আস্থা রাখি শেখ হাসিনায়

ওয়াহিদা আক্তার:

গুজব বা Rumors অর্থ হলো জনসাধারণ সম্পর্কিত প্রশ্নবিদ্ধ যে কোনো বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত অযাচাইকৃত কোনো বর্ণনা বা গল্প। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় গুজব হলো কোনো তথ্য বা ঘটনার এমন কোনো বিকৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে বা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অপপ্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো গুজব। সামাজিক এবং মনোবিজ্ঞান শাস্ত্রে গুজবের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা পাওয়া যায়। গুজব অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য এবং অসংগত তথ্য এ দুই-ই বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ভুল তথ্য বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য এবং অসংগতি তথ্য বলতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা বোঝায়।

রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নেতিবাচক গুজব সর্বদা অধিক কার্যকর হতে দেখা যায়। গুজব ছড়ানোর কৌশলগুলোর মধ্যে মিথ্যা বা কারসাজির মাধ্যমে বিকৃত ছবির ব্যবহার। বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও কারসাজি করা ছবি দিয়ে স্বীকৃত তথ্যের আকারে মতামত উপস্থাপন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা এবং এক ধরনের সংশয় তৈরি করা হয়। বারবার মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে শ্রোতা-পাঠকের মনে গুজবের একটি প্রভাব ফেলা হয়। গুজবে অনেক সময় স্বীকৃত গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে মিথ্যা পরিবেশন করা হয়। এসব নেতিবাচক গুজব সমাজে বিভ্রান্তি, হিংসা, অস্থিরতা সৃষ্টি করে মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানুষের মন স্বভাবগতভাবে গুজব দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় এজন্য সে গুজবের কথাটি শুনতে বারবার আগ্রহী হয়। ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গুজব জেনেও মানুষ তা শুনতে পছন্দ করে এবং মিথ্যা গুজব জেনেও তা অন্যের কাছে পরিবেশন করে। গুজব সৃষ্টিকারীরা নানা বিষয়ে গুজব রটিয়ে ও উদ্ভট কথাবার্তা প্রচার করে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়ে সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যাপী করোনাকালীন লকডাউনে অবসর কাটানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইনভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউবে ঘরবন্দী মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।। এর সুযোগ নিয়েছে চিহ্নিত কিছু গুজব সৃষ্টিকারী।

পৃথিবীব্যাপী ভয়াবহ মহামারীতে উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যেখানে থমকে গেছে সেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো মেগা প্রকল্পের কাজই থেমে নেই, অনেক উন্নত দেশেরও আগে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে উদ্ভাবিত টিকা আমদানির ব্যবস্থা করেছে সরকার। কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে জীবন রক্ষাকারী টিকার বিরুদ্ধেও গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে সরকার আপৎকালীন প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। কৃষিতে প্রণোদনা ও ভর্তুকির মাধ্যমে দেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকছে না। ফলে কৃষিতে সব ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষ অন্তত না খেয়ে মরবে না, ইনশা আল্লাহ।
বাংলাদেশের উন্নয়নে যখন বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয় তখন একশ্রেণির পরিবেশবাদী মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে এমন গুজব রটানো হয়েছিল। দুর্নীতির গুজবে দেশের মুখে কালিমা লেপন করে বাধাগ্রস্ত করে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। দুর্নীতি মামলার বিচারে কানাডার আদালত বিষয়টি স্রেফ গুজব বলে আখ্যায়িত করে রায় দেয়। দেশের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে শেখ হাসিনার সাহসী ও আপসহীন সিদ্ধান্তে পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু প্রকল্পে নানামুখী গুজব ছড়িয়েও নিবৃত্ত হয়নি গুজবকারীরা। অবশেষে পদ্মা সেতুর জন্য শিশুদের মাথা লাগবে ভীতিকর এ গুজবের কারণে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন এক স্কুল শিক্ষার্থীর অসহায় মা। হোলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় মেট্রোরেল প্রকল্পের ৯ জাপানি কনসালট্যান্টকে হত্যা করে বাধাগ্রস্ত করা হয়। মেট্রোরেল প্রকল্পটি ঢাকা শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে অচিরেই চালু হতে যাচ্ছে গণপরিবহন খাতের স্বপ্নের মেট্রোরেল প্রকল্প।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গৌরবময় অর্জনগুলোকে দৃশ্যমান করা ও তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সারেন্ডার করার জায়গাটি দর্শনীয় করে তোলার জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের কথা জানতে পারবে। সে কাজগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। রেসকোর্স ময়দানে প্রথম গাছ লাগান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। উদ্যান হিসেবে তিনি নামকরণ করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। অথচ ৭ মার্চের ভাষণের স্থান ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সারেন্ডার করার স্মৃতি স্মারক মুছে ফেলার জন্য এ উদ্যানের জায়গায় শিশু পার্ক করা হয়, তখন কোনো পরিবেশবাদী প্রতিবাদ করেননি। এ প্রকল্পে জলাধার সৃষ্টি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিকল্পিতভাবে নেওয়া আছে। ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় স্থান পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের সার্বিক উপস্থাপনা অবলোকন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ কিছুদিন যাবৎ এ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা কিছু গাছ কাটায় পরিবেশ গেল গেল রব তুলেছেন এবং বলছেন ঢাকার ফুসফুস কেটে ফেলা হচ্ছে।

একদল মানুষরূপী দানব সব সময় পরিকল্পিতভাবে দেশে গুজব ছড়ায়। এসব গুজবের ডালপালা বিস্তৃত হয়ে মহিরুহ ধারণ করলেও তথাকথিত পরিবেশবাদীরা সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে কোনো গুজবের ডালপালা কর্তনে এগিয়ে আসেন না। কোনো মানববন্ধনও হয়নি এসব ভয়ংকর গুজবের প্রতিবাদে। নিজ দেশের প্রতি দায়হীন অসুস্থ মানসিকতার একদল ঈর্ষাকাতর, ব্যাধিগ্রস্ত লোক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে ইউটিউবে মনের যন্ত্রণা মিশিয়ে বিকৃত ছবি ব্যবহার করে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে কারও কিছু যেন করার নেই। গলা ফুলিয়ে, মুখে ফেনা তুলে মিথ্যাচারকারী এই ব্যক্তিবর্গ আমাদের দেশেরই শিক্ষিত কুলাঙ্গার কিছু নাগরিক। দিনরাত জ্ঞানপাপী এসব লোক দেশের সর্বনাশের আশায় নিজ মনোজগতের তৈরিকৃত কল্পকাহিনি পরিবেশন করেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, হতাশাগ্রস্ত লোক নিজে যা অলীক কল্পনা করে আনন্দ পায় তা-ই মিথ্যাচারে গুজব আকারে ছড়াতে পছন্দ করে এবং নিজেদের হতাশা কাটাতে এসব গুজব প্রকাশে বিরামহীন প্রচেষ্টা চালায়। যদিও এসব গুজব কেউ আমলে নেয় না, বিশ্বাসও করে না। তার পরও এক ধরনের শ্রোতা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সংশয়ে পড়ে। গুজবকারীদের এটাই উদ্দেশ্য। এর পরও তারা বলে যাচ্ছে বাকস্বাধীনতা নেই!

সরকার গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে। সচেতন মানুষ সব সময় গণমাধ্যমের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং মিথ্যাচার করে তারা দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে যায়। গণমাধ্যম সব প্রতিকূলতার ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ভাষণ তুলে ধরতে না পারলে জনগণ হতাশায় ডুবে যায়। দেশের গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সক্ষমতা রয়েছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে কষ্টার্জিত আমাদের দেশ। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া দেশ। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি আমরা। অথচ আমাদের বাংলা ভাষার কদর্য ব্যবহার যথেচ্ছাচার হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে এর নিন্দা করা না হলে যে কেউ এ ভাষার অপপ্রয়োগে অসম্মানিত হতে পারেন।

হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরাই মুখের ভাষা খারাপ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগে বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে।

শেখ হাসিনার সরকার দেশের দায়িত্বে আছে। তথাকথিত ক্ষমতা প্রদর্শন তিনি করেন না। কোনো গুজব তাঁকে কর্মে ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত বা বিচলিত করতে পারে না। ন্যায়বিচারে তিনি পক্ষপাতিত্ব করেন না। তিনি প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য বিষয়ে জনগণকে জবাবদিহি করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে পিতার মতোই মানবিক। ভালোবাসেন এ দেশের মানুষকে। বাংলার মানুষও প্রতিদানে ভালোবেসে বারবার শেখ হাসিনাকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশ গড়ার। তিনি বাংলার মানুষের কাছে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতাটুকু পাবেন সে আশা রাখেন না। কারণ তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যান না যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান নেতার লাশ ৩২ নম্বর ধানমন্ডির সিঁড়িতে পড়ে ছিল। বাংলার দুঃখী মানুষের ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুকে যেমন রাজনীতিতে এনেছিল তেমনি বাংলার দুঃখী মানুষের ডাকে শেখ হাসিনাও রাজনীতির কঠিন পথে পা বাড়ান। শেখ হাসিনা প্রতিহিংসার রাজনীতি করেন না। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভয়ংকর সব গুজবের নির্মম শিকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবার। মুক্তিযুদ্ধ করে যে দেশ স্বাধীন করা হলো, তা পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছিল সবার। কিন্তু সবাই এ দায়িত্ব নেয়নি, সবাই সহযোগিতা করেনি। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের দায়িত্ব নিয়ে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা ইতিহাসে বিরল। কেননা মৃত্যুর মুখ থেকে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন। একজন মানুষ দেশের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়ে যে সংগ্রামমুখর জীবনযাপন করলেন তার প্রতিদানে পেলেন মৃত্যু। এসব মনে পড়লে কষ্ট হয়। সময়ের পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু পরিবারকে নিয়ে সব গুজব যে মিথ্যা ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে অনেক। আজও বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘিরে মিথ্যা গুজবের ডালপালা বিস্তার করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এ সরকারকে সব অপশক্তি, গুজব ও অপপ্রয়াস থেকে মুক্ত রাখতে সব শুভশক্তির নির্দ্বিধায় সমর্থন করা প্রয়োজন। কর্মে, নিষ্ঠায়, চিন্তা, চেতনায় ও কর্তব্যে অবিচল একজন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চান ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশে। আসুন আমরা আস্থা রাখি শেখ হাসিনায়।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : অতিরিক্ত সচিব।

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: