ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট : সেই থেকে আজ

ড. মিঠুন মোস্তাফিজ:

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো শুক্রবার। ১১ দিনের বিমান হামলার পর এ যুদ্ধবিরতি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো থেকে জানা যাচ্ছে, এ যুদ্ধে ইসরায়েল আর হামাস উভয়েই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। উত্তেজনার শুরুটা পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে। আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি পুলিশের অভিযানের জেরে হামাস রকেট ছোড়া শুরু করলে গেল ১০ মে থেকে গাজায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। মৃত্যুপুরী বনে যায় গাজা। নারী-শিশু-বৃদ্ধের প্রাণ যায় পাখির মতো। ইসরায়েলি বর্বরতায় ২৩২ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ১২ ইসরায়েলির নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট এতটা বিতর্কিত যে এ ইস্যুতে গোটা দুনিয়ার মানুষ দুই শিবিরে বিভক্ত। তবে ক্ষমতা, দখলদারি, বিশ্বরাজনীতি ও ব্যবসায়ী পকেটের হিসাব-নিকাশে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের যে সহসা কোনো নিশ্চয়তা নেই তা বলাই যায়।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট হাজার বছর পুরনো। জনশ্রুতি আছে, যিশুখ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল একটি ইহুদি পরিবারে। কিছু খ্রিস্টান এমনটি মানে যে ইহুদিরা যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করতে চাইত। তাদের এমন বিশ্বাস বহু দশক, শতক পর্যন্ত খ্রিস্টানদের মধ্যে বদ্ধমূল হিসেবে প্রোথিত ছিল। হাজার বছর আগে যখন ক্রুসেড হলো তখন খ্রিস্টানরা অনেক ইহুদিকে হত্যা করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর পর ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ছিল তা কেবল ধর্মীয় কারণেই। এসব কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীর পরে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের মধ্যে এমন জোর ভাবনাচিন্তা শুরু হয় যে কোনো দেশই তাদের আপন করে দেখবে না। সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাইলে তাদের নিজেদেরই একটি রাষ্ট্র গড়তে হবে।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক থিওডোর হারজেল ১৮৯৬ সালে একটি রাজনৈতিক প্রচারপত্রের মাধ্যমে নতুন করে জায়োনিস্ট আন্দোলন শুরু করেন। জুডেনস্ট্যাড নামের সেই প্রচারপত্রে বলা হয়, ইহুদিদের একটি আলাদা রাষ্ট্র থাকতে হবে। তবে তারও আগে ১৮৭০ সালে এমন আরও সংগঠন ছিল যাদের কেউ কেউ ‘লাভারস অব জায়ান’ বা জায়ানভক্ত বলে পরিচিত ছিল। এবার ওই ধারণাটির প্রসার অব্যাহত থাকল। এসব কারণে ১৮৮১ সালে প্রথম ইহুদিদের সবচেয়ে বড় অভিবাসন ঢল দেখা যায় ফিলিস্তিন এলাকায়। ইহুদিরা ফিলিস্তিন এলাকায় গিয়ে স্থায়ী আবাস গড়ে বসবাস শুরু করে। ওই সময় না কোনো ইসরায়েল ছিল, না গাজা, না পশ্চিম তীর। এসব এলাকার নাম ছিল প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন যা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন।

১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত পুরো সময় ফিলিস্তিন ব্রিটিশরাজের অধীন ছিল। এ সময়ের মধ্যে জার্মানিতে হিটলার লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেন। হিটলার নিয়ন্ত্রিত পুরো ইউরোপে ইহুদিরা জান বাঁচাতে পালাতে থাকে। কেউ আমেরিকায় শরণার্থী হয়। কিছু ইহুদি যায় ফিলিস্তিনে। ব্রিটিশরা প্রথমে তাদের প্রবেশ করতে দেয়, পরে বাইরে আসতে বাধা দেয়। যে কারণে ফিলিস্তিনের ভিতরে একটি ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। একই সময় ১৯৪০ সাল আসতে আসতে ফিলিস্তিনের লোকজনও নিজেদের স্বাধীন দেশের দাবিতে সোচ্চার হয়।

এবার জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভাগের পরিকল্পনা করে। ঠিক করে কতটুকু ভূমি নিয়ে ফিলিস্তিন আর কতটুকু ভূমি নিয়ে ইসরায়েল দেশ বানানো হবে। ১৯৪৭ সালে ইউএন পার্টিশন পরিকল্পনা রেজুলেশন অনুযায়ী ফিলিস্তিনের ৪৫ শতাংশ ভূমি দিয়ে আরব রাষ্ট্র, ৫৫ শতাংশ ভূমি দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র এবং জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখার পরিকল্পনা করা হয়। আরব রাষ্ট্রগুলো এ প্রস্তাবে অখুশি হয়। ১৯৪৮ সালে বাধে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। পাঁচটির বেশি দেশ একটি ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। জিতে যায় ইহুদিরা! ১৯৪৯ সালে যখন যুদ্ধ শেষ হয় তখন জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী যতটুকু ভূমি পাওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে বেশি পরিমাণে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে নেয় ইসরায়েল।

