বাংলাদেশ বর্তমানে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করছে। ২০২১ সালে ২৪ হাজার, ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় লাল-সবুজের দেশ। শিল্পায়নের এই অগ্রগতি ধরে রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার কোন বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে খরচের বিষয়টি সামনে আসছে বার বার। বর্তমানে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি খরচ পড়ছে ১৬ থেকে ২০ টাকার মতো, গ্যাসে প্রায় তিন টাকা, আর কয়লায় খরচ পড়ছে পৌনে ৪ টাকার মতো। অন্যদিকে সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ষোল টাকার উপর।

উৎপাদন খরচ অনুযায়ী সাশ্রয়ী হচ্ছে গ্যাস দিয়ে বিদ্যু‍ৎ উৎপাদন। কিন্তু দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে বাংলাদেশের গ্যাসের মজুদ। এখনই গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকছে। সরকার এ অবস্থায় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আমদানিকরা এলএনজি নিয়ে চিন্তা করছে। কিন্তু তাতেও ১৫ টাকার উপর খরচ পড়বে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এসব দিক বিবেচনা করে সাশ্রয়ী খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা বিকল্প নেই।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে কয়লা, যা মোট শক্তি ব্যবহারের প্রায় ২৩ শতাংশ। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনও চীনে ৭৫ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায়। বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২.৫ শতাংশ কয়লা থেকে আসে। বর্তমানে কয়লাই হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য উৎস।

২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবে গভীর বনভূমির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার আইন আছে। আমাদের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের প্রান্ত সীমানা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হতে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ন্যাশনাল পার্কের এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ভিয়েতনামের হ্যালং বে (উইনেস্কো ঐতিহ্য) এর মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট।

প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট যদি এতই দুষণ সৃষ্টি করতো, তাহলে জাপানের মতো দেশ নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নিতো না। ক’দিন আগে জাপান সরকার ৭০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। চীনে প্রায় ৩০০ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ কাজ চলছে।

২০০৭ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে ৫০ হাজারেরও বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে বিদ্যুতের চাহিদা আরো ৬০ শতাংশ বাড়বে। এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মিটানোর জন্য কয়লাই প্রথম পছন্দ।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: