পদ বঞ্চিত কর্মী নাকি সাবেক ছাত্রলীগ, ঠিক করবে সাবজেক্ট কমিটি

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২০ বছরের ‘আক্ষেপ’ ফুরাচ্ছে শীঘ্রই। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগে মেয়াদ ফুরানো সব কমিটিকে পথ দেখাতে আসন্ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনটিকে এসিড টেস্ট হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তর এই দলটির যেকোনো পর্যায়ের কমিটি দেওয়া মানেই হলো মাঠের রাজনীতির বাইরেরও অনেক হিসেব নিকেশের সমাধান! আর সেটি যদি হয় মূলত দুই ধারায় বিভক্ত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ, তখন ব্যাপারটি হয় আরো কঠিন। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে ২০ বছরের চলমান কমিটির নেতাদের যোগ্য কর্মীদের নেতা হওয়ার দাবি!

করোনায় দুই দফা পিছিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৯ জুন। দীর্ঘ ২০ বছর পর বহুল প্রতীক্ষিত এ সম্মেলন হবে ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমেই। আওয়ামী রাজনীতিতে ‘সবাই নেতা’র এই সময়ে ভোটাভুটিতে না গিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটির প্রথম এই সম্মেলনে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন হবে সাবজেক্ট কমিটির মাধ্যমে। কেন্দ্র এবং নগর নেতাদের বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বলে এমনটিই জানা গেছে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী ১৯ জুন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতারা থাকবেন ভিডিও কনফারেন্সে। আর চট্টগ্রাম অংশের নেতাকর্মীরাসহ সম্মেলন স্থলে স্বশরীরে উপস্থিত থাকবেন বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা।

দীর্ঘ ২০ বছর এই কমিটিতে যারা চট্টগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই আহবায়ক যুগ্ম আহবায়কসহ বেশিরভাগ নেতাই চাইছেন আসন্ন কমিটিতে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের গ্রুপিং রাজনীতির প্রভাব মুক্ত হোক স্বেচ্ছাসেবক লীগ। আবার অনেকেই চাইছেন মূলত যে দুই ধারায় বিভক্ত নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি তাদের মধ্যে সমন্বয় করেই দেওয়া হোক কমিটি। এই দুই ধারার বিভক্ত রাজনীতির অসন্তোষে পুড়তে চান না কেন্দ্রীয় নেতারাও।

এতোগুলো বছরে চট্টগ্রামে এই সংগঠনকে বিকশিত করতে যে শ্রম দেওয়া লেগেছে সেই গল্প শোনাচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কেবিএম শাহজাহান। তিনি বলেন, পড়ায় মহল্লায় গিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বোঝাতে হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কি! এইটা যে সিটি কর্পোরেশনের সেবক না সেটাও তখন আমাদের বুঝাতে হয়েছিল। এতগুলা বছরে এখন এসে এই সংগঠন অনেক যোগ্য নেতা তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংকটসহ জাতীয় রাজনীতিতে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের অবস্থান ছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সুসংহত করা। তবে এতো বছরে কমিটি দিতে না পারাটা তাকে ভীষণ পোড়ায়।

এটিকে শুভ লক্ষণ নয় বলে তিনি বলেন, আমরা সব সময় কিমিটি দিতে চেষ্টা আলোচনা করেছি। কিন্তু আমাদের দায়িত্বের শুরুতেই বিএনপি ক্ষমতায় এলো। আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ৮ বছর। এর পরেও আমরা সম্মেলন করতে প্রস্তুত ছিলাম। কেন পারিনি সেটা দলীয় ফোরামে বলেছি। আমাদের আগ্রহের কোন ঘাটতি ছিল না। থাকলে কেন্দ্রীয় কমিটি সম্মেলন দিতে বলার ২৩ দিনের মাথায় আমরা সম্মেলনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতে পারতাম না।