১৯৬৪ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) গঠিত হয়। এর শুরুটা ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের। এ কারণে ইউএসএ-ইসরায়েল একে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে। ১৯৭৪ সালে পিএলওকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আরব লিগ ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ পিএলওকে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৯ সালে মিসর ও ইসরায়েলের ভিতরে শান্তি আলোচনা সফল হয়। মিসরই প্রথম আরব দেশ যে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে দখলকৃত মিসরীয় ভূমি ফিরিয়ে দেয় ইসরায়েল। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মোনাশেম বেগিন ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় এ শান্তিচুক্তির বদৌলতে।

১৯৬৭ থেকে ’৮০ সাল পর্যন্ত গাজা ও পশ্চিম তীর দখল করে রাখে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সেখানে প্রায় ৭ লাখ স্থাপনা বানায়। কট্টর ইসরায়েলিরা মনে করে পশ্চিম তীর পুরোটাই তাদের। তবে ১৯৯২ সালে আইজ্যাক রবিন নামে একজন মহান প্রধানমন্ত্রী পায় ইসরায়েল। রবিন বলেন, পিএলও কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। তারা তাদের নিজেদের দেশ চায়। আমাদের তাদের দেশ দিতে হবে। ইসরায়েল পিএলওকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, বিনিময়ে পিএলও ইসরায়েলকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটিই হলো ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি। এই প্রথমবারের মতো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন একসঙ্গে বসে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দেশভাগের চিন্তা করে। এমন সব রাজনৈতিক অগ্রগতির ফলে ১৯৯৪ সালে প্রথম ফিলিস্তিন সরকার গঠিত হয় যার নাম হয় প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথরিটি (পিএনএ)।

এর মধ্যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন খুব কাছাকাছি চলে আসে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায়। আর এ কারণেই ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ অবস্থার পরপরই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। এবার চরম ডানপন্থি ইহুদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন আইজ্যাক রবিন। একজন চরমপন্থি ইহুদি ১৯৯৫ সালে খুব কাছে থেকে গুলি করে হত্যা করে আইজ্যাক রবিনকে। তবে এ ঘটনার কয়েক বছর আগে ফিলিস্তিনে কিছু কট্টর মুসলিম ‘হামাস’ প্রতিষ্ঠা করে। হামাস প্রচার করতে থাকে পিএলও কর্মীরা খুব বেশি মাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাচ্ছে। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতা করছে। অবস্থা এমন যে সামর্থ্য না থাকলেও ইসরায়েলকে একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায় হামাস। এবার দেখা যায় ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত ও আইজ্যাক রবিনের মধ্যে যে শান্তিচুক্তি হলো তা মূলত দুই পক্ষের চরমপন্থিদের কারণে হোঁচট খায়। আজকের দিনের যে অবস্থা আমরা দেখি তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে কট্টরবাদী ইসরায়েলিরা পুরো পশ্চিম তীরই গিলে ফেলতে চায় নিজেদের দাবি করে। চায় পুরো জেরুজালেম। আর ফিলিস্তিনের কট্টরপন্থিরা ইসরায়েলকেই মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চায়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কোথায়? ফিলিস্তিনের নকশায় পশ্চিম তীরটি এত বেশি পরিমাণে টুকরো যে যদি আলাদা সরকারও করে দেওয়া হয় তবু এর টেকসই অস্তিত্ব নিয়ে যে কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর পক্ষে ভালো কিছু বলা মুশকিল। অবশ্য বিশেষজ্ঞের অনেকেই মনে করেন, ‘দুই রাষ্ট্র’ সমাধান পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। ১৯৬৭ সালের ভিত্তিতে ইসরায়েল ফিলিস্তিনকে আলাদা করে দেওয়া যায়। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৮ সালের মতোই দুটি দেশের ভূমিসীমা চিহ্নিত করা যেতে পারে। এখন যদি এমনটা করাও হয় তবে প্রশ্ন উঠবে, পশ্চিম তীরে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে ইসরায়েল যে স্থায়ী বসতি, স্কুল, কলেজ, রাস্তা, হাসপাতাল বানিয়েছে এসবের কী হবে? দখলি এলাকায় ৬ থেকে সাড়ে ৭ লাখ ইসরায়েলি বাস করছে। তাহলে এ সংকটের সমাধান আসলে কী? কীভাবে দুই দেশকে ভাগ করা যায়! উদারপন্থিদের সঙ্গে একমত হওয়া যায়। তারা বলছেন, সংকট আসলে কট্টরবাদিতায়। তাই যতি দন না ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি কট্টরপন্থার নীতি বদলাচ্ছে তত দিনই হয়তো ক্ষমতা, অস্ত্র আর ব্যবসার লোভে শতধাবিভক্ত বিশ্বকে রক্তাক্ত গাজার অসহায়, নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু দেখতে হবে পাষন্ডের মতো।

প্রসঙ্গত, গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় যখন শত শত প্রাণহানির খবরে প্রকম্পিত বিশ্ব মিডিয়া তখন মানবাধিকার ও সুশাসনের ফেরিওয়ালা যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি অনুমোদন করল। ফিলিস্তিনিদের রক্ত বা চোখের পানির মূল্য কি কখনো দেবে এই অমানবিক বিশ্ব?

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : ভিজিটিং প্রফেসর, নোবেল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এনআইইউ ইউএসএ; ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর সোশ্যা ডেভেলপমেন্ট- আইসিএসডি।

ইমেইল : mithunmostafiz@gmail.com

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: