ব্যাংকিংয়ের নৈতিকতায় ব্যাংকের সুদ মওকুফের বিধান কী?

ড. এস এম আবু জাকের

ব্যাংকের ঋণ যখন আটকে যায় তখন ব্যাংকারের শত চেষ্টা থাকে ব্যাংকের আসল ঋণটা সুদ/মুনাফাসহ আদায় করতে। চলে আলাপ-আলোচনা। এ আলাপ আলোচনায় প্রায় সব ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা একটি শর্ত জুড়ে দেন। আর তা হলো সুদ মওকুফ। গ্রাহক মনে করেন ব্যাংকার সহযোগিতা করতে চাইলেই সুদ মওকুফ হয়ে যায়। ব্যাংকের মুনাফায় আঘাত আসে বলে ব্যাংকার সুদ মওকুফ করতে চান না। তবে পরিচালনা পর্যদ চাইলেই সুদ মওকুফ করতে পারে। ব্যাংক যে সুদ মওকুফ করে না, তা নয়। তবে ঋণের অবস্থার ওপর তা অনেকটা নির্ভর করে। একেক পর্যায়ে একেক ধরনের বিবেচনা সামনে চলে আসে। যেমন গ্রাহকের মৃত্যু, সিকিউরিটিবিহীন ঋণ, অপর্যাপ্ত সিকিউরিটির ঋণ, দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণীকৃত, দীর্ঘদিনের মামলাধীন, বারবার চেষ্টার পরও নিলামে সিকিউরিটি বিক্রিতে ক্রেতার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ডকুমেন্টেশন ইত্যাদি। কিন্তু কোন পর্যায়ে কতটুকু সুদ মওকুফ করা যাবে তার কোনো বিধিবিধান বর্তমানে প্রচলিত নেই। তাই ব্যবস্থাপক যখন আলাপ-আলোচনায় বসেন, তিনি কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা-৪৯ (চ)-তে বলা হয়েছে ‘ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণভাবে সব ব্যাংক কোম্পানি বা কোনো বিশেষ ব্যাংক কোম্পানি বা বিশেষ শ্রেণীর ব্যাংক কোম্পানির জন্য ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণ, ঋণ মওকুফ, পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা পুনর্গঠনসংক্রান্ত বিষয়গুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয় নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।’

ওই বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯১ সালের ৭ অক্টোবর বি সি ডি পরিপত্রমূলে নির্দেশ প্রদান করে যে প্রতিটা ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতিমালার মধ্যে সুদ মওকুফ করতে পারবে, তবে আসল (প্রিন্সিপাল) মওকুফ করা যাবে না।

এ বিধানমূলে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন মোতাবেক সুদ মওকুফ করে আসছে। ২০১৭ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংক একাই ১ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছিল। ২০২০ সালে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করে।

সুদ মওকুফের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে প্রায় ঋণগ্রহীতা সুদ মওকুফ পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। যিনি সুদ দিতে পারবেন, তিনিও একটি আবেদন ছেড়ে দেন। কারণ সুদ মওকুফ পাওয়ার মানদণ্ড বিষয়ে ধারণাটা যেখানে ব্যাংকারদের মধ্যেই অস্পষ্ট, সেখানে গ্রাহকদের কাছে মওকুফের প্রাপ্যতা সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা নয়।

কোনো কোনো ব্যাংক শ্রেণীকৃত ঋণের কিংবা মামলাধীন ঋণের স্থগিত সুদের অর্ধেক মওকুফ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত সুদের পুরোটাই মওকুফ করে। কিছু ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় আয় খাতে আকলিত সুদও মওকুফ করলেও বেশির ভাগ ব্যাংক পারতপক্ষে তা করে না। অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক জামানতের (কোল্যাটারেল সিকিউরিটি) বাজারমূল্য ঋণের পরিমাণের চেয়ে বেশি হলে সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুদ মওকুফ সুবিধা দেয়া হয় না। উচ্চ আদালতে ‘রিট’-এর কারণে ব্যাংকের মামলা যদি বেশ কয়েক বছর ধরে নিষ্পত্তি না হয়, শেষ পর্যন্ত গ্রাহক যদি সুদ মওকুফ করলে আসল দিতে রাজি হয়, তখন ব্যাংকের কাছে ব্যাংকারকে দেয়া কষ্টের কথা অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর যে গ্রাহক নানা প্রতিকূলতার কারণে ঋণ শোধ করতে পারেন না কিন্তু ব্যাংকের ঋণ শোধে তার আন্তরিকতা আছে বলে প্রতীয়মান হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাংকার তাকে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে দায় থেকে রেহাই দেন।

সুদ বা মুনাফা মওকুফের ব্যাপারে ব্যাংকাররাই শুধু নিয়মকানুনের অভাব বোধ করছেন তা নয়, গ্রাহকরাও জানতে চান কে সুদ মওকুফ পাওয়ার যোগ্য আর কে যোগ্য নন। অনেক ঋণগ্রাহক মনে করেন কেউ কেউ যখন সুদ মওকুফ সুবিধা পেয়েছেন, সুতরাং তারাও কোনো এক সময় এ সুবিধা পাবেন। এটা মনে করে ঋণ পরিশোধ করেন না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। ইচ্ছাকৃত খেলাপির সৃষ্টি হয়।

খারাপ ঋণগ্রহীতা যদি সুদ মওকুফ পেয়ে বাজারে তার ক্ষমতা ও সক্ষমতার বাণী আওড়ায়, তখন ভালো ঋণগ্রহীতারা কোনো ধরনের সুদ রেয়াদ সুবিধা ভোগ না করে কিংবা না পেয়ে ব্যাংকের নীতি-নৈতিকতা চর্চায় চাবুক কষেন। এ নীতি ব্যাংকারদের নৈতিকতা চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আবার সুদ মওকুফের সুবিধা প্রদান করে ব্যাংকারদের অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ থাকায় কাউকে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে ব্যাংকারের প্রমাণ করার অবকাশ নেই যে তিনি পুরোপুরি সততার সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়েছেন। এর মূল কারণ সুদ মওকুফের নির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকা।

আবার বড় খেলাপিরা বেশি সুদ মওকুফ সুবিধা পান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকরা এ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে অনেক দূরে থাকেন, কারণ আলোচনার কোনো ধারালো অস্ত্র তাদের কাছে অনুপস্থিত, যা বড় গ্রাহকদের জন্য নস্যি। এ প্রক্রিয়ার একটি বড় ফল হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি।

এটা সর্বজনবিদিত যে ব্যাংকের সুদ মওকুফ সুবিধা প্রদান করা হলে ব্যাংকের নিট আয় কমে যায়। ফলে আমানতকারীদের সুদ আয় কমে যায়, ডিভিডেন্ড কম হয় এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। আবার কিছু ছাড় দিয়ে যদি ব্যাংকের বড় স্বার্থ রক্ষা করা যায়, তা-ও ব্যাংকের জন্য লাভজনক। আবার এমনও ঘটনা আছে যে ব্যাংকের ঋণের টাকা দিয়ে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করে রেখে দিয়ে স্থায়ী আমানত যখন ছয় বছরে দ্বিগুণ হয়, তখন ঋণের সুদ মওকুফ করিয়ে নিয়ে আসল পরিশোধ করে ব্যাংক থেকে ধন্যবাদও কুড়িয়েছেন জনৈক গ্রাহক।

তাই ঋণের সুদ মওকুফের একটি নীতিমালা থাকা কাম্য। কে এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন, কে রাখেন না, তা জানা ব্যাংকারের জন্য যেমন জরুরি, গ্রাহকের জন্যও তেমনি অত্যাবশ্যক। আর কেউ যদি সুদ/মুনাফা মওকুফ সুবিধাপ্রাপ্ত হন, তিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুনর্বার ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা হারানোর বিধান রাখা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

সূত্র: বনিকবার্তা

নিউজনাউ/আরবি/২০২১

+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
মন্তব্য
Loading...
%d bloggers like this: