ফাডা কপালে ভোরের সূর্য

হাসনাইন খুরশেদ


সে যে কেনো এলো না
কিছু ভালো লাগে না..

ভিপির চেয়ারে বসে গুনগুন করে গাইছেন বিষণ্ন আবদুল খালেক। আমাদের খালেক ভাই। আমরা রুমে ঢুকে দেখলাম, রিভলভিং চেয়ারটা ডানে বায়ে ঘুরাচ্ছেন। আর তার সাথে তালে তাল মিলিয়ে বার বার গাইছেন, সে যে কেনো এলো না..
আমরা যে এসেছি, তা যেনো চোখেই পড়েনি খালেক ভাইয়ের। তিনি কিছুই বলছেন না। প্রবল অস্থিরতার ছাপ তার চোখে-মুখে। আমরা চেয়ার টেনে টেবিলের এপারে বসলাম। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসলাম সবাই।
-ও খালেক ভাই, আমরা আইছি আপনেরে ধইন্যবাদ দিতে। হাছাই অনেক বড় কাম হইতাছে এইডা।
তা-ও কিছুই বলছেন না। তাকিয়ে আছেন ফাঁকা চোখে। বিষণ্নতায় নিষ্প্রাণ, নির্জীব তার সুরমাটানা চোখ। পার্কি বললো, একশ’ দিনের কর্মসূচির পঁচিশ দিনও পার হইল না। এর মইদ্যেই অত্তো বড় কাম শুরু করলেন। আপনে তো দেখাইয়া দিলেন খালেক ভাই! মাইয়ারা বেবাকতেই খুব খুশি। প্রবাল উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলে উঠলো, সায়লা ডাইক্যা কইলো, তুমরার খালেক ভাইরে তাড়াতাড়ি বিল্ডিংডা শেষ করতে কইয়ো। ম্যাডামরা, আমরা সবাই খুব আশায় আছি। গভীর ভালোবাসা নিয়ে কোমল কণ্ঠে জানতে চাইলো প্রবাল, শেষ করতে কত দিন লাগব খালেক ভাই? কিতা কমু সায়লারে?
ফার্স্ট ইয়ার কমার্সের সায়লার সাথে ইদানিং বেশ ভাব হয়েছে প্রবালের। ক’দিন আগে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, হুড তোলা রিক্সায় ওরা দু’জন। নিয়াজ পার্কের দিকে যাচ্ছে। আর ফিসফিস করে কথা বলছে।
মাস ছয়েক সম’ চাইছে আজহার কন্ডাক্টর। চিন্তায় ছেদ পড়লো খালেক ভাইয়ের কথায়, আমি কইছি, চাইর মাসের মইদ্যে শেষ করনই লাগব। নাইলে কুনু বিল-অই দিতাম না।
-মাত্র চাইর মাস!
-কুটি ট্যাহার কাম। চাইর মাসে হে ক্যামনে করব! আমিও জানি পারত না। তবু চাপে রাখছি। চাইর মাসে না পারলেও ছয় মাসে যুমুন শেষ হয়।
-কুটি ট্যাহা! কিতা কন আপনে! দুই তালা বিল্ডিং বানাইতে কুটি ট্যাহা লাগব! আমার বাবায় দুই তালা বাড়িডা বানাইছে দশ লাখ ট্যাহায়।
-হুদাই আজাইরা বুজস তুই..
ধমকে উঠে আমাদের আরেক বন্ধু অরুণাভকে থামিয়ে দিলেন খালেক ভাই,
-অহন যা ত তরা.. গিয়া দেখ আজহার কন্ডাক্টররা কত্টুক আগ্যাইল। আজাইরা কথা কইতে মন চাইতাছে না.. আর মনডাও বালা না..
-আশ্চর্য! বিশ লাখ হঠাৎ কোটি টাকা হলো কেমন করে! সেদিন তো আমাদের সামনেই দিলেন দশ লাখ টাকা। বললেন, বাকি দশ লাখ পরে দেবেন। খালেক ভাই এখন পাঁচ গুণ বাড়িয়ে বলছেন কেনো! আমি আর পার্কি পরস্পরের দিকে তাকালাম অবাক হয়ে। দু’জনেই একসাথে বলে উঠলাম, খালেক ভাই, সেদিন না দশ লাখ..
আমাদের কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, তরা কি কথার জায়গা-জিরাতও বুজস না? যা ত, অহন যা.. আমার মনডা ভালা না..
বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাদের সাথে এভাবে কথা বলছেন খালেক ভাই। আমাদের এভাবে চলে যেতে বলছেন! এটাও কি সম্ভব!
-কিতা হইছে খালেক ভাই! আমরারে যাইতে কইতাছেন আপনে!
-আইচ্ছা ব.. ব.. অত কথা দরিস না। কথায় কথায় গুসস্যা মারিস না। আইজগা আমার মনডা হুব-অই হারাপ।
বিষণ্ন কণ্ঠ খালেক ভাইয়ের। গুনগুন করে গাইতে লাগলেন, সে যে কেন এলো না..
হাসনাত জানতে চাইলো, মন হারাপ ক্যারে? কিতা অইছে?
-আর কইস না! দীলিপদারা আখাউরাত-তে গাড়িত উঠছে। হাইঞ্জার আগেই আইয়া পরব..
রিপন বললো, ভালা ত.. এইডাত্ মন হারাপের কিতা আছে!
-যারে দেহানির লাইগ্যা তারাহুরা কইরা অত্ত কিচ্ছু করলাম, হে অইত্ত আইল না..
-কার কথা কইতাছেন খালেক ভাই?
-আরে, কুছতা বুজস না। উস্টা খাইয়্যা ঠ্যাঙ্গে ব্যথা পাইছে। দেবী আইতেছে না।

এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম, কেনো এতো বিষণ্ন খালেক ভাই। কেনো এতো অস্থির।
দেবশ্রী এবার আসছে না। আসতে পারছে না খালেক ভাইয়ের দেবছ্ছিরি.. খালেক ভাইয়ের দেবী..
সেবার এসেছিলো মাত্র এক রাতের জন্য। আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া গোল্ডকাপ জেতার পর খালেক ভাই নাচতে নাচতে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তুমুল আনন্দে মেতেছিলেন।
দেবশ্রী সেই রাতে খালেক ভাইকে বলেছিলো, ‘খালেকদা, আই লাভ ইউ’। র-ফলা উচ্চারণ করতে পারেন না খালেক ভাই। তিনি ডাকতেন, দেবছ্ছিরি। এ নিয়ে অভিমান ভাঙ্গাতে তিনি দেবশ্রীর নতুন নাম দিয়েছিলেন- দেবী।
সেই দেবী পরদিন দুপুরের ভাত খেয়েই ফিরে যায় আগরতলায়। তারপর থেকেই চরম ব্যস্ত হয়ে ওঠেন খালেক ভাই। পাগলের মতন ছোটাছুটি করেন সাত-সাতটা দিন।

-দেবী কথা দিছিল, এইবার আইলে তিন-চার দিন থাকব। মনে মনে কত কুছতা গুছাইয়া রাখছি। পরবাল-সায়লার লাগান আমিও দেবীরে লইয়া নিয়াজ পার্কে যামু। লাছানিত বিরানি খামু। নাইট শু-ত্ বই দেখুম।
খালেক ভাই বলে চললেন, ঠিক করছিলাম, এইবার আইলে আম্মার ধারে লইয়া যামু। সাত বইনের লগে চিন-পরিচয় করাইয়া দিমু। সাহস কইরা আব্বারে কইয়া ফালামু, আব্বা, আমি দেবীরে বিয়া করতাম চাই। আহ-হা-রে! হাসি চেপে বললাম আমি, উষ্টা খাওনের আর সম’ পাইল না!
-আমিও ত হেইডাই কই! চরম হতাশ খালেক ভাই, উষ্টা-মুষ্টাও আইয়া আমার ফাডা কপালডাত-অই পরে .. আর জাগা পায় না..
আগরতলায় ফিরে যাবার আগে দেবশ্রী তার খালেকদাকে কথা দিয়েছিলো, নারী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন অনুষ্ঠানে আবারো আসবে। আগামীকাল বহুপ্রত্যাশিত সেই অনুষ্ঠান। নারী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন অনুষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে কলেজের সব নারীদের জন্য নতুন দোতলা ভবনের নির্মাণ-কাজ।
নবনির্বাচিত ভিপি আবদুল খালেকের একক উদ্যোগে, কেবলমাত্র তারই জোগার করা টাকায় বানানো হচ্ছে নারী ভবন। অভিষেক ভাষণে যে ভবন নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, এক মাসের কম সময়ে তাকে দৃশ্যমান করে তুলছেন সবার সামনে। কলেজ জুড়ে সবার মুখে এখন একই আওয়াজ, ‘সাবাস খালেক ভাই’।

দারূণ এই উদ্যোগের জন্য খালেক ভাইকে ধন্যবাদ জানাতে আমরা এসেছি তার রুমে। কথা বলছি তার সাথে। কথায় কথায় তিনি শোনালেন চমকে দেয়া কথা, বিশ লাখ না, বিল্ডিং বানাতে লাগছে কোটি টাকা। মাজেজাটা কি, কিছুতেই ধরতে পারছি না আমরা।
-অ শুচি.. পার্কি.. পরবাল.. মাডি কাডার অনুষ্ঠানডা ভালা করন-অই লাগব। তরা একটু গিয়া দেখ ত ভাই, কাজ-কাম ঠিকঠাক হইতাছে কিনা..
অরুণাভ নাছোড়বান্দা, যাওনের আগে আবারও কই খালেক ভাই, আমার বাবায় দশ লাখ ট্যাহা দিয়া দুই তালা বাড়ি বানাইছে। মাইয়ারার দুই তালা বিল্ডিং বানাইতে কুটি ট্যাহা লাগব ক্যারে!
-ট্যাহাডি কি তর বাপে দিতাছে! প্রচন্ড ক্ষেপে গেলেন খালেক ভাই, আমার আব্বাত তে.. দুলাভাইরার তে মাইগ্যা ট্যাহা আনছি।
আমি বললাম, আজহার কন্ডাক্টর ত বিশ লাখ ট্যাহার কথাই কইছিল! এবার কটমট করে আমার দিকে তাকালেন খালেক ভাই, কয় ট্যাহার বিল্ডিং এইডা দিয়া তরার কি কাম! খবরদার! আজাইরা কথা তুলিস না কইয়া দিলাম।
মেজাজ চড়ছে আমার। ক্ষেপে উঠছি। রাগে চোখ লাল হয়ে উঠছে।
সেটা চোখে পরতেই খালেক ভাই উঠে এলেন। পিঠে হাত বুলিয়ে স্নেহের সাথে বললেন, যা ভাই, অহন যা.. আমার লগে গুসসা করিস না। আইজগা মনডা হুব হারাপ.. আমি আসলেই ফাডা কপাইল্যা..
কথা না বাড়িয়ে আমরা উঠে পরলাম। গুনগুন করে তিনি গাইছেন- সে যে কেনো এলো না..
আমরা যখন বেরিয়ে আসছি, তখন রুমে ঢুকলেন কাশেম কেরানি। তাকে দেখেই উবে গেলো খালেক ভাইয়ের সব রাগারাগি, সব বিষণ্নতা, সব অস্থিরতা।
কেনো যেনো আমার মনে হলো, দেবী না- কাশেম কেরানির অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন খালেক ভাই। তার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই গাইছিলেন, সে যে কেনো এলো না..
কাশেম কেরানির হাতে একটা ব্যাগ। কালো রঙের বেশ বড়সড় একটা ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে, বেশ ভারি।
ছোঁ মেরে কালো ব্যাগটা নিয়ে নিলেন খালেক ভাই। তাড়াহুড়া করে লোহার সিন্দুকে রাখলেন। লাগিয়ে দিলেন সিন্দুকের তালা। এখন ঝলমল করছে খালেক ভাইয়ের কৃষ্ণকালো মুখমণ্ডল। মনে হচ্ছে, তার ফাডা কপাল ফুঁড়ে উঁকি দিচ্ছে ভোরের সূর্য।

চলবে…

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...