আসন্ন সম্মেলন নিয়েই এখন আওয়ামী পাড়ায় যত আলাপ। এরমধ্যেই চট্টগ্রামে সিভি জমা দিয়েছেন ৪৫০ জন। যাচাই বাছাই শেষে এইগুলা শনিবার রাতে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। এছাড়া কেন্দ্রে আরো কিছু সিভি আগে জমা হয়েছে বলে নিউজনাউকে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক এডভোকেট জিয়াউদ্দিন। তিনি বলেন, আগামী দুই তিনদিনের মধ্যে
একশ ষাট কিংবা সত্তর জনের কাউন্সিলর থেকে সাবজেক্ট কমিটি নির্ধারিত হবে। সেখান থেকে মূল কমিটি নির্বাচিত হবে। সাবজেক্ট কমিটিতে দশজন থাকতে পারেন বলে তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, ১০১ জনের কমিটির কলেবর বাড়ানোর দাবি এর মধ্যেই আমরা কেন্দ্রে জানিয়েছি। যেহেতু দীর্ঘদিনের কমিটি। অনেকেই পদ পদবীতে না থেকে সংগঠনে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। এই করোনা সংকটে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামে সর্ব্বোচ উজাড় করে কাজ করেছেন। পছন্দের মানুষ কিংবা এই গ্রুপ ঐ গ্রুপ থেকে নেতা বানালে যোগ্যদের বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগে নেতা হতে চাওয়া নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, এবার কমিটিতে স্থান পাওয়ার জন্য নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছির উদ্দিন ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারীদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন নেতা আলোচনায় রয়েছেন। এর মধ্যে আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীদের মধ্যে হেলাল উদ্দিন, সুজিত দাশ, আব্দুর রশিদ লোকমান ও মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের নাম বেশ আলোচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে নেতৃত্ব পাওয়ার দৌড়ে শুরু থেকেই হেলাল উদ্দিন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুর এই ছোট ভাইকে নিয়ে আজম নাছির উদ্দিনের বলয়ে খানিকটা ভিন্ন মতও রয়েছে। এই ভিন্নমত হালে পানি পেলে এই বলয় থেকে সামনে চলে আসতে পারে লোকমান কিংবা সালাউদ্দিনের নামও। অন্যদিকে শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল অনুসারীদের মধ্যে আজিজুর রহমান, কাউন্সিলর আবুল হাসনাত বেলাল, দেবাশীষ নাথ দেবুর নামই আলোচিত হচ্ছে বেশি।

এর বাইরে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান নেতাদের গুরুত্ব দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে সাদেক হোসেন পাপ্পু, দেলোয়ার হোসেন ফরহাদ, আনোয়ার উদ্দিন বাপ্পী, নুরুল কবির অ্যাডভোকেট তসলিম উদ্দিন, আজাদ খান অভি, ও শাহেদ আলী রানা, সাহেদ মুরাদ সাকু, আজিজ মিস্ত্রী, মনোয়ার জাহান মনি, জসিমদের সম্ভাবনাও থাকবে প্রবলভাবে। এছাড়া আলোচনায় আছে দেবাশীষ আচার্য্যের নামও, তিনি সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালামের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ নিউজনাউকে বলেন, যেহেতু দীর্ঘদিন সম্মেলন নাই, সম্মেলন সচল করার লক্ষ্যে যে প্রক্রিয়া করলে সুবিধা হয় সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। চট্টগ্রামের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃবৃন্দ আছেন সবার সাথে আলাপ আলোচনা করে কিভাবে কি করা যায় সেটা ঠিক করবো আমরা।

কাদের গুরুত্ব দিয়ে কমিটি করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নির্মল রঞ্জন গুহ বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবকলীগ হচ্ছে সাবেক ছাত্রনেতাদের একটা সংগঠন। এখানে ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ যারা ছিল , যারা ছাত্রলীগ করে দীর্ঘদিন যাবৎ পদ পদবি ছাড়া আছে। আমরা সাধারণও তাদের গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আর বিগত কমিটিতে দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ার কারণে মূল্যায়িত হয়নি তাদের সকলের বিষয় দেখেশুনে আমরা সিদ্ধান্ত নিব। দীর্ঘদিন পর সম্মেলন হচ্ছে, এখানে একটা সুন্দর স্ট্রাকচার দাড় করানোই আমাদের লক্ষ্য। আমরাতো সিভিও নিয়েছি।

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: