সংবাদ এর ঐতিহ্য

কাশেম হুমায়ূন:
আজ ‘সংবাদ’-এর ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রথম প্রকাশিত হয় সংবাদ। এরপর পেরিয়ে গেছে ৭ দশক। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’। তখন প্রথমে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ও পরে ঢাকায় স্থানান্তরিত দৈনিক আজাদ ছিল সর্বাধিক প্রচারিত। সংবাদ-এর আগে বাংলা শব্দে কোন দৈনিক পত্রিকার নামও ছিল না। সব পত্রিকারই নাম রাখা হতো ফারসি, উর্দু বা সংস্কৃত শব্দে। এ অর্থে ‘সংবাদ’ ছিল ইতিহাস সৃষ্টিকারী।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংবাদ-এ কর্মরত সংবাদকর্মীদের অধিকাংশই ছিলেন প্রগতি-মনা। আর রাজনৈতিক আদর্শগত-ভাবে প্রগতিশীল ঘরানার। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় ও মুসলিম লীগের ভূমিধস ভরাডুবির পর পরিবর্তন আসে সংবাদের মালিকানায়। সম্পাদক খায়রুল কবির সংবাদের দায়িত্ব দেন তার অনুজ আহমদুল কবিরকে। আহমদুল কবির দায়িত্ব নেয়ার পর সংবাদে নতুন স্পন্দন জাগে। একদিকে জনগণের প্রতি সংবাদের অঙ্গীকার। অন্যদিকে জনগণের আকাঙ্কাও সংবাদের প্রতি। অঙ্গীকার এবং আকাক্ষার সম্মিলনে বেড়ে যায় দায়িত্ব। সেই সঙ্গে বাড়ে কাজের গতি। এতে সংবাদ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা এবং জাতীয়তাবাদসহ প্রগতিশীল, সব রাজনৈতিক কর্মকান্ডে আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে। বিশেষ করে প্রকাশ্য সমর্থন জোগায় বাম ও প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিকে। এর পরিণতিতে পাকিস্তান আমলের পুরো সময়টাতে সংবাদকে অনেক ঘা সইতে হয়। আহমেদুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার, আলী আকসাদ, বজলুর রহমান, সন্তোষ গুপ্ত অবতীর্ণ হন আরও সাহসী ভূমিকায়। তারা স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সংবাদকে গড়ে তোলেন জনগণের নির্ভরতা ও আস্থার মুখপত্র হিসেবে। তা করতে গিয়ে সংবাদের অনেক সাংবাদিককে পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন। কারাভোগও করতে হয়েছে। ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬-এর বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৮-৬৯-এর আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সংবাদ অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। অনন্য ভূমিকা রাখে জনগণকে সংঘটিত করতে। পরিণামে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বেই পাকিস্তানি হানাদাররা টার্গেট করে সংবাদকে। ২৬৩ বংশাল রোডের সংবাদ অফিসটি পুড়িয়ে দেয় তারা। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান সংবাদকর্মী শহীদ সাবের। সংবাদের সাংবাদিকদের অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কারা নির্যাতন ভোগ করেন আহমদুল কবির। ’৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর অন্য বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে শহীদ হন সংবাদের বার্তা সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সারও।

স্বাধীনতার কিছুদিন পর ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়বাদ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে নবোদ্যমে এগোয় সংবাদ। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মোশতাক-জিয়ার পাকিস্তানি ধারার রাজনীতির বিরুদ্ধেও সংবাদ শক্ত অবস্থান নেয়। তোলপাড় সৃষ্টি করে জহুর হোসেন চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমানের তেজস্বী লেখনী। সেই সব লেখা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে জোগায় প্রেরণা।

সংবাদ কখনও ভয়ে স্বৈরাচার-বিরোধী অঙ্গীকার থেকে পিছু হটেনি। এ বিষয়ক গুণমান বৈশিষ্ট্য প্রশ্নে অন্য কোন পত্রিকার সঙ্গে সংবাদের তুলনা চলে না। ’৮২ সালে সামরিক শাসন জারি করে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধেও সংবাদ তার অঙ্গীকার অনুযায়ী ভূমিকা রাখে। এদের ৯ বছরের শাসনামলে সংবাদের ওপর বেশ ক’বার আঘাত আসে। বারবার চেষ্টা চালানো হয় সংবাদ বন্ধ করে দেয়ার।

অসত্য-অন্যায়ের কাছে সংবাদ কখনও শির নিচু করেনি। এ দীক্ষা ও মন্ত্র সংবাদকর্মীদেরও শিখিয়েছেন এখানকার পেশাগত শিক্ষকরা। আধুনিকতার চাকচিক্য সংবাদে কোনকালেই ছিল না। চাকচিক্যের চেয়ে সংবাদের সত্যতা, সাংবাদিকের সততা এবং ন্যায়-নীতি, প্রগতিতে অটল থাকার এ বৈশিষ্ট্য দৈনিক সংবাদ ধরে রাখার চেষ্টা করছে এখনও।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সংবাদ

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
আপনার মতামত জানান
%d bloggers like this